প্রকাশ: ১৫ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সিলেটের দক্ষিণ সুরমা থানার সাবেক দুই ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাহ মো. হারুন অর রশীদ ও খায়রুল ফজলকে জনস্বার্থে সরকারি চাকরি থেকে বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়া হয়েছে। বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পৃথক প্রজ্ঞাপনে তাঁদের অবসরের সিদ্ধান্ত জানানো হয়। একই আদেশে সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) পদমর্যাদার সাত কর্মকর্তা এবং পুলিশ পরিদর্শক পদমর্যাদার আরও ৪৯ কর্মকর্তাকেও অবসরে পাঠানো হয়েছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পুলিশ-১ ও পুলিশ-২ শাখা থেকে ৫৬ কর্মকর্তার বিষয়ে পৃথক দুটি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী এসব প্রজ্ঞাপনে স্বাক্ষর করেন। আদেশে বলা হয়েছে, সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮-এর ৪৫ ধারার বিধান অনুযায়ী জনস্বার্থে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সরকারি চাকরি থেকে অবসর দেওয়া হয়েছে এবং সিদ্ধান্তটি অবিলম্বে কার্যকর হবে।
সিলেটের ক্ষেত্রে বিষয়টি বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে কারণ অবসরে পাঠানো দুই পুলিশ পরিদর্শকই জেলার গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি থানায় ওসির দায়িত্ব পালন করেছেন। শাহ মো. হারুন অর রশীদ একাধিক সময়ে দক্ষিণ সুরমা থানার পাশাপাশি সিলেটের বিয়ানীবাজার ও গোয়াইনঘাট থানার ওসি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এর আগে তিনি হবিগঞ্জের আজমিরিগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার দায়িত্বেও ছিলেন।
অন্যদিকে খায়রুল ফজল দক্ষিণ সুরমা থানার পাশাপাশি সিলেটের এয়ারপোর্ট থানার ওসি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। ফলে সিলেটের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, থানাভিত্তিক প্রশাসনিক কার্যক্রম এবং অপরাধ নিয়ন্ত্রণে তাঁদের দায়িত্ব পালনের সময়কার বিভিন্ন কর্মকাণ্ডও এখন নতুন করে আলোচনায় আসছে।
তবে প্রজ্ঞাপনে তাঁদের বিরুদ্ধে কোনো নির্দিষ্ট অভিযোগ বা অপরাধের কারণ উল্লেখ করা হয়নি। সরকারি চাকরি আইন অনুযায়ী ২৫ বছর চাকরি পূর্ণ হওয়ার পর সরকার জনস্বার্থে কোনো কর্মকর্তাকে কোনো কারণ দর্শানো ছাড়াই অবসর দিতে পারে। ফলে ‘জনস্বার্থে অবসর’ শব্দবন্ধটি থাকলেও এর অর্থ এই নয় যে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কোনো অপরাধ প্রমাণিত হয়েছে। তাঁদের অবসর দেওয়ার পেছনে নির্দিষ্ট প্রশাসনিক মূল্যায়ন বা অন্য কোনো কারণ থাকলে তা প্রজ্ঞাপনে বিস্তারিতভাবে প্রকাশ করা হয়নি।
সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮-এর ৪৫ ধারায় বলা হয়েছে, কোনো সরকারি কর্মচারীর চাকরির মেয়াদ ২৫ বছর পূর্ণ হওয়ার পর যে কোনো সময় সরকার জনস্বার্থে প্রয়োজনীয় মনে করলে কোনো কারণ দর্শানো ছাড়াই তাঁকে চাকরি থেকে অবসর দিতে পারে। রাষ্ট্রপতি নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ হলে ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির অনুমোদনের বিধানও রয়েছে। একই আইনে অবসর গ্রহণের পর সরকারি কর্মচারীদের বিধি অনুযায়ী অবসরসংক্রান্ত সুবিধা পাওয়ার বিষয়টিও নির্ধারিত রয়েছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পুলিশ-২ শাখার প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ পুলিশের ৪৯ কর্মকর্তার চাকরির মেয়াদ ২৫ বছর পূর্ণ হয়েছে। সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮-এর ৪৫ ধারার বিধান অনুযায়ী জনস্বার্থে তাঁদের সরকারি চাকরি থেকে অবসর দেওয়া হয়েছে। আদেশটি অবিলম্বে কার্যকর হবে এবং অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা বিধি অনুযায়ী অবসরজনিত সব সুযোগ-সুবিধা পাবেন।
অন্যদিকে পুলিশ-১ শাখার প্রজ্ঞাপনে এএসপি পদমর্যাদার সাত কর্মকর্তাকেও একই আইনের আওতায় জনস্বার্থে অবসর দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে র্যাব সদর দপ্তর, ঢাকা মহানগর পুলিশ, খাগড়াছড়ি, পটুয়াখালী, র্যাব-২, ঢাকার রিজার্ভ রেঞ্জ ফোর্স এবং সিরাজগঞ্জে দায়িত্ব পালন করা কর্মকর্তারা রয়েছেন।
একসঙ্গে এতসংখ্যক পুলিশ কর্মকর্তাকে অবসরে পাঠানোর সিদ্ধান্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভ্যন্তরীণ প্রশাসনে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। বিশেষ করে পুলিশ পরিদর্শক পর্যায়ের ৪৯ কর্মকর্তার অবসর বিভিন্ন ইউনিট ও থানার দায়িত্ব বণ্টনে পরিবর্তন আনতে পারে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের স্থলে নতুন কর্মকর্তাদের দায়িত্ব দেওয়া হলে মাঠপর্যায়ের পুলিশিংয়েও এর প্রভাব পড়তে পারে।
সিলেটের দুই সাবেক ওসির ক্ষেত্রে তাঁদের কর্মজীবনের দায়িত্বের পরিধিও ছিল উল্লেখযোগ্য। দক্ষিণ সুরমা থানা সিলেট নগর ও জেলার গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশপথ ও বিভিন্ন আবাসিক-বাণিজ্যিক এলাকার আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এ ছাড়া বিয়ানীবাজার, গোয়াইনঘাট ও এয়ারপোর্ট থানার মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় ওসি হিসেবে দায়িত্ব পালন করায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কর্মজীবনে বিভিন্ন ধরনের প্রশাসনিক ও আইনশৃঙ্খলাজনিত অভিজ্ঞতা রয়েছে।
পুলিশে একজন ওসির দায়িত্ব কেবল থানার মামলা গ্রহণ বা তদন্ত তদারকির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। একটি থানার সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, অপরাধ নিয়ন্ত্রণ, স্থানীয় বিরোধ নিরসনে পুলিশের ভূমিকা, জনগণের সঙ্গে পুলিশের যোগাযোগ এবং অধীনস্থ সদস্যদের কার্যক্রম তদারকির বড় অংশই থানার ওসির নেতৃত্বে পরিচালিত হয়। ফলে কোনো সাবেক ওসিকে ঘিরে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত এলে তাঁর দায়িত্ব পালন করা এলাকার মানুষের মধ্যেও বিষয়টি নিয়ে আগ্রহ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।
তবে শাহ মো. হারুন অর রশীদ ও খায়রুল ফজলের অবসর নিয়ে কোনো ধরনের অনুমান বা অপ্রমাণিত অভিযোগকে সত্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে তাঁদের বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট কোনো অনিয়ম, দুর্নীতি, অসদাচরণ বা অপরাধের কথা উল্লেখ করা হয়নি। তাই তাঁদের অবসরের কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত বক্তব্য দিতে হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অতিরিক্ত ব্যাখ্যা বা নথি প্রয়োজন।
সাম্প্রতিক সময়ে সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘ চাকরির পর জনস্বার্থে অবসরের বিধান প্রয়োগ নিয়ে প্রশাসনিক ও জনপরিসরে আলোচনা রয়েছে। সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮-এর ৪৫ ধারা সরকারকে এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আইনি ক্ষমতা দিয়েছে। একই সঙ্গে আইনের আওতায় অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের বিধি অনুযায়ী অবসর-সুবিধা পাওয়ার বিষয়টিও নিশ্চিত করা হয়েছে।
সিলেটের দুই সাবেক ওসির অবসরের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর তাঁদের দায়িত্ব পালন করা থানাগুলোর সাবেক সহকর্মী ও স্থানীয়দের মধ্যেও আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে তাঁদের কর্মজীবনের মূল্যায়ন করতে হলে শুধু পদায়ন বা অবসরের সিদ্ধান্ত নয়, দায়িত্ব পালনের সময়কার সরকারি নথি, প্রশাসনিক রেকর্ড এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
সবশেষে বলা যায়, শাহ মো. হারুন অর রশীদ ও খায়রুল ফজলসহ ৫৬ পুলিশ কর্মকর্তাকে জনস্বার্থে অবসর দেওয়ার সিদ্ধান্ত স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি প্রশাসনিক পদক্ষেপ। এটি ১৩ আগস্ট জারি করা প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর হয়েছে। অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা বিধি অনুযায়ী তাঁদের প্রাপ্য অবসর সুবিধা পাবেন। তবে কেন তাঁদের অবসরে পাঠানো হলো, সে বিষয়ে প্রজ্ঞাপনে বিস্তারিত কারণ না থাকায় এখন পর্যন্ত এ সিদ্ধান্তকে প্রশাসনিক ক্ষমতার আওতায় নেওয়া একটি পদক্ষেপ হিসেবেই দেখা যাচ্ছে।


