প্রকাশ: ২৮ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সিলেটের গোলাপগঞ্জে মোটরসাইকেল চুরির অভিযোগে মুরসালিন নামে এক পুলিশ কনস্টেবলকে স্থানীয় জনতা আটক করে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করেছে। বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) সন্ধ্যায় উপজেলার হেতিমগঞ্জ বাজারে এ ঘটনা ঘটে। তবে আটক কনস্টেবল মোটরসাইকেল চুরির অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেছেন, তিনি মোটরসাইকেল কেনার উদ্দেশ্যেই বাজারে গিয়েছিলেন। পুলিশও জানিয়েছে, ঘটনাটি তদন্ত করে প্রকৃত কারণ বের করার চেষ্টা চলছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, মুরসালিন মোটরসাইকেল কেনার কথা বলে হেতিমগঞ্জ বাজারে যান। সেখানে একটি মোটরসাইকেল দেখার পর সেটি চালিয়ে পরীক্ষা করার কথা বলেন। মোটরসাইকেলটি নিয়ে তিনি কিছুটা দূরে চলে গেলে উপস্থিত লোকজনের সন্দেহ হয়। পরে কয়েকজন স্থানীয় তাঁর পিছু নেন এবং তাকে আটক করেন। এ সময় মুরসালিন নিজের পরিচয় পুলিশ সদস্য হিসেবে দেন বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে স্থানীয় জনতা তাকে মারধরও করেন। পরে তাকে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেয় এবং মুরসালিনকে হেফাজতে নেয়।
তবে মুরসালিনের বক্তব্য ভিন্ন। তাঁর দাবি, তিনি মোটরসাইকেল কেনার উদ্দেশ্যেই হেতিমগঞ্জ বাজারে গিয়েছিলেন। মোটরসাইকেলটি পছন্দ করার পর চালিয়ে দেখার সময় স্থানীয় লোকজন তাকে ভুল বুঝে চোর সন্দেহে আটক করেন। তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সঠিক নয় বলেও তিনি দাবি করেছেন।
ঘটনার সময় মুরসালিনের সঙ্গে ওলিউর ইসলাম নামে একজন ব্যক্তি ছিলেন। তিনি নিজেকে মুরসালিনের দাদা পরিচয় দিয়েছিলেন। ওলিউর ইসলামের ভাষ্য অনুযায়ী, মুরসালিন মোটরসাইকেল কেনার কথা বলেই তাকে সঙ্গে নিয়ে হেতিমগঞ্জ বাজারে এসেছিলেন। পরে মুরসালিন মোটরসাইকেল দেখতে যাওয়ার কথা বলে তাকে সেখানে রেখে চলে যান।
ওলিউর ইসলাম জানান, পরে স্থানীয় লোকজন তাঁর কাছে মুরসালিন সম্পর্কে জানতে চান। পরিস্থিতির চাপে তিনি ভয় পেয়ে মুরসালিনকে চেনেন না বলে জানিয়েছিলেন। বিষয়টি নিয়ে সন্দেহ আরও বাড়ে। ঘটনার পর পুলিশ তাকেও জিজ্ঞাসাবাদের জন্য থানায় নিয়ে যায়।
স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, মোটরসাইকেলটি নিয়ে মুরসালিন চলে যাওয়ার পরই তাদের মধ্যে সন্দেহ তৈরি হয়। এরপর কয়েকজন মিলে তাঁর পিছু নিয়ে তাকে আটক করেন। আটকের পর তিনি নিজেকে পুলিশ সদস্য হিসেবে পরিচয় দিলে বিষয়টি আরও গুরুত্ব পায়। পরে তাকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হয়।
ঘটনাটি এমন এক সময়ে সামনে এসেছে, যখন মোটরসাইকেল চুরি নিয়ে দেশের বিভিন্ন এলাকায় সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। ফলে কোনো ব্যক্তি মোটরসাইকেল নিয়ে স্থান ত্যাগ করলে সেটি বৈধভাবে কেনাবেচার অংশ কি না, নাকি চুরির চেষ্টা—তা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে দ্রুত সন্দেহ তৈরি হতে পারে। হেতিমগঞ্জের ঘটনাতেও এমন সন্দেহ থেকেই স্থানীয়রা মুরসালিনকে আটক করেছেন বলে জানা গেছে।
তবে পুলিশ বলছে, শুধু স্থানীয়দের অভিযোগ বা সন্দেহের ভিত্তিতে কাউকে মোটরসাইকেল চোর হিসেবে চূড়ান্তভাবে বিবেচনা করা যাবে না। ঘটনাটির পেছনে আসলে কী ঘটেছিল, মোটরসাইকেলটির মালিক কে, মুরসালিন সেটি কেনার জন্য গিয়েছিলেন কি না এবং সেখানে কোনো ধরনের প্রতারণা বা চুরির চেষ্টা হয়েছিল কি না—এসব বিষয় তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত করা হবে।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, মুরসালিন সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার বাসিন্দা। তিনি সিলেটের বিয়ানীবাজার থানায় পুলিশ কনস্টেবল হিসেবে কর্মরত ছিলেন। চলতি মাসের শুরুতে ছুটিতে বাড়িতে যাওয়ার পর ছুটি শেষ হলেও তিনি কর্মস্থলে ফিরে যোগ দেননি বলে জানিয়েছে পুলিশ।
বিয়ানীবাজার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবু জাফর মাহফুজুল কবির জানান, মুরসালিন চলতি মাসের শুরুতে ছুটিতে বাড়িতে গিয়েছিলেন। এরপর থেকে তিনি এখন পর্যন্ত কর্মস্থলে যোগ দেননি। তাঁর কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকার বিষয়টিও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরে রয়েছে বলে জানা গেছে।
অন্যদিকে, গোলাপগঞ্জ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ছবেদ আলী জানিয়েছেন, মুরসালিন মোটরসাইকেল কেনার জন্য হেতিমগঞ্জ বাজারে গিয়েছিলেন বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। মোটরসাইকেলটি ট্রায়াল দেওয়ার সময় সাধারণ মানুষ তাকে চোর সন্দেহে আটক করে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করেছে। ঘটনার প্রকৃত কারণ খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
পুলিশের এই বক্তব্য থেকে আপাতত স্পষ্ট নয় যে মুরসালিন সত্যিই মোটরসাইকেল চুরির চেষ্টা করেছিলেন, নাকি কেনার উদ্দেশ্যে গিয়ে ভুল বোঝাবুঝির শিকার হয়েছেন। এ কারণে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত অভিযোগটিকে নিশ্চিত ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
ঘটনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, মুরসালিনের সঙ্গে থাকা ওলিউর ইসলামের ভূমিকা। তিনি মুরসালিনের সঙ্গে বাজারে কেন গিয়েছিলেন এবং পরে স্থানীয়দের প্রশ্নের মুখে কেন মুরসালিনকে চেনেন না বলে জানিয়েছিলেন—এসব বিষয়ও পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে উঠে আসতে পারে। একই সঙ্গে মোটরসাইকেলটির মালিক বা বিক্রেতার বক্তব্যও ঘটনার প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
স্থানীয়দের হাতে আটকের পর মুরসালিনকে মারধর করার অভিযোগও উঠেছে। কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগ থাকলেও আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার সুযোগ নেই। অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দায়িত্ব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর। ফলে এ ঘটনায় মোটরসাইকেল চুরির অভিযোগের পাশাপাশি আটক ব্যক্তিকে মারধরের ঘটনাটিও গুরুত্বের সঙ্গে দেখার প্রয়োজন রয়েছে।
পুলিশ জানিয়েছে, তদন্তের পরই মুরসালিনের বিরুদ্ধে কোনো আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না, তা স্পষ্ট হবে। পাশাপাশি তিনি কেন দীর্ঘদিন কর্মস্থলে অনুপস্থিত ছিলেন, সেই বিষয়টিও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আলাদাভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
হেতিমগঞ্জ বাজারের এই ঘটনা শেষ পর্যন্ত চুরির চেষ্টা, নাকি মোটরসাইকেল কেনাকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া ভুল বোঝাবুঝি—তার উত্তর এখন তদন্তের ওপর নির্ভর করছে। পুলিশ বলছে, প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটনে প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রমাণ যাচাই করা হচ্ছে। তদন্তের ফলেই অভিযোগের সত্যতা এবং পুরো ঘটনার পেছনের বাস্তব চিত্র পরিষ্কার হবে।


