প্রকাশ: ১৪ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
হবিগঞ্জের চুনারুঘাটে হত্যা মামলাসহ একাধিক মামলার আসামি এবং কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের উপজেলা কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক ও মিরাশী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মানিক সরকারকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। পুলিশের খাতায় তিনি দীর্ঘদিন ধরে পলাতক বা আত্মগোপনে থাকা আসামি হিসেবে থাকলেও স্থানীয়দের অভিযোগ, তিনি নিজ বাড়িতেই অবস্থান করছিলেন এবং ইউনিয়ন পরিষদের বিভিন্ন কার্যক্রমেও সক্রিয় ছিলেন।
এ নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে ক্ষোভ ও নানা প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছিল। বিশেষ করে জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে অংশ নেওয়া ছাত্র-জনতার মধ্যে তাকে প্রকাশ্যে কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার অভিযোগ নিয়ে অসন্তোষ বাড়ছিল। শেষ পর্যন্ত স্থানীয়দের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে শুক্রবার ভোরে নিজ বাড়ি থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
পুলিশের দাবি, মানিক সরকারের বিরুদ্ধে হত্যা মামলাসহ একাধিক মামলা রয়েছে। এর মধ্যে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে বাধা দেওয়ার অভিযোগে করা মামলাও রয়েছে। এসব মামলার কারণে তিনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরে ছিলেন।
চুনারুঘাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, মানিক সরকারের বিরুদ্ধে হত্যা মামলাসহ একাধিক মামলা রয়েছে। গত বছরের ৫ আগস্টের পর থেকে তিনি আত্মগোপনে ছিলেন বলে পুলিশের কাছে তথ্য ছিল। তাকে গ্রেপ্তারের জন্য এর আগে একাধিকবার অভিযান চালানো হলেও তিনি ধরা পড়েননি।
তবে এবার স্থানীয়দের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তার অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত হয় পুলিশ। এরপর ভোরে অভিযান চালিয়ে নিজ বাড়ি থেকেই তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, পুলিশের তালিকায় পলাতক থাকা একজন আসামি কীভাবে নিজের এলাকায় অবস্থান করে ইউনিয়ন পরিষদের কার্যক্রমে যুক্ত ছিলেন, সেটিই ছিল তাদের বড় প্রশ্ন। তাদের দাবি, মানিক সরকার নিয়মিতভাবে এলাকায় চলাফেরা করতেন এবং ইউনিয়ন পরিষদের বিভিন্ন কাজেও তার সম্পৃক্ততা ছিল। ফলে তাকে গ্রেপ্তার না হওয়ায় স্থানীয় পর্যায়ে এক ধরনের অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল।
বিশেষ করে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও তার প্রকাশ্য উপস্থিতি নিয়ে নানা আলোচনা চলছিল। জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে অংশ নেওয়া অনেকেই অভিযোগ করছিলেন, আন্দোলন-সংশ্লিষ্ট মামলার আসামি হয়েও তিনি কীভাবে স্থানীয় প্রশাসনিক কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত থাকছেন।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে আলাদা করে কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। পুলিশ জানিয়েছে, মামলাগুলোর ভিত্তিতেই তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হবে।
মানিক সরকার মিরাশী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় ইউনিয়ন পরিষদ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত একটি প্রতিষ্ঠান। জন্মনিবন্ধন, বিভিন্ন প্রত্যয়নপত্র, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, স্থানীয় অবকাঠামো ও নানা নাগরিক সেবার সঙ্গে ইউনিয়ন পরিষদের কার্যক্রম জড়িত। ফলে একজন চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে গুরুতর মামলা থাকার বিষয়টি স্থানীয় প্রশাসন ও সাধারণ মানুষের মধ্যেও স্বাভাবিকভাবেই আলোচনার জন্ম দেয়।
স্থানীয় বাসিন্দাদের একটি অংশ মনে করছেন, মামলার আসামি হিসেবে একজন জনপ্রতিনিধির অবস্থান ও কার্যক্রম নিয়ে প্রশাসনের আরও আগে স্পষ্ট পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন ছিল। তাদের ভাষ্য, আইন সবার জন্য সমান—এমন বার্তা নিশ্চিত করতে হলে মামলার আসামিদের বিষয়ে দ্রুত ও নিরপেক্ষ আইনগত ব্যবস্থা জরুরি।
অন্যদিকে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, গ্রেপ্তারের পর এখন মামলাগুলোর আইনগত প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হবে। কোনো ব্যক্তি মামলার আসামি হলেই তার বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হয়ে যায় না। আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অভিযোগের সত্যতা নির্ধারিত হবে।
মানিক সরকারের গ্রেপ্তারের ঘটনায় চুনারুঘাটের রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনেও আলোচনা শুরু হয়েছে। স্থানীয় পর্যায়ে দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় একজন রাজনৈতিক নেতা ও জনপ্রতিনিধি হওয়ায় তার বিরুদ্ধে থাকা মামলাগুলোর পরবর্তী কার্যক্রম কীভাবে এগোয়, সেদিকেও নজর থাকবে সংশ্লিষ্টদের।
পুলিশ জানিয়েছে, ৫ আগস্টের পর থেকেই মানিক সরকার আত্মগোপনে ছিলেন। তাকে ধরতে এর আগে কয়েক দফা চেষ্টা করা হলেও সফলতা আসেনি। শেষ পর্যন্ত স্থানীয়দের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তার নিজ বাড়িতে অবস্থানের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর অভিযান চালানো হয়।
এ ঘটনায় একটি বিষয় নতুন করে সামনে এসেছে—মামলার আসামিদের অবস্থান শনাক্তে স্থানীয় পর্যায়ে তথ্যের গুরুত্ব। অনেক ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানের পাশাপাশি স্থানীয় বাসিন্দাদের সহযোগিতাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। মানিক সরকারের ক্ষেত্রেও এমন তথ্যের ভিত্তিতেই তার অবস্থান শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।
গ্রেপ্তারের পর এখন তার বিরুদ্ধে থাকা মামলাগুলোর তদন্ত ও বিচারিক কার্যক্রম কতটা দ্রুত এগোয়, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি তিনি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে কোনো আইনগত জটিলতার মুখোমুখি হন কি না, সেটিও সামনে আসতে পারে।
স্থানীয়দের মধ্যে সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা হলো, রাজনৈতিক পরিচয় বা জনপ্রতিনিধির পদ যেন কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে থাকা অভিযোগের তদন্ত ও আইনগত প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত না করে। একইভাবে কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলেও তার বিচার যেন নিরপেক্ষ ও আইনানুগ প্রক্রিয়ায় সম্পন্ন হয়—এমন প্রত্যাশাও রয়েছে।
মানিক সরকারকে গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিনের আলোচিত একটি অধ্যায়ে আপাতত নতুন মোড় এসেছে। এখন তার বিরুদ্ধে থাকা মামলাগুলোর তদন্তে কী তথ্য বেরিয়ে আসে এবং আদালতের প্রক্রিয়ায় অভিযোগগুলোর কী পরিণতি হয়, সেটিই নির্ধারণ করবে পরবর্তী পরিস্থিতি।


