প্রকাশ: ১৫ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সিলেট নগরের রায়নগরে প্রবীণ ব্যবসায়ী আব্দুস সাত্তার, তাঁর স্ত্রী সুরাইয়া বেগম ও গৃহকর্মী তাহমিনা বেগমকে নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনায় তদন্তে নতুন করে আলোচনায় এসেছে দীর্ঘদিনের একটি জমি বিরোধ। নিহত আব্দুস সাত্তারের মেয়ে সেলিনা সুলতানা কোতোয়ালি থানায় দেওয়া এজাহারে অ্যাডভোকেট সিরাজুল ইসলামের বিরুদ্ধে সরাসরি হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ না এনে তাঁর সম্পৃক্ততার বিষয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। তাঁর দাবি, জমি নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধ, মামলা ও হুমকির ধারাবাহিকতার সঙ্গে তিনজনের হত্যাকাণ্ডের যোগসূত্র থাকতে পারে।
তবে এজাহারে উত্থাপিত অভিযোগের সত্যতা এখনো তদন্তে প্রমাণিত হয়নি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ, পরিকল্পনাকারী, হত্যাকারী এবং এর পেছনে অন্য কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখছে। ফলে অভিযোগ ও সন্দেহকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
গত বুধবার সকালে রায়নগরের মিতালী আবাসিক এলাকার ১১১ নম্বর বাসার দ্বিতীয় তলা থেকে আব্দুস সাত্তার, তাঁর স্ত্রী সুরাইয়া বেগম এবং গৃহকর্মী তাহমিনার গলাকাটা মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। ৯০ বছর বয়সী আব্দুস সাত্তার এবং ৭৬ বছর বয়সী সুরাইয়া বেগম দীর্ঘদিন ধরে ওই বাসায় বসবাস করছিলেন। তাঁদের সঙ্গে থাকা ১৮ বছর বয়সী গৃহকর্মী তাহমিনাও ওই ঘটনায় প্রাণ হারান। একই পরিবারের দুই প্রবীণ সদস্য ও তাঁদের সঙ্গে থাকা তরুণ গৃহকর্মীর এমন মৃত্যু সিলেট নগরে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে।
হত্যাকাণ্ডের পর থেকেই সম্ভাব্য কারণ হিসেবে সম্পত্তি ও জমিসংক্রান্ত বিরোধের বিষয়টি আলোচনায় আসে। নিহত আব্দুস সাত্তারের পরিবারের সঙ্গে রিকাবীবাজারের পুলিশ লাইন লুসাই গির্জা সমিতির জমি নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধ ছিল বলে বিভিন্ন নথি ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্যে উঠে এসেছে। এই বিরোধে অ্যাডভোকেট সিরাজুল ইসলামের নামও আগে থেকেই আলোচিত ছিল।
সেলিনা সুলতানা তাঁর এজাহারে উল্লেখ করেছেন, ১৯৯৭ সালে তিনি ও তাঁর বাবা পুলিশ লাইন লুসাই গির্জা সমিতির কাছ থেকে রিকাবীবাজারের সরষপুর এলাকায় প্রায় ১২ শতক জমি লিজ নিয়ে সেখানে বসবাস শুরু করেন। পরে ২০০৬ সালে ইম্পালস বিল্ডার্স লিমিটেডের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট সিরাজুল ইসলাম তাঁদের লিজ নেওয়া জমিসহ সমিতির প্রায় ৮০ শতক জমি প্রতিষ্ঠানটির নামে একটি সাফকবলা দলিলের মাধ্যমে নেওয়ার উদ্যোগ নেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
এ নিয়ে ২০১৬ সালে আব্দুস সাত্তার সিরাজুল ইসলামের বিরুদ্ধে স্বত্ব মামলা করেন বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে। মামলাটি পরবর্তী সময়ে স্বত্ব-২১১/২০২৩ নম্বরে রূপান্তরিত হয়ে আদালতে বিচারাধীন রয়েছে বলে দাবি করেছেন বাদী। একই জমি নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে একাধিক মামলা ও পাল্টাপাল্টি আইনি বিরোধ তৈরি হয়।
সেলিনার অভিযোগ, এসব মামলা প্রত্যাহারের জন্য বিভিন্ন সময়ে তাঁকে ও তাঁর বাবাকে হুমকি দেওয়া হয়েছে। এজাহারে ২০২৫ সালের ২৯ জানুয়ারি সিরাজুল ইসলাম কয়েকজনকে সঙ্গে নিয়ে তাঁদের বাসায় গিয়ে মামলা প্রত্যাহারের জন্য চাপ ও হুমকি দেওয়ার অভিযোগও করা হয়েছে। ওই ঘটনার পর সাধারণ ডায়েরি করা হয়েছিল বলে এজাহারে উল্লেখ রয়েছে।
এ ছাড়া ২০২৫ সালের ১৮ মে সিলেট জেলা ও দায়রা জজ আদালতের সামনে মামলাসংক্রান্ত বিরোধের জেরে সিরাজুল ইসলাম মুহাম্মদ তৌহিদুল ইসলামকে মারধর করে আহত করেন বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। পরে এ ঘটনায় আদালতে মামলা হয় এবং বিষয়টি তদন্তাধীন রয়েছে বলে এজাহারে দাবি করা হয়েছে।
সর্বশেষ গত ২৮ জুলাই ভূমিসংক্রান্ত একটি মামলার শুনানির সময় আব্দুস সাত্তারের নিয়োজিত আইনজীবীকে প্রকাশ্যে হুমকি দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেছেন সেলিনা। এরপর ৩০ জুলাই তাঁর বাবা আদালতে গেলে তাঁকেও মামলা প্রত্যাহারের জন্য আবারও হুমকি দেওয়া হয়েছিল বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়। এসব ঘটনার ধারাবাহিকতা তুলে ধরে সেলিনা সন্দেহ করছেন, তাঁর বাবা-মা ও গৃহকর্মীর হত্যাকাণ্ড পূর্বপরিকল্পিত হতে পারে।
এজাহারে আরও গুরুতর অভিযোগ করা হয়েছে যে, স্বত্ব মামলায় বিতর্কিত দলিলটি রক্ষা করার উদ্দেশ্যে ভাড়াটে খুনিদের ব্যবহার করে গত ১২ আগস্ট সকাল আনুমানিক ৯টার দিকে তিনজনকে হত্যা করা হয়। একই সঙ্গে বাসা থেকে গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র, জিডির কপি ও দলিলপত্র নিয়ে যাওয়ার অভিযোগও করেছেন নিহতের মেয়ে। এসব অভিযোগের কোনোটিই এখনো আদালত বা তদন্তকারী সংস্থার মাধ্যমে চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয়নি।
হত্যাকাণ্ডের পর সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় সেলিনা সুলতানা বলেন, তিনি বিশ্বাস করেন না যে একজন ব্যক্তি একাই তিনজনকে হত্যা করতে পারে। তাঁর ধারণা, এর পেছনে আরও বড় কোনো পক্ষ থাকতে পারে। বাবা-মায়ের এমন পরিণতি যেন আর কোনো পরিবারের জন্য না আসে—এই আকুতিও জানান তিনি।
এদিকে, অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে অ্যাডভোকেট সিরাজুল ইসলাম বলেন, বিষয়টি নিয়ে সিলেটে কয়েক দিন ধরে আলোচনা চলছে এবং তদন্ত হওয়া উচিত। পরে এ বিষয়ে কথা বলবেন বলেও জানান তিনি। অর্থাৎ হত্যাকাণ্ডে নিজের সম্পৃক্ততার অভিযোগ তিনি স্বীকার করেননি এবং বিষয়টি তদন্তের মাধ্যমে পরিষ্কার হওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
সিরাজুল ইসলামকে ঘিরে আলোচিত জমি বিরোধের ইতিহাসও দীর্ঘ। ২০২২ সালের আগস্টে দুর্নীতি দমন কমিশনের একটি মামলায় তাঁর জামিন নামঞ্জুর করে তাঁকে কারাগারে পাঠানোর তথ্য বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদনে পাওয়া যায়। ওই মামলায় রিকাবীবাজারের পুলিশ লাইন লুসাই গির্জা সমিতির জমি ও কবরস্থানসংক্রান্ত দলিল, জমির শ্রেণি পরিবর্তন এবং নামজারি নিয়ে অভিযোগ আনা হয়েছিল। মামলায় সিরাজুল ইসলামের পাশাপাশি ভূমি ও নিবন্ধন বিভাগের কয়েকজন কর্মকর্তাকেও আসামি করা হয়েছিল।
ওই মামলার পটভূমিতে ২০০৬ সালে করা ১৮৫২২/০৬ নম্বর সাফকবলা দলিলটি বিশেষভাবে আলোচিত হয়। সংবাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, গির্জা সমিতির জমি নিয়ে বিরোধের একপর্যায়ে আদালতে মামলা হয় এবং ২০১৪ সালের ২৮ অক্টোবর ওই দলিল বাতিলের আদেশের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে জমি ও ভবনকে কেন্দ্র করে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে একাধিক মামলা হয়।
২০২৫ সালের একটি সংবাদ সম্মেলনেও পুলিশ লাইন লুসাই গির্জা সমিতির ভূমি নিয়ে সিরাজুল ইসলামের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ তোলা হয়েছিল। সেখানে ১৮৫২২/২০০৬ নম্বর দলিল, জমির মালিকানা এবং একাধিক মামলার বিষয় তুলে ধরা হয়। একই সঙ্গে এম এ সাত্তার ও সেলিনা সুলতানার ভূমি নিয়েও বিরোধের কথা বলা হয়েছিল। তবে এসব অভিযোগও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্য ও মামলা-সংক্রান্ত দাবি হিসেবে বিবেচিত হওয়া প্রয়োজন; কোনো অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে অপরাধী সাব্যস্ত করা যায় না।
আব্দুস সাত্তারের আইনজীবী ও মামলা-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্যেও হত্যাকাণ্ডের আগে জমি নিয়ে উত্তেজনার বিষয়টি উঠে এসেছে। তাঁদের দাবি, আদালতে মামলার কাজে নিয়মিত আসা-যাওয়া করতেন আব্দুস সাত্তার এবং হত্যার কিছুদিন আগেও তাঁকে মামলা নিয়ে হয়রানি বা হুমকির মুখে পড়তে হয়েছিল। এসব বক্তব্য এখন তদন্তকারীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হতে পারে, যদিও এগুলোর সত্যতা তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।
হত্যাকাণ্ডের পর স্থানীয় রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিমণ্ডলেও সম্পত্তি বিরোধের সম্ভাব্য ভূমিকা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। স্থানীয় বিএনপি নেতা আব্দুর রাজ্জাকও ঘটনাস্থলে গিয়ে সম্পত্তি নিয়ে বিরোধের সম্ভাবনার কথা জানিয়েছিলেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, নিহত পরিবারের একটি সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ ছিল। তবে তিনিও হত্যাকাণ্ডের কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত কোনো তথ্য দেননি।
সব মিলিয়ে রায়নগরের এই ট্রিপল মার্ডার এখন শুধু তিনটি প্রাণহানির তদন্ত নয়, বরং দীর্ঘদিনের জমি বিরোধ, আদালতে চলমান মামলা, অতীতের অভিযোগ, সম্ভাব্য হুমকি এবং হত্যাকাণ্ডের আগে-পরে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোর একটি জটিল সমীকরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—কারা পরিকল্পনা করেছিল, কারা হত্যাকাণ্ড বাস্তবায়ন করেছে এবং এর পেছনে কোনো স্বার্থ বা বিরোধ কাজ করেছে কি না।
তদন্তে যদি জমি বিরোধের সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের কোনো যোগসূত্র পাওয়া যায়, তাহলে মামলাটি নতুন মাত্রা পেতে পারে। আবার তদন্তে ভিন্ন কোনো কারণ বা অন্য কোনো ব্যক্তির সম্পৃক্ততা বেরিয়ে এলে বর্তমান আলোচনার অনেকটাই বদলে যেতে পারে। তাই নিহত পরিবারের ন্যায়বিচারের স্বার্থে অনুমান বা জনমতের বদলে প্রমাণ, ফরেনসিক তথ্য, সাক্ষ্য এবং আইনি প্রক্রিয়ার ভিত্তিতেই প্রকৃত রহস্য উদঘাটন এখন সবচেয়ে জরুরি।


