প্রকাশ: ২৪ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
জাতীয় নির্বাচনে যে মানদণ্ড তৈরি হয়েছে, তার চেয়েও ভালো স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের চেষ্টা করা হবে বলে জানিয়েছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এএমএম নাসির উদ্দিন। তিনি বলেছেন, জাতীয় নির্বাচনের সময় নির্বাচন কমিশন যে মানদণ্ড প্রতিষ্ঠা করেছে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও তা বজায় থাকবে। সুযোগ থাকলে সেই মানদণ্ড আরও উন্নত করার চেষ্টা করা হবে, তবে কোনোভাবেই আগের মানের নিচে নামা হবে না।
সোমবার (২৪ আগস্ট) নির্বাচনি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এসব কথা বলেন সিইসি। এ সময় তিনি স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি, সম্ভাব্য সময়সূচি, আইন ও বিধি সংশোধন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং নির্বাচন পরিচালনায় বিভিন্ন সরকারি সংস্থার সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তার বিষয়ে বিস্তারিত কথা বলেন।
সিইসি বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের ক্ষেত্রে নানা ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে। তবে এসব চ্যালেঞ্জ নির্বাচন কমিশনের অঙ্গীকারে কোনো ধরনের ঘাটতি তৈরি করবে না। জাতীয় নির্বাচন যেভাবে আয়োজন করা হয়েছে, তার চেয়ে ভালো নির্বাচন করার চেষ্টা থাকবে কমিশনের। তার ভাষায়, জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে যে মানদণ্ড তৈরি হয়েছে, সেটি কমিশন নিজেরাই নির্ধারণ করেছে। ফলে সেই মানদণ্ডের নিচে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে কমিশনের এই অবস্থানকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কারণ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তুলনায় স্থানীয় পর্যায়ের নির্বাচন অনেক বেশি সরাসরি ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হয়ে থাকে। ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, উপজেলা ও অন্যান্য স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নির্বাচনকে ঘিরে প্রার্থী ও সমর্থকদের মধ্যে স্থানীয় পর্যায়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা তীব্র হওয়ার সুযোগ থাকে। ফলে নির্বাচন সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য করতে মাঠপর্যায়ে প্রশাসনিক প্রস্তুতির পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপরও বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে।
সিইসি নিজেও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সহিংসতার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন। তিনি বলেন, জাতীয় নির্বাচনের তুলনায় স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সহিংসতার মাত্রা কিছুটা বেশি থাকে। এই বাস্তবতা কমিশনের বিবেচনায় রয়েছে। সে অনুযায়ী আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে প্রয়োজনীয়ভাবে মোতায়েন করা হবে।
তার বক্তব্য অনুযায়ী, স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সম্ভাব্য ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করা এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়টি গুরুত্ব পাবে। নির্বাচন কমিশন একদিকে যেমন ভোটারদের নির্বিঘ্নে ভোট দেওয়ার পরিবেশ নিশ্চিত করতে চায়, অন্যদিকে প্রার্থী ও তাদের সমর্থকদের মধ্যকার সংঘাত যাতে নির্বাচনী পরিবেশ নষ্ট করতে না পারে, সেদিকেও নজর রাখবে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে ইতোমধ্যে কমিশন সংশ্লিষ্ট বাহিনীর সঙ্গে আলোচনা শুরু করেছে। সিইসি জানান, পুলিশের মহাপরিদর্শকের (আইজিপি) সঙ্গে এ বিষয়ে বৈঠক হয়েছে। সেখানে সারা দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সময় পুলিশ কী পরিমাণ সদস্য মোতায়েন করতে পারবে, তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
নির্বাচনের সময় মাঠপর্যায়ের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের জন্য পুলিশের বিদ্যমান মনিটরিং ব্যবস্থাকেও কাজে লাগানোর বিষয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানান সিইসি। এর মাধ্যমে বিভিন্ন এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সম্পর্কে দ্রুত তথ্য পাওয়া এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে নির্বাচনকালীন নিরাপত্তা পরিকল্পনা সাজানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
তবে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের দিনক্ষণ এখনই ঘোষণা করা সম্ভব নয় বলে জানিয়েছেন সিইসি। নির্বাচন আয়োজনের সময় নির্ধারণে একাধিক বিষয় বিবেচনা করতে হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে আবহাওয়া, সম্ভাব্য বন্যা, বর্ষাকাল, দুর্গাপূজার সময়সূচি এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক পরীক্ষা।
স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বিপুলসংখ্যক ভোটকেন্দ্র ব্যবহারের প্রয়োজন হয়। এসব ভোটকেন্দ্রের বড় একটি অংশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে স্থাপন করা হয়। একই সঙ্গে স্কুল ও কলেজের শিক্ষকরা প্রিসাইডিং কর্মকর্তা, সহকারী প্রিসাইডিং কর্মকর্তা এবং পোলিং কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ফলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক পরীক্ষার সময়সূচির সঙ্গে নির্বাচনের সময় সমন্বয় করা কমিশনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
সিইসি বলেন, নির্বাচন পরিচালনার ক্ষেত্রে শিক্ষকদের দায়িত্ব পালনের বিষয়টি বিবেচনায় নিতে হবে। কারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরীক্ষা চলাকালে শিক্ষকদের নির্বাচনী দায়িত্ব দেওয়া বাস্তবসম্মত নয়। এ কারণে নির্বাচন কমিশন সম্ভাব্য সময়সূচি নির্ধারণের ক্ষেত্রে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যক্রমও বিবেচনায় রাখছে।
এর পাশাপাশি দুর্গাপূজার সময়সূচিও নির্বাচনের সময় নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ। দেশের বিভিন্ন এলাকায় এই সময়ে বড় ধরনের সামাজিক ও ধর্মীয় আয়োজন থাকে। ফলে ওই সময় নির্বাচন আয়োজন করলে ভোটার, প্রার্থী, প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে। কমিশন তাই সব ধরনের বাস্তবতা বিবেচনা করেই নির্বাচনের সময় নির্ধারণ করতে চায়।
বর্ষাকাল ও বন্যার সম্ভাবনাও নির্বাচন কমিশনের জন্য একটি বড় বিবেচনার বিষয়। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বর্ষাকালে যোগাযোগব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে এবং অনেক এলাকায় জলাবদ্ধতা বা বন্যার কারণে ভোটকেন্দ্রে যাতায়াত কঠিন হয়ে যেতে পারে। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দুর্গম ও প্রত্যন্ত এলাকাগুলোতে ভোটকেন্দ্র পরিচালনার বিষয়টি আরও জটিল হতে পারে। তাই আবহাওয়া ও সম্ভাব্য প্রাকৃতিক দুর্যোগের বিষয়টি মাথায় রেখেই সময়সূচি নির্ধারণের কথা জানিয়েছেন সিইসি।
এদিকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের জন্য প্রয়োজনীয় আইন ও বিধি-বিধান সংশোধনের কাজও চলছে। সিইসি জানান, নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে সংশোধনীর প্রস্তাব প্রস্তুত করে মন্ত্রণালয়ে ভেটিংয়ের জন্য পাঠানো হয়েছে। এসব প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর নির্বাচন আয়োজনের জন্য প্রয়োজনীয় অন্যান্য কার্যক্রম সম্পন্ন করতে হবে।
নির্বাচন কমিশনের সামনে শুধু ভোটের তারিখ নির্ধারণই নয়, নির্বাচনী সামগ্রী সংগ্রহ, ভোটকেন্দ্র প্রস্তুত, কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ, নিরাপত্তা পরিকল্পনা এবং অন্যান্য প্রশাসনিক ও আইনি বাধ্যবাধকতা পূরণের বিষয়ও রয়েছে। এসব কাজ সম্পন্ন করেই স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজন করতে হবে বলে জানিয়েছেন সিইসি।
সরকারের সঙ্গে সমন্বয়ের বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে উল্লেখ করেছেন তিনি। স্থানীয় সরকার নির্বাচন পরিচালনায় পুলিশ, বিজিবি এবং অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহযোগিতা প্রয়োজন। একই সঙ্গে প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তাদের নির্বাচনী দায়িত্ব পালন করতে হয়। ফলে নির্বাচন কমিশন এককভাবে সব কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারে না। সরকারের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে আলোচনা ও সমন্বয়ের ভিত্তিতেই নির্বাচনের প্রস্তুতি এগিয়ে নিতে হবে।
সিইসির বক্তব্যে এ বিষয়টিও স্পষ্ট হয়েছে যে, স্থানীয় সরকার নির্বাচন খুব বেশি পিছিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা কমিশনের নেই। যদিও এখনই নির্দিষ্ট তারিখ জানানো সম্ভব নয়, তবে প্রয়োজনীয় আইনগত ও প্রশাসনিক প্রস্তুতি শেষ করে দ্রুত নির্বাচন আয়োজনের দিকে এগোতে চায় কমিশন। সময় নির্ধারণের ক্ষেত্রে বাস্তব পরিস্থিতি ও সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সক্ষমতা বিবেচনায় নেওয়া হবে।
এদিকে ঠাকুরগাঁওয়ের শূন্য আসনের উপনির্বাচন নিয়েও কথা বলেছেন সিইসি। তিনি জানান, আইন অনুযায়ী শূন্য আসনে ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন সম্পন্ন করতে হবে। সেই সময়সীমা মাথায় রেখেই নির্বাচন কমিশন কাজ করছে। ফলে ঠাকুরগাঁওয়ের উপনির্বাচনের প্রস্তুতিও আইন অনুযায়ী এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে ঘিরে নির্বাচন কমিশনের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হবে মাঠপর্যায়ে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করা। জাতীয় নির্বাচনের তুলনায় স্থানীয় নির্বাচনে প্রার্থীদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা অনেক সময় ব্যক্তিগত ও পারিবারিক পর্যায় পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। একই এলাকার প্রার্থীদের মধ্যে দীর্ঘদিনের বিরোধও নির্বাচনী উত্তেজনার কারণ হতে পারে। তাই সম্ভাব্য সংঘাতের জায়গাগুলো আগে থেকে শনাক্ত করে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণের প্রয়োজন রয়েছে।
একই সঙ্গে ভোটারদের আস্থা ধরে রাখাও কমিশনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। নির্বাচন কমিশন যদি জাতীয় নির্বাচনে প্রতিষ্ঠিত মানদণ্ডের চেয়েও ভালো স্থানীয় নির্বাচন আয়োজন করতে চায়, তাহলে ভোটকেন্দ্রে নিরাপদ পরিবেশ, ভোটারদের স্বাধীনভাবে ভোট দেওয়ার সুযোগ, প্রার্থীদের জন্য সমান সুযোগ এবং নির্বাচনী আচরণবিধি যথাযথভাবে বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কার্যকর ভূমিকার পাশাপাশি প্রশাসনের নিরপেক্ষতাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
সিইসি এএমএম নাসির উদ্দিনের বক্তব্যে তাই একদিকে যেমন স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতির কথা উঠে এসেছে, অন্যদিকে নির্বাচনকে আরও উন্নত ও গ্রহণযোগ্য করার প্রত্যয়ের কথাও এসেছে। জাতীয় নির্বাচনে যে মানদণ্ড তৈরি হয়েছে, তা ধরে রাখার পাশাপাশি সম্ভব হলে আরও ভালো করার যে অঙ্গীকার তিনি জানিয়েছেন, সেটিই এখন কমিশনের জন্য বড় দায়িত্ব হয়ে দাঁড়িয়েছে।
স্থানীয় সরকার নির্বাচন কবে হবে, সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত ঘোষণা আসেনি। তবে আইন ও বিধি সংশোধনের পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় এবং প্রশাসনিক প্রস্তুতি শুরু হওয়ায় নির্বাচন আয়োজনের প্রক্রিয়া এগিয়ে যাচ্ছে। আবহাওয়া, বন্যা, দুর্গাপূজা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরীক্ষার সময়সূচি বিবেচনায় নিয়ে সুবিধাজনক সময় নির্ধারণ করা হবে। কমিশনের লক্ষ্য, জাতীয় নির্বাচনে তৈরি হওয়া মানদণ্ড অক্ষুণ্ন রেখে এমন একটি স্থানীয় নির্বাচন আয়োজন করা, যেখানে ভোটাররা নিরাপদ পরিবেশে নিজেদের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে পারেন এবং নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্নের সুযোগ যতটা সম্ভব কম থাকে।

