প্রকাশ: ১৫ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সিলেটের হজরত শাহজালাল (রহ.)-এর মাজারে দানবাক্সে জমা হওয়া অর্থ গণনা শুরু হয়েছে। প্রায় এক মাসের ব্যবধানে তৃতীয়বারের মতো প্রকাশ্যে মাজারের দানবাক্স থেকে টাকা বের করে হিসাব করা হচ্ছে। আগের দুই দফায় বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থের পাশাপাশি দেশি-বিদেশি মুদ্রা ও স্বর্ণালঙ্কার পাওয়ার পর এবারও দানবাক্সে জমা হওয়া অর্থের পরিমাণ জানতে গণনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
শনিবার (১৫ আগস্ট) সকাল সোয়া ১০টার দিকে মাজারের দানবাক্স বা ডেগচি থেকে অর্থ বের করে দরগাহ মসজিদের বারান্দায় গণনা শুরু হয়। মাজারের আয়-ব্যয় ব্যবস্থাপনা নির্ধারণে গঠিত কমিটির ব্যবস্থাপনায় এই গণনা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
গণনায় মাদরাসার শিক্ষার্থী, মাজার কমিটির সদস্য এবং জেলা প্রশাসনের কর্মচারীরা অংশ নিয়েছেন। এ সময় সিলেটের জেলা প্রশাসক আবদুল্লাহ আল মামুন, সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রেজাউল হাসান কয়েস লোদীসহ জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
মাজারে আগত মানুষদের দানের অর্থ দীর্ঘদিন ধরে দানবাক্সে জমা হয়ে আসছে। এসব অর্থের পরিমাণ যেমন উল্লেখযোগ্য, তেমনি বিভিন্ন দেশ থেকে আসা ভক্ত ও দর্শনার্থীদের মাধ্যমে বিদেশি মুদ্রা এবং মূল্যবান ধাতব সামগ্রীও দানবাক্সে জমা পড়ে। ফলে প্রতিবার দানবাক্স খোলার পর নগদ অর্থের পাশাপাশি পাওয়া যায় বিভিন্ন দেশের মুদ্রা ও স্বর্ণ-রূপার সামগ্রী।
চলতি বছরের ২২ জুন প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে মাজারের দানের টাকা গণনা করা হয়। ওই দিন মাজারের চারটি এবং জেলা প্রশাসনের স্থাপন করা চারটিসহ মোট আটটি দানবাক্স ডাবল লক অবস্থায় খোলা হয়েছিল। দীর্ঘ সময় ধরে জমা হওয়া এসব দানবাক্সের অর্থ গণনা শেষে পাওয়া যায় ১৭ লাখ ৬৫ হাজার ৫৪৯ টাকা।
নগদ টাকার পাশাপাশি সেদিন দানবাক্স থেকে সাত আনা স্বর্ণালঙ্কার ও দুটি সৌদি রিয়াল পাওয়া যায়। এর সঙ্গে জেলা প্রশাসনের ফান্ড থেকে সাবেক জেলা প্রশাসক সারওয়ার আলমের দেওয়া পাঁচ লাখ টাকার চেক যোগ করা হলে মোট অর্থের পরিমাণ দাঁড়ায় ২২ লাখ ৬৫ হাজার ৫৪৯ টাকা।
গণনা শেষে ওই অর্থ হজরত শাহজালাল (রহ.)-এর নামে সোনালী ব্যাংকের করপোরেট শাখায় জমা দেওয়া হয়। প্রকাশ্যে গণনা ও ব্যাংকে অর্থ জমা দেওয়ার এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে মাজারের দানের অর্থ ব্যবস্থাপনায় একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরির উদ্যোগ আরও স্পষ্ট হয়।
প্রথম দফার গণনার মাত্র ১৮ দিন পর দ্বিতীয়বারের মতো মাজারের দানবাক্স খোলা হয়। গত ১১ জুলাই দ্বিতীয় দফায় দানবাক্স থেকে পাওয়া যায় ৪৭ লাখ ১০ হাজার ১৫৩ টাকা। প্রথম দফার তুলনায় দ্বিতীয় দফায় নগদ অর্থের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি ছিল।
দ্বিতীয় দফার গণনায় শুধু দেশীয় মুদ্রাই নয়, বিভিন্ন দেশের মুদ্রাও পাওয়া যায়। এর মধ্যে সৌদি আরব, ভারত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ওমান, ইন্দোনেশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, হংকং, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, সিঙ্গাপুর, কাতার, মালয়েশিয়া ও পাকিস্তানের মুদ্রা ছিল। বিদেশি মুদ্রাগুলোও মাজারে বিভিন্ন দেশ থেকে আসা দর্শনার্থী ও ভক্তদের দানের বিষয়টি তুলে ধরে।
দ্বিতীয় দফায় নগদ ও বিদেশি মুদ্রার পাশাপাশি মূল্যবান সামগ্রীও পাওয়া যায়। দানবাক্স থেকে নয় গ্রাম স্বর্ণ, ১০ গ্রাম স্বর্ণসদৃশ বস্তু এবং ৩৯ দশমিক ৪ গ্রাম রূপা উদ্ধার হয়। এসব সামগ্রী আলাদাভাবে হিসাব করে সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার আওতায় নেওয়া হয়।
এবার তৃতীয় দফায় দানবাক্স খোলার পর গতবারের গণনার পর থেকে জমা হওয়া অর্থ ও মূল্যবান সামগ্রীর হিসাব করা হচ্ছে। গণনা শেষ না হওয়া পর্যন্ত এবার কত টাকা, বিদেশি মুদ্রা, স্বর্ণ বা রূপা পাওয়া গেছে, তা নিশ্চিতভাবে জানা যাবে না।
মাজারের দানের অর্থ গণনার ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিপুল পরিমাণ অর্থ নিয়মিত জমা হওয়ায় এর সঠিক হিসাব সংরক্ষণ, ব্যাংকে জমা এবং মাজারের আয়-ব্যয়ের ব্যবস্থাপনায় নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করার প্রয়োজন রয়েছে। এ কারণেই আয়-ব্যয় ব্যবস্থাপনা নির্ধারণে গঠিত কমিটির তত্ত্বাবধানে প্রকাশ্যে গণনার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
সিলেটের হজরত শাহজালাল (রহ.)-এর মাজার শুধু ধর্মীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ একটি স্থান নয়, এটি দেশের অন্যতম পরিচিত আধ্যাত্মিক ও ঐতিহাসিক স্থাপনাও। প্রতিবছর দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বিপুলসংখ্যক মানুষ এখানে আসেন। একই সঙ্গে দেশের বাইরে বসবাসকারী বাংলাদেশি এবং বিদেশি দর্শনার্থীরাও মাজারে আসেন। ফলে দানবাক্সে দেশীয় অর্থের পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের মুদ্রা জমা পড়া অস্বাভাবিক নয়।
মাজারে আসা মানুষের অনেকেই নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী দান করেন। কেউ নগদ টাকা দেন, কেউ বিদেশি মুদ্রা, আবার কেউ স্বর্ণ বা রূপার মতো মূল্যবান সামগ্রী দান করেন। সময়ের সঙ্গে এসব দানের পরিমাণ জমা হয়ে উল্লেখযোগ্য অঙ্কে পৌঁছায়। ফলে নির্দিষ্ট সময় পরপর দানবাক্স খোলা ও অর্থ গণনা করা প্রয়োজন হয়ে পড়ে।
আগের দুই দফায় গণনার ফল প্রকাশ্যে আসার পর মাজারের দান নিয়ে মানুষের আগ্রহও বেড়েছে। বিশেষ করে দ্বিতীয় দফায় প্রায় ৪৭ লাখ টাকা নগদ পাওয়ার পাশাপাশি বিপুল পরিমাণ বিদেশি মুদ্রা ও মূল্যবান সামগ্রী পাওয়া যাওয়ায় তৃতীয় দফার গণনা নিয়েও কৌতূহল তৈরি হয়েছে।
এবারের গণনায় সংশ্লিষ্টরা দানবাক্সে গতবারের পর থেকে জমা হওয়া অর্থ আলাদা করে হিসাব করছেন। দেশি ও বিদেশি মুদ্রা পৃথকভাবে গণনা করা হবে। পাশাপাশি স্বর্ণ, রূপা বা অন্য কোনো মূল্যবান সামগ্রী পাওয়া গেলে সেগুলোর ওজন ও ধরন অনুযায়ী হিসাব করা হবে।
সংশ্লিষ্টদের উপস্থিতিতে গণনা কার্যক্রম পরিচালিত হওয়ায় পুরো প্রক্রিয়াটি পর্যবেক্ষণের সুযোগ থাকছে। অর্থ গণনা শেষে মোট নগদ অর্থের পরিমাণ এবং পাওয়া বিদেশি মুদ্রা ও মূল্যবান সামগ্রীর হিসাব জানা যাবে। এরপর এসব অর্থ ও সম্পদের ব্যবস্থাপনা কীভাবে করা হবে, সেটিও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী নির্ধারিত হবে।
এক মাসের মধ্যে তৃতীয়বার দানবাক্স খোলার ঘটনা মাজারে নিয়মিত দানের পরিমাণ সম্পর্কেও একটি ধারণা দেয়। বিশেষ করে পর্যটন ও ধর্মীয় দর্শনার্থীদের উপস্থিতি বেশি থাকলে দানবাক্সে অর্থ জমার গতিও বাড়ে। ফলে কতদিন পরপর দানবাক্স খোলা হবে, সেটি মাজারের আয়-ব্যয় ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সমন্বয় করেই নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
তবে প্রতিবার গণনার পর অর্থের স্বচ্ছ হিসাব রাখা এবং তা যথাযথ ব্যাংক হিসাবে জমা দেওয়ার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। এতে দানের অর্থের ব্যবহার নিয়ে মানুষের আস্থা আরও বাড়তে পারে। একই সঙ্গে মাজারের রক্ষণাবেক্ষণ, ধর্মীয় কার্যক্রম ও সংশ্লিষ্ট জনকল্যাণমূলক কাজে অর্থ ব্যবহারের ক্ষেত্রে জবাবদিহিও নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
শনিবার শুরু হওয়া তৃতীয় দফার গণনা শেষ হলে জানা যাবে এবার দানবাক্সে কত অর্থ জমেছে। আগের দুই দফার মতো এবারও যদি বিপুল অর্থ ও মূল্যবান সামগ্রী পাওয়া যায়, তাহলে তা মাজারে আগত মানুষের দানের পরিমাণের একটি নতুন চিত্র তুলে ধরবে। গণনা শেষ হওয়ার পরই প্রকাশ পাবে এবারের দানবাক্সের পূর্ণ হিসাব।


