প্রকাশ: ১৫ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেছেন, ঋণের চাপ সামাল দিতে না পারলে ভবিষ্যতে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন দেওয়াও কঠিন হয়ে যেতে পারে। এ জন্য সঠিক পরিকল্পনা, আর্থিক শৃঙ্খলা এবং দায়িত্বশীলভাবে সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনার ওপর জোর দিয়েছেন তিনি।
শুক্রবার (১৪ আগস্ট) সিরাজগঞ্জ পৌরসভার হলরুমে পৌরসভার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় এসব কথা বলেন মন্ত্রী। তাঁর বক্তব্যে দেশের অর্থনীতিতে বিদ্যমান ঋণের বোঝা, সরকারের ব্যয় পরিচালনা এবং উন্নয়ন পরিকল্পনার মধ্যে সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তা উঠে আসে।
ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, বাংলাদেশ এখন একটি কঠিন বাস্তবতার মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে। অতীতে নেওয়া বিপুল ঋণের কারণে রাষ্ট্রের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় চাপ তৈরি হয়েছে। ভবিষ্যতে এই চাপ আরও বাড়তে পারে। তাঁর ভাষায়, যথাযথ পরিকল্পনা না থাকলে এমন পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে, যখন সরকারি কর্মকর্তাদের বেতন দেওয়াও কঠিন হয়ে পড়বে।
মন্ত্রীর এই বক্তব্য এমন এক সময়ে এসেছে, যখন সরকারের আয়-ব্যয়ের ভারসাম্য, ঋণ পরিশোধ এবং বিভিন্ন খাতে ব্যয় ব্যবস্থাপনা নিয়ে অর্থনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা চলছে। সরকারি ঋণের পরিমাণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সুদ ও আসল পরিশোধের দায়ও বাড়ছে। ফলে উন্নয়ন ব্যয়, পরিচালন ব্যয় এবং সামাজিক ও অর্থনৈতিক বিভিন্ন কর্মসূচির জন্য অর্থের সংস্থান নিশ্চিত করা সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।
সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বিষয়গুলোর একটি হলো আয় ও ব্যয়ের মধ্যে ভারসাম্য। রাজস্ব আদায় প্রত্যাশা অনুযায়ী না হলে সরকারের নিজস্ব আয় কমে যায়। তখন বাজেটের বিভিন্ন ব্যয় মেটাতে দেশি-বিদেশি উৎস থেকে ঋণ নেওয়ার প্রয়োজন হয়। ঋণের পরিমাণ বাড়তে থাকলে ভবিষ্যতে সেই ঋণের সুদ ও কিস্তি পরিশোধের জন্যও বাজেটের বড় অংশ ব্যয় করতে হয়। অর্থনীতিবিদদের আলোচনায়ও সাম্প্রতিক সময়ে সরকারের ঋণ ও রাজস্ব ঘাটতির বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।
সরকারি তথ্যভিত্তিক অর্থনৈতিক পর্যালোচনায় দেখা যায়, রাষ্ট্রের ওপর বিদ্যমান ঋণের চাপ আগামী বছরগুলোতে আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এর সঙ্গে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের বকেয়া, বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের ব্যয় এবং সরকারি পরিচালন ব্যয়ের চাপও যুক্ত হচ্ছে। ফলে নতুন অর্থনৈতিক কর্মসূচি বাস্তবায়নের পাশাপাশি পুরোনো দায় পরিশোধের জন্য সরকারের সামনে বড় ধরনের আর্থিক পরিকল্পনার প্রয়োজন রয়েছে।
মতবিনিময় সভায় মন্ত্রী বলেন, শুধু অর্থ ব্যয় করলেই উন্নয়ন হয় না; উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন সঠিক পরিকল্পনা। কোনো প্রকল্প নেওয়ার আগে তার প্রয়োজনীয়তা, অর্থনৈতিক সক্ষমতা, দীর্ঘমেয়াদি সুফল এবং রক্ষণাবেক্ষণের বিষয়গুলো বিবেচনা করা জরুরি। পরিকল্পনাহীনভাবে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনা করলে একদিকে অর্থের অপচয় হতে পারে, অন্যদিকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর ঋণের বোঝা বাড়তে পারে।
তিনি বলেন, সরকার এমন একটি বাজেট প্রণয়ন করেছে যাতে সাধারণ মানুষের ওপর অতিরিক্ত করের চাপ না পড়ে। তবে সেই বাজেট বাস্তবায়নের জন্য সরকার একা কাজ করলে হবে না। সাধারণ মানুষ, জনপ্রতিনিধি এবং প্রশাসনের সমন্বিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন। রাজস্ব আহরণ থেকে শুরু করে সরকারি অর্থের সঠিক ব্যবহার—প্রতিটি ক্ষেত্রে দায়িত্বশীলতা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
দেশের অর্থনীতিতে রাজস্ব আহরণ একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। সরকারের দৈনন্দিন পরিচালন ব্যয়, উন্নয়ন কর্মকাণ্ড, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা এবং ঋণের সুদ পরিশোধসহ বিভিন্ন খাতে অর্থের প্রয়োজন হয়। এসব ব্যয়ের বড় অংশ আসে সরকারের রাজস্ব থেকে। রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি তৈরি হলে সরকারের ঋণনির্ভরতা বাড়তে পারে। এ কারণে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে রাজস্ব ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার পাশাপাশি সরকারি ব্যয়ে দক্ষতা বাড়ানোও জরুরি।
মন্ত্রীর বক্তব্যে শুধু ঋণের চাপের বিষয়টি নয়, উন্নয়ন পরিকল্পনায় বাস্তবতা বিবেচনার প্রয়োজনীয়তাও গুরুত্ব পেয়েছে। তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, জনগণের প্রয়োজন বিবেচনা না করে কিংবা দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক সক্ষমতা যাচাই না করে প্রকল্প গ্রহণ করা হলে তা শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
সিরাজগঞ্জ পৌরসভার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় স্থানীয় প্রশাসনের কার্যক্রম নিয়েও আলোচনা হয়। এ সময় শহরের পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম আরও কার্যকর করার উদ্যোগ হিসেবে ডাম্প ট্রাকসহ ছয়টি গাড়ি বিতরণ করেন মন্ত্রী। পৌরসভার বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমে এসব যানবাহন ব্যবহারের কথা রয়েছে।
নতুন গাড়ি ব্যবহারের প্রসঙ্গেও নিজের অনুভূতির কথা তুলে ধরেন ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু। তিনি বলেন, গাড়িতে ওঠা নিয়ে কেউ কেউ চায়ের দোকানে সমালোচনা করতে পারেন—এটি তিনি জানেন। তবে মানুষকে দেখানোর জন্য তিনি ট্রাকে ওঠেননি। বরং বহু বছর আগে দেখা পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমের একটি স্মৃতি থেকেই তিনি গাড়িতে উঠেছেন বলে জানান।
মন্ত্রী বলেন, তিন-চার দশক আগে ঘুম থেকে উঠে রাস্তায় পরিচ্ছন্নতার কাজে এমন গাড়ি চলতে দেখেছেন। রাস্তা পরিষ্কার হয়ে চকচক করছে—এমন দৃশ্য তাঁকে আনন্দ দিত। সেই পুরোনো স্মৃতি থেকেই নতুন পরিচ্ছন্নতা গাড়ির সঙ্গে নিজের উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন বলে জানান তিনি।
স্থানীয় পর্যায়ে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমকে আরও গতিশীল করতে পৌরসভাগুলোর সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন। বিশেষ করে দ্রুত বাড়তে থাকা শহরগুলোতে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, রাস্তা পরিষ্কার, ড্রেনেজ ব্যবস্থা এবং জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার সঙ্গে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম সরাসরি সম্পর্কিত। পর্যাপ্ত যানবাহন ও জনবল না থাকলে নিয়মিত বর্জ্য অপসারণ কঠিন হয়ে পড়ে। নতুন গাড়ি যুক্ত হলে পৌরসভার দৈনন্দিন পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমে কিছুটা গতি আসতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন।
তবে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রে শুধু নতুন অবকাঠামো বা যানবাহন সরবরাহ করাই যথেষ্ট নয়। এসব সম্পদের রক্ষণাবেক্ষণ, জ্বালানি ব্যয়, চালক ও কর্মীদের ব্যবস্থাপনা এবং দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর রাখার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থানও নিশ্চিত করতে হয়। এ কারণেই মন্ত্রীর বক্তব্যে উঠে আসা সঠিক পরিকল্পনার বিষয়টি স্থানীয় পর্যায়ের উন্নয়ন প্রকল্পের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ।
দেশের অর্থনীতির সামনে বর্তমানে একাধিক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। একদিকে সরকারি ঋণ ও ঋণের সুদ পরিশোধের চাপ, অন্যদিকে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাওয়া এবং সাধারণ মানুষের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ না দেওয়ার বিষয়টি সরকারের জন্য ভারসাম্যের কাজ। একই সঙ্গে সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, পেনশন, সামাজিক নিরাপত্তা এবং বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় সেবার ব্যয়ও নিয়মিত চালিয়ে যেতে হয়।
এ অবস্থায় সরকারের জন্য রাজস্ব আয় বাড়ানোর পাশাপাশি অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানো, প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং ঋণের অর্থ উৎপাদনশীল খাতে ব্যবহার করা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ঋণ যদি এমন প্রকল্পে ব্যবহৃত হয়, যেখান থেকে ভবিষ্যতে অর্থনৈতিক সুফল পাওয়া যায়, তাহলে তা রাষ্ট্রের সক্ষমতা বাড়াতে পারে। কিন্তু পরিকল্পনাহীন বা কম ফলপ্রসূ ব্যয়ে ঋণ ব্যবহার করা হলে ভবিষ্যতে সুদ ও আসল পরিশোধের চাপ আরও বাড়তে পারে।
সিরাজগঞ্জের মতবিনিময় সভায় মন্ত্রীর বক্তব্য তাই শুধু সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন নিয়ে একটি আশঙ্কার কথা নয়; এর মধ্যে রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার প্রয়োজনীয়তার বিষয়টিও রয়েছে। উন্নয়ন, জনসেবা এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ধারাকে সচল রাখার পাশাপাশি ঋণের বোঝা নিয়ন্ত্রণে রাখা না গেলে ভবিষ্যতে সরকারের আর্থিক সক্ষমতার ওপর চাপ তৈরি হতে পারে।
অর্থনীতির এই বাস্তবতায় সরকারের সামনে মূল চ্যালেঞ্জ হলো কীভাবে সাধারণ মানুষের ওপর অতিরিক্ত করের চাপ না বাড়িয়ে রাজস্ব আয় বৃদ্ধি করা যায় এবং একই সঙ্গে সরকারি ব্যয়কে আরও দক্ষ ও ফলপ্রসূ করা যায়। কারণ রাষ্ট্রের আয়-ব্যয়ের ভারসাম্য যতটা শক্তিশালী হবে, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন থেকে শুরু করে নাগরিক সেবা ও উন্নয়ন কর্মসূচির ধারাবাহিকতাও তত বেশি নিরাপদ থাকবে।
ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর বক্তব্যের মধ্য দিয়ে সেই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার প্রয়োজনীয়তাই নতুন করে সামনে এসেছে। ঋণ নিয়ে উন্নয়ন করা যেতে পারে, কিন্তু সেই ঋণের অর্থ কীভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে এবং ভবিষ্যতে তা কীভাবে পরিশোধ করা হবে—এই দুই প্রশ্নের উত্তর নিশ্চিত করাই এখন রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যবস্থাপনার অন্যতম বড় দায়িত্ব।


