প্রকাশ: ১৫ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ইতিহাস গড়ার হাতছানি বাংলাদেশের সামনে। ডারউইন টেস্টের তৃতীয় দিন শেষে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ অনেকটাই নিজেদের হাতে নিয়ে নিয়েছে নাজমুল হোসেন শান্তর দল। স্বাগতিকদের প্রথম ইনিংসে মাত্র ১৯৮ রানে গুটিয়ে দেওয়ার পর বাংলাদেশ নিজেদের প্রথম ইনিংসে করেছে ৪২৬ রান। ফলে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ২২৮ রানের বিশাল লিড পেয়েছে সফরকারীরা। তৃতীয় দিনের খেলা শেষে অবশ্য অস্ট্রেলিয়া দ্বিতীয় ইনিংসে ১৬১ রান তুলেছে ৪ উইকেট হারিয়ে। অর্থাৎ এখনো ৬৭ রানে পিছিয়ে আছে স্বাগতিকরা।
বাংলাদেশের সামনে এখন অপেক্ষা করছে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে একটি স্মরণীয় জয়ের সম্ভাবনা। অন্যদিকে ইনিংস পরাজয় এড়াতে অস্ট্রেলিয়াকে প্রথমে বাংলাদেশের ২২৮ রানের লিড পেরোতে হবে। এরপর ম্যাচে বাংলাদেশকে আবার ব্যাট করতে নামিয়ে চাপ সৃষ্টি করতে পারলে তবেই স্বস্তি পাবে স্বাগতিকরা। ফলে চতুর্থ দিনের শুরু থেকেই দুই দলের জন্য ম্যাচটি হয়ে উঠেছে স্নায়ুচাপের এক বড় পরীক্ষা।
অস্ট্রেলিয়াকে প্রথম ইনিংসে ১৯৮ রানে অলআউট করার পর দ্বিতীয় দিন শেষে বাংলাদেশ ৬ উইকেটে ৩৫১ রান করেছিল। দিনের শেষদিকে হাসান মাহমুদ ও মেহেদী হাসান মিরাজের দৃঢ়তায় বাংলাদেশের লিড আরও বড় হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়। তৃতীয় দিনের শুরুতেও সেই সম্ভাবনাই বাস্তবে রূপ নেয়।
শনিবার সকালে ব্যাট হাতে নামার পর অবশ্য বাংলাদেশকে শুরুতেই ধাক্কা দেন জশ হেইজেলউড। আগের দিন মিরাজের সঙ্গে প্রতিরোধ গড়ে তোলা হাসান মাহমুদকে এলবিডব্লিউ করে ফেরান তিনি। ১৪ রান করা হাসানের বিদায়ে ভেঙে যায় ১৭০ বল স্থায়ী ৪৬ রানের জুটি। বাংলাদেশের লোয়ার অর্ডারের ওপর তখন বাড়তে থাকে চাপ।
এরপর তাইজুল ইসলাম ক্রিজে এসে কিছুটা আক্রমণাত্মক হওয়ার চেষ্টা করেন। একটি ছক্কাও হাঁকান তিনি। কিন্তু বেশিক্ষণ টিকতে পারেননি। হেইজেলউডের বলেই গালিতে ক্যামেরন গ্রিনের হাতে ক্যাচ দিয়ে ১৭ রানে ফিরে যান তাইজুল। ফলে বাংলাদেশের ইনিংস দ্রুত শেষ হওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয়।
তবে অন্য প্রান্তে অবিচল ছিলেন মেহেদী হাসান মিরাজ। দলের প্রয়োজনের মুহূর্তে ব্যাট হাতে দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিয়ে তিনি টেস্ট ক্যারিয়ারের ১২তম অর্ধশতক তুলে নেন। মিচেল স্টার্কের বলে দুই রান নিয়ে ১১৭ বলে ফিফটি পূর্ণ করেন এই অলরাউন্ডার। তাঁর ব্যাটিংয়ে ছিল ধৈর্য, নিয়ন্ত্রণ এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী শট খেলার অসাধারণ ক্ষমতা।
মিরাজের সঙ্গে এরপর জুটি বাঁধেন তাসকিন আহমেদ। নবম উইকেটে দুজন মিলে ৯৬ বল মোকাবিলা করে যোগ করেন গুরুত্বপূর্ণ ৪৬ রান। বাংলাদেশের ইনিংসকে চারশর ওপারে নিয়ে যেতে এই জুটির অবদান ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অস্ট্রেলিয়ার বোলাররা যখন দ্রুত শেষ উইকেটগুলো তুলে নেওয়ার চেষ্টা করছিলেন, তখন মিরাজ ও তাসকিনের প্রতিরোধ স্বাগতিকদের জন্য নতুন করে হতাশার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
এই জুটির সময় অস্ট্রেলিয়ার ফিল্ডিংয়েও বড় দুটি সুযোগ হাতছাড়া হয়। প্যাট কামিন্সের এক ওভারে স্টিভেন স্মিথ ও ট্রাভিস হেড যথাক্রমে তাসকিন ও মিরাজের ক্যাচ ফেলে দেন। তাসকিন তখন ১০ রানে এবং মিরাজ ৫২ রানে ব্যাট করছিলেন। দুটি সুযোগ কাজে লাগাতে পারলে বাংলাদেশের ইনিংস আরও আগেই শেষ হতে পারত। কিন্তু জীবন পেয়ে মিরাজ ও তাসকিন আরও কিছু রান যোগ করেন।
মিরাজের ব্যাটিং শেষ পর্যন্ত থামান হেইজেলউড। ১৫২ বল মোকাবিলা করে পাঁচটি চার ও একটি ছক্কার সাহায্যে ৬৫ রান করেন মিরাজ। তাঁর বিদায় শুধু বাংলাদেশের ইনিংসের সমাপ্তির পথই খুলে দেয়নি, হেইজেলউডের ক্যারিয়ারেও এনে দেয় স্মরণীয় এক মাইলফলক। মিরাজকে আউট করেই টেস্ট ক্রিকেটে ৩০০ উইকেটের মাইলফলক স্পর্শ করেন অস্ট্রেলিয়ার অভিজ্ঞ এই পেসার।
এরপর শেষ ব্যাটার ইবাদত হোসেনকে ৭ রানে ফিরিয়ে বাংলাদেশের ইনিংস শেষ করেন হেইজেলউড। ফলে তৃতীয় দিনে বাংলাদেশের চারটি উইকেটই শিকার করেন তিনি। তাঁর বোলিং ফিগার দাঁড়ায় ৬ উইকেটে ৮৯ রান। অস্ট্রেলিয়ার হয়ে টেস্ট ক্রিকেটে ৩০০ উইকেট নেওয়া বোলারদের বিশেষ তালিকায় জায়গা করে নেন হেইজেলউড।
বাংলাদেশের ইনিংস শেষ হয় ৪২৬ রানে। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে এত দীর্ঘ সময় ধরে ব্যাট করে স্বাগতিকদের চাপে রাখার দৃশ্য বাংলাদেশের ক্রিকেটে খুব বেশি দেখা যায়নি। ১৩৮ ওভার ব্যাট করে বাংলাদেশের এই সংগ্রহ কেবল বড় লিডই এনে দেয়নি, অস্ট্রেলিয়ার বোলিং আক্রমণকেও দীর্ঘ সময় ধরে ক্লান্ত করে দিয়েছে।
বাংলাদেশের ২২৮ রানের লিডের পর দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাট করতে নেমে শুরু থেকেই চাপে পড়ে অস্ট্রেলিয়া। স্বাগতিকদের টপ অর্ডারে দ্রুত কয়েকটি উইকেট পতন ঘটে। বাংলাদেশের বোলাররা নিয়মিত চাপ ধরে রাখায় অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটারদের স্বাভাবিক ছন্দে খেলা কঠিন হয়ে পড়ে। মেহেদী হাসান মিরাজ ও তাইজুল ইসলাম স্পিন দিয়ে যেমন চাপ তৈরি করেন, তেমনি পেসাররাও অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং লাইনআপকে অস্বস্তিতে রাখেন।
অস্ট্রেলিয়ার হয়ে স্টিভেন স্মিথ ৪৪ রান করে ফেরেন। মেহেদী হাসান মিরাজের বলে তাঁর বিদায় বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য হয়ে আসে। মর্নাস লাবুশেনও ৩১ রানে ফিরে যান। ট্রাভিস হেড ও জেক ওয়েদারাল্ডও বড় ইনিংস খেলতে পারেননি। ফলে ২২৮ রানের লিডের জবাব দিতে নেমে স্বাগতিকরা একপর্যায়ে বড় বিপদে পড়ে যায়।
তবে দিনের শেষদিকে ক্যামেরন গ্রিন ও অ্যালেক্স ক্যারি প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। গ্রিন অপরাজিত ৪৩ রান এবং ক্যারি ১৯ রান নিয়ে দিন শেষ করেন। তাঁদের জুটি অস্ট্রেলিয়াকে অন্তত চতুর্থ দিনের শুরু পর্যন্ত টেনে নিয়ে গেছে। কিন্তু এখনো বাংলাদেশের লিড পেরোতে হলে অস্ট্রেলিয়াকে অনেকটা পথ পাড়ি দিতে হবে।
তৃতীয় দিনের শেষ হিসাব বলছে, অস্ট্রেলিয়ার সামনে প্রথম কাজ হলো বাংলাদেশের ২২৮ রানের লিড মুছে ফেলা। হাতে রয়েছে ছয় উইকেট। ফলে বাংলাদেশের বোলারদের জন্য চতুর্থ দিনের প্রথম সেশনটি হতে পারে ম্যাচের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। দ্রুত কয়েকটি উইকেট তুলে নিতে পারলে অস্ট্রেলিয়াকে ইনিংস পরাজয়ের দিকে ঠেলে দেওয়া সম্ভব হবে। অন্যদিকে গ্রিন ও ক্যারির প্রতিরোধ দীর্ঘ হলে ম্যাচের সমীকরণও বদলে যেতে পারে।
এই টেস্টে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি হয়ে উঠেছে সম্মিলিত পারফরম্যান্স। প্রথম ইনিংসে ব্যাটাররা দীর্ঘ সময় ধরে অস্ট্রেলিয়ার বোলারদের মোকাবিলা করেছেন। লোয়ার অর্ডারও গুরুত্বপূর্ণ সময়ে রান করেছে। এরপর বল হাতে অস্ট্রেলিয়ার শক্তিশালী ব্যাটিং লাইনআপকে চাপে ফেলেছেন বাংলাদেশের বোলাররা। সব মিলিয়ে তিন দিন শেষে সফরকারীদের পারফরম্যান্সে আত্মবিশ্বাসের ছাপ স্পষ্ট।
অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশের টেস্ট ইতিহাস খুব সমৃদ্ধ নয়। তাই ডারউইনে এই ম্যাচের বর্তমান অবস্থানকে ঘিরে দেশের ক্রিকেটপ্রেমীদের প্রত্যাশাও বেড়েছে। স্বাগতিকদের বিপক্ষে প্রথম ইনিংসে ২২৮ রানের লিড নেওয়া নিঃসন্দেহে বড় অর্জন। তবে টেস্ট ক্রিকেটে তিন দিন ভালো খেলা আর ম্যাচ জেতার মধ্যে ব্যবধান অনেক। বাংলাদেশের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো শেষ পর্যন্ত এই নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা।
চতুর্থ দিনের শুরুতে তাই নজর থাকবে অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিংয়ে। গ্রিন ও ক্যারি কতক্ষণ প্রতিরোধ গড়তে পারেন, বাংলাদেশের পেসাররা নতুন বল হাতে কী করেন এবং মিরাজ-তাইজুলের স্পিন কতটা কার্যকর হয়—এসবের ওপরই অনেকটা নির্ভর করবে ম্যাচের পরিণতি।
ডারউইনের মাটিতে এখন ইতিহাসের দরজা যেন বাংলাদেশের সামনে খানিকটা খুলে গেছে। ৪২৬ রানের শক্ত ভিত, ২২৮ রানের লিড এবং অস্ট্রেলিয়ার দ্বিতীয় ইনিংসে চার উইকেট তুলে নেওয়ার পর শান্তর দল নিশ্চিতভাবেই চালকের আসনে। তবে ক্রিকেটে শেষ বল না হওয়া পর্যন্ত জয় নিশ্চিত নয়। চতুর্থ দিনে সেই অসমাপ্ত কাজটিই শেষ করতে হবে বাংলাদেশকে। আর যদি তারা সেটি করতে পারে, অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে পাওয়া সেই জয় বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটের অন্যতম স্মরণীয় অধ্যায় হয়ে থাকবে।


