প্রকাশ: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
‘আমরা দিনের ভোটে নির্বাচিত, রাতের ভোটে কিংবা প্রশাসনের ভোটে নয়। তাই আমাদের গলায় শক্তি বেশি’—এমন মন্তব্য করেছেন জাতীয় সংসদের হুইপ মো. জি কে গউস। তিনি বলেছেন, বর্তমান সরকার ও সংসদ সদস্যরা জনগণের ভোটে নির্বাচিত হওয়ায় প্রশাসনের সঙ্গে কাজ করার ক্ষেত্রে তাদের অবস্থানও আলাদা।
সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) দুপুরে সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে জেলার সার্বিক আইনশৃঙ্খলা, উন্নয়নমূলক ও জনকল্যাণমূলক কার্যক্রম সমন্বয় নিয়ে আয়োজিত সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। সভায় জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, সরকারি সেবা, উন্নয়ন কার্যক্রম এবং জনকল্যাণমূলক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়।
জি কে গউস তাঁর বক্তব্যে আগের সরকারের সময়কার নির্বাচন ও প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, আগে যারা ক্ষমতায় ছিলেন, তাদের সময় নির্বাচনের ক্ষেত্রে প্রশাসনের প্রভাব নিয়ে নানা অভিযোগ ছিল। তাঁর দাবি, বর্তমান সময়ে সেই পরিস্থিতি নেই এবং বর্তমান প্রশাসনের কোনো কর্মকর্তা বলতে পারবেন না যে তাঁরা ভোটে কোনো প্রার্থীকে ভোট দিয়েছেন।
তিনি বলেন, এবারের নির্বাচন শান্তিপূর্ণভাবে হয়েছে এবং ভোটাররা কেন্দ্রে গিয়ে নিজেদের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, বিএনপির প্রতীক ধানের শীষ সর্বোচ্চ ভোট পেয়ে সরকার গঠন করেছে। এ কারণে প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে সমন্বয় করে দেশ পরিচালনা ও উন্নয়ন কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
তবে জি কে গউসের বক্তব্যের বড় একটি অংশ ছিল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও মামলা পরিচালনার বিষয়ে। তিনি পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মাধ্যমে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের উদ্দেশে বলেন, কোনো নিরপরাধ ব্যক্তিকে হয়রানি করার জন্য ‘গায়েবি’ বা ‘ভূতুড়ে’ মামলা যেন না হয়। একই সঙ্গে প্রকৃত অপরাধীদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার ওপরও জোর দেন তিনি।
হুইপ বলেন, বিএনপি অতীতে যেসব গায়েবি ও ভূতুড়ে মামলার মুখোমুখি হয়েছে, ভবিষ্যতে যেন একই ধরনের ঘটনা আর না ঘটে। তাঁর ভাষায়, কোনো ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত নন—এমন কাউকে মামলায় আসামি করা উচিত নয়। তবে একই সঙ্গে কোনো অপরাধী যেন আইনের বাইরে থাকার সুযোগ না পায়, সেদিকেও প্রশাসনকে নজর রাখতে হবে।
আইনশৃঙ্খলা নিয়ে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি প্রশাসনের প্রতি একটি ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থানের কথাও বলেন। একদিকে নিরপরাধ মানুষকে মামলা ও হয়রানি থেকে রক্ষা করা, অন্যদিকে প্রকৃত অপরাধীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া—দুই বিষয়ই সমান গুরুত্বপূর্ণ বলে তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে। তাঁর মতে, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে প্রশাসনকে নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করতে হবে।
সভায় জি কে গউস দেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পরিস্থিতি নিয়েও কথা বলেন। তিনি দাবি করেন, দীর্ঘ সময় ধরে দেশে বিভিন্ন ধরনের অনিয়ম প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছিল। পরবর্তী সময়ে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ‘মব কালচার’ বা দলবদ্ধ বিশৃঙ্খলার প্রবণতা তৈরি হয়েছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন। এসব পরিস্থিতি থেকে বের হয়ে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
তিনি বলেন, দীর্ঘদিন আইন অমান্যের সংস্কৃতি চলতে থাকলে মানুষের মধ্যেও আইন না মানার প্রবণতা তৈরি হয়। সেই জায়গা থেকে রাষ্ট্রকে বের করে আনতে হলে প্রশাসন, রাজনৈতিক দল এবং সাধারণ মানুষ—সব পক্ষকেই আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে। সরকারের পক্ষ থেকে কোনো ব্যক্তির অপকর্মের দায় দল বহন করবে না—এমন অবস্থানের কথাও তিনি তুলে ধরেন।
প্রশাসনের কর্মকর্তাদের উদ্দেশে হুইপ আরও বলেন, সরকারি সেবা নিতে আসা মানুষকে হয়রানি না করে হাসিমুখে সেবা দিতে হবে। সরকারের বিভিন্ন বিশেষ প্রণোদনা ও জনকল্যাণমূলক কর্মসূচির সুবিধা যাতে প্রকৃত উপকারভোগীদের কাছে পৌঁছে, তা নিশ্চিত করার আহ্বানও জানান তিনি। এতে সাধারণ মানুষের সঙ্গে প্রশাসনের সম্পর্ক আরও আস্থাভিত্তিক হবে বলে তিনি মনে করেন।
জি কে গউস আরও বলেন, প্রশাসনের কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত রাজনৈতিক পরিচয় বা ছাত্রজীবনে কে কোন রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, সেটিকে বর্তমান দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে বিবেচনা করা উচিত নয়। বরং বর্তমান দায়িত্ব ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পরিচালনার ক্ষেত্রে সবার সঙ্গে সমন্বয় করেই কাজ করতে হবে। সুন্দর ও কার্যকর বাংলাদেশ গঠনের জন্য দলীয় বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।
সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মিনহাজুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় জেলার বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সুনামগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ সদস্য কলিম উদ্দিন আহমেদ, সুনামগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য নুরুল ইসলাম নুরুল, সুনামগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ কয়ছর আহমেদ এবং সুনামগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য কামরুজ্জামান কামরুল।
সভায় সুনামগঞ্জের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ছাড়াও উন্নয়ন প্রকল্প, জনকল্যাণমূলক কার্যক্রম এবং সরকারি সেবা নিয়ে আলোচনা হয়। জেলার বিভিন্ন সমস্যা চিহ্নিত করে সেগুলো সমাধানে প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের মধ্যে আরও কার্যকর সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টিও উঠে আসে।
সুনামগঞ্জ ও সিলেট জেলার সরকারি কার্যক্রম তদারকি ও সমন্বয়ের দায়িত্বও সম্প্রতি জি কে গউসকে দেওয়া হয়েছে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের দায়িত্ব বণ্টনের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, তিনি এ দুই জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, মাদক ও চোরাচালান নিয়ন্ত্রণ, গুরুতর অপরাধ দমন এবং বিভিন্ন উন্নয়ন ও জনকল্যাণমূলক কার্যক্রম তদারকিতে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনকে পরামর্শ দেবেন।
ফলে সুনামগঞ্জের সাম্প্রতিক সভাটি তাঁর জন্য শুধু একটি প্রশাসনিক সমন্বয় সভা নয়, বরং জেলার আইনশৃঙ্খলা ও সরকারি কার্যক্রম নিয়ে জনপ্রতিনিধি এবং প্রশাসনের মধ্যে সমন্বয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবেও দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে রাজনৈতিক হয়রানিমূলক মামলা বন্ধের পাশাপাশি প্রকৃত অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার যে বার্তা তিনি দিয়েছেন, তা স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ক্ষেত্রে তাৎপর্যপূর্ণ।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে নির্বাচন, প্রশাসনের ভূমিকা এবং রাজনৈতিক মামলাকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্ক রয়েছে। ফলে একজন ক্ষমতাসীন দলের সংসদীয় হুইপ যখন প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সামনে দাঁড়িয়ে এসব বিষয়ে বক্তব্য দেন, তখন তাঁর বক্তব্য রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক—দুই দিক থেকেই গুরুত্ব বহন করে। তবে এসব বক্তব্যের বাস্তব প্রয়োগ কতটা কার্যকর হয়, তা নির্ভর করবে মাঠপর্যায়ে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিরপেক্ষতা, আইনের যথাযথ প্রয়োগ এবং জনগণের অভিযোগ নিষ্পত্তির ওপর।
জি কে গউসের বক্তব্যে একদিকে বর্তমান সরকারের নির্বাচনী বৈধতার দাবি এবং অন্যদিকে অতীতের রাজনৈতিক হয়রানি ও মামলার সমালোচনা উঠে এসেছে। একই সঙ্গে তিনি প্রশাসনের প্রতি কোনো পক্ষকে অযথা হয়রানি না করার এবং প্রকৃত অপরাধীদের ছাড় না দেওয়ার যে আহ্বান জানিয়েছেন, সেটি আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে গুরুত্বপূর্ণ।
সুনামগঞ্জের মতো সীমান্তবর্তী ও হাওরপ্রধান একটি জেলায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা, মাদক ও চোরাচালান নিয়ন্ত্রণ, উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন এবং সরকারি সেবা জনগণের কাছে পৌঁছে দেওয়া বড় ধরনের প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ। জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় থাকলে এসব ক্ষেত্রে ইতিবাচক ফল পাওয়া সম্ভব। তবে সেই সমন্বয়ের ভিত্তি হতে হবে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং আইনের সমান প্রয়োগ।
দিনের ভোটে নির্বাচিত হওয়ার কারণে ‘গলায় শক্তি বেশি’—জি কে গউসের এই রাজনৈতিক মন্তব্যের পাশাপাশি তাঁর বক্তব্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো প্রশাসনকে জনগণের সেবায় আরও সংবেদনশীল হওয়ার আহ্বান। গায়েবি বা ভূতুড়ে মামলা বন্ধ, প্রকৃত অপরাধীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা, সরকারি সুবিধা সঠিক ব্যক্তির কাছে পৌঁছানো এবং দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে প্রশাসনিক কাজ করার যে বার্তা তিনি দিয়েছেন, তার বাস্তব প্রতিফলনই এখন সুনামগঞ্জের মানুষের প্রত্যাশার জায়গা।


