প্রকাশ: ০৭ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
জুলাই-আগস্টের রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে দেশ থেকে ফ্যাসিবাদী শক্তির পতন ঘটানো হলেও বর্তমানে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আধিপত্য বিস্তার ও বিভাজনের রাজনীতি শুরু হয়েছে, যা শহীদদের রক্তের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার শামিল। নতুন বাংলাদেশে কোনো ধরনের ফ্যাসিবাদ বা দখলদারত্বকে মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে দেওয়া হবে না বলে দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা দিয়েছে ছাত্র জমিয়ত বাংলাদেশ। শুক্রবার জুমার নামাজের পর রাজধানীর বায়তুল মুকাররম জাতীয় মসজিদের উত্তর গেটে সংগঠনটির উদ্যোগে আয়োজিত এক বিশাল ফ্যাসিবাদবিরোধী পদযাত্রা-পূর্ব সমাবেশে এমন হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন শীর্ষ নেতারা। বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ছাত্ররাজনীতির গতিপ্রকৃতি, ক্যাম্পাসে আধিপত্য বিস্তারের প্রবণতা এবং জুলাই অভ্যুত্থানের চেতনা অক্ষুণ্ণ রাখার আহ্বান জানিয়ে আয়োজিত এই কর্মসূচিটি রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
সমাবেশের শুরুতে পবিত্র কোরআন তেলাওয়াত ও সমসাময়িক জাতীয় পরিস্থিতি নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনার পর প্রধান অতিথির বক্তব্যে ছাত্র জমিয়ত বাংলাদেশের সভাপতি রিদওয়ান মাযহারী বর্তমান রাজনৈতিক ও শিক্ষাঙ্গনের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ২০২৪ সালের ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানে দেশের আপামর ছাত্রসমাজ ও জনতা বুক চিতিয়ে যেভাবে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিল, সেই ঐক্যের মেলবন্ধন আজ কিছু অতিউৎসাহী রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে ম্লান হতে বসেছে। সেদিন যারা হাতে হাত রেখে এবং কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে রাজপথে ফ্যাসিবাদী সরকারকে হটিয়েছিল, আজ তাদেরই একটি অংশ বিভাজনের নোংরা রাজনীতিতে লিপ্ত হয়েছে। বিশেষ করে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ ক্যাম্পাসে নিজেদের আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে যে অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করা হচ্ছে, তাতে সাধারণ শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে এবং অভিভাবকরা গভীর উৎকণ্ঠার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
রিদওয়ান মাযহারী তাঁর বক্তব্যে বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের পরও ছাত্ররাজনীতিতে পুরোনো সংস্কৃতির পুনরাবৃত্তি ঘটছে বলে অভিযোগ করেন। তিনি অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় উল্লেখ করেন যে, ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের কিছু নেতাকর্মীর বর্তমান কর্মকাণ্ড গত দেড় দশকে ছাত্রলীগের ফ্যাসিবাদী ও দখলদারসুলভ আচরণের সঙ্গে হুবহু মিলে যাচ্ছে। অতীতে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর নির্যাতন, গেস্টরুম সংস্কৃতি, জোরপূর্বক মিছিলে নেওয়া এবং সিট দখলের রাজনীতির বিরুদ্ধে ছাত্রসমাজ যে তীব্র ঘৃণা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছিল, আজ সেই একই পদাঙ্ক যদি অন্য কোনো রাজনৈতিক দল বা ছাত্রসংগঠন অনুসরণ করে, তবে তা কখনোই মেনে নেওয়া হবে না। রাজনৈতিক বা সাংগঠনিক কোনো পরিচয়ই ক্যাম্পাসে ত্রাস সৃষ্টি কিংবা শিক্ষার পরিবেশ ধ্বংস করার বৈধ লাইসেন্স হতে পারে না। ব্যক্তি, দল কিংবা সংগঠন পরিবর্তিত হলেও আধিপত্যবাদী ও জবরদস্তিমূলক মানসিকতা যদি একই থাকে, তবে তার পরিণতিও একই হবে বলে তিনি সতর্ক করেন।
সমাবেশে আরও বক্তব্য রাখেন জমিয়তের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা আব্দুল মালিক চৌধুরী, ছাত্র জমিয়তের কেন্দ্রীয় সহসভাপতি মুহাম্মদ নুর হোসাইন, সাধারণ সম্পাদক সাআদ বিন জাকির, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শেখ মুইনুল ইসলাম, সাংগঠনিক সম্পাদক ইনআমুল হাসান নাইম, অর্থ সম্পাদক হোসাইন আহমদ, প্রচার সম্পাদক আহমদ আল গাজী, প্রশিক্ষণ সম্পাদক শামসুল আরেফিন, ভার্সিটি সম্পাদক তাকি মাহমুদ এবং নির্বাহী সদস্য সাইফ বিন জামালসহ কেন্দ্রীয় ও ঢাকা মহানগর শাখার বিভিন্ন পর্যায়ের দায়িত্বশীল নেতারা। বক্তারা সকলেই একসুরে বলেন যে, জুলাই-আগস্টের বিপ্লব কেবল একটি নির্দিষ্ট সরকারের পরিবর্তনের জন্য ছিল না; বরং এই আন্দোলন ছিল সামগ্রিক বৈষম্য, দমন-পীড়ন, এবং স্বৈরাচারী রাজনৈতিক সংস্কৃতির চিরতরে অবসান ঘটানোর একটি ঐতিহাসিক দলিল। তাই নতুন বাংলাদেশে পুরোনো ফ্যাসিবাদী সংস্কৃতির পুনর্বাসন কিংবা কোনো ধরনের একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার অপচেষ্টা ছাত্রসমাজ সম্মিলিতভাবে রুখে দেবে।
নেতৃবৃন্দ বর্তমান ছাত্রসংগঠনগুলোর শীর্ষ নেতৃত্বকে পারস্পরিক সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতি বজায় রাখার অনুরোধ জানিয়ে বলেন যে, ছোটখাটো মতপার্থক্য বা ভুল বোঝাবুঝি থাকলে তা সংঘাতের মাধ্যমে নয়, বরং আলোচনার টেবিলে বসে সমাধান করতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র, কোনোভাবেই কোনো রাজনৈতিক দলের লাঠিয়াল বাহিনী তৈরির কারখানা হতে পারে না। ক্যাম্পাসগুলোকে অবিলম্বে সন্ত্রাসমুক্ত ও দখলদারত্বহীন করে সাধারণ শিক্ষার্থীদের নিরাপদ আবাসন এবং শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ ফিরিয়ে দেওয়ার জোরালো দাবি জানানো হয়। বিগত দিনে ফ্যাসিবাদের দোসরদের বিরুদ্ধে ছাত্রসমাজ যেভাবে রাজপথে বুক পেতে দিয়েছিল, আজ যদি সাধারণ শিক্ষার্থীদের অধিকার হরণের চেষ্টা করা হয়, তবে ছাত্র জমিয়ত আগের মতোই আপসহীন ও কঠোর আন্দোলন গড়ে তুলতে বাধ্য হবে বলে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করা হয়।
সমাবেশ শেষে ছাত্র জমিয়ত বাংলাদেশের সভাপতি রিদওয়ান মাযহারীর নেতৃত্বে বায়তুল মুকাররম জাতীয় মসজিদের উত্তর গেট থেকে একটি সুশৃঙ্খল ও বিশাল ফ্যাসিবাদবিরোধী পদযাত্রা বের করা হয়। পদযাত্রাটি বায়তুল মুকাররম চত্বর ও পল্টন মোড়সহ আশপাশের গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলো প্রদক্ষিণ করে। পদযাত্রার সময় নেতাকর্মীরা বিভিন্ন দুর্নীতি ও ফ্যাসিবাদবিরোধী স্লোগান দেন এবং হাতে থাকা ফেস্টুন ও প্ল্যাকার্ডের মাধ্যমে ক্যাম্পাসে শিক্ষার পরিবেশ রক্ষা এবং আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করেন। এই কর্মসূচিতে রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে ছাত্র জমিয়তের শত শত নেতাকর্মী ও সমর্থক স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নেন। দিনব্যাপী এই কর্মসূচি এবং নেতৃবৃন্দের জোরালো বক্তব্য দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এবং সাধারণ শিক্ষার্থীদের মাঝে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে, যা আগামী দিনে ক্যাম্পাসের রাজনীতিকে একটি ইতিবাচক ও শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক ধারায় ফিরিয়ে আনতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে সচেতন মহল মনে করছে।

