সাইবার আইনের সংশোধনী নিয়ে সিপিজের উদ্বেগ

প্রকাশ: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।

বাংলাদেশের প্রস্তাবিত সাইবার সুরক্ষা আইন সংশোধনের উদ্যোগ নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে আন্তর্জাতিক সাংবাদিক অধিকার সংগঠন কমিটি টু প্রোটেক্ট জার্নালিস্টস (সিপিজে)। সংগঠনটি বলছে, খসড়ায় এমন কিছু বিধান রাখা হয়েছে, যার মাধ্যমে সরকারি কর্মকর্তাদের কাছে ‘যাচাইহীন’ বা ‘অপ্রমাণিত’ মনে হওয়া অনলাইন তথ্য প্রকাশ করাকেও অপরাধ হিসেবে গণ্য করার সুযোগ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে সংবাদমাধ্যমের কার্যক্রম বন্ধ করা বা নিবন্ধন বাতিলের মতো ক্ষমতা কর্তৃপক্ষের হাতে যাওয়ার আশঙ্কাও জানিয়েছে সংগঠনটি।

সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) প্রকাশিত এক বিবৃতিতে সিপিজে বাংলাদেশ সরকারকে প্রস্তাবিত সংশোধনী অবিলম্বে প্রত্যাহার অথবা ব্যাপকভাবে সংশোধনের আহ্বান জানিয়েছে। সংগঠনটির এ বক্তব্য এমন এক সময়ে এসেছে, যখন সরকার ‘সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইন, ২০২৬’-এর খসড়া নিয়ে বিভিন্ন অংশীজনের মতামত নিচ্ছে। ১০ সেপ্টেম্বর তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ে প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার প্রতিনিধিদের সঙ্গে এ বিষয়ে একটি পরামর্শ সভাও অনুষ্ঠিত হয়।

প্রস্তাবিত সংশোধনীর সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি হলো অনলাইনে গুজব ও অপতথ্য প্রচারের জন্য কঠোর শাস্তির বিধান। খসড়ায় এ ধরনের অপরাধে সর্বোচ্চ ১০ বছর কারাদণ্ড, ৪০ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডের প্রস্তাব রয়েছে বলে একাধিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। বিদ্যমান আইনে এ ধরনের বিধানের পরিবর্তে নতুন করে অপরাধের পরিধি বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

সমালোচকদের মূল উদ্বেগ শুধু শাস্তির মাত্রা নিয়ে নয়, বরং ‘গুজব’, ‘অপতথ্য’ কিংবা ‘যাচাইহীন’ তথ্যের মতো শব্দের প্রয়োগ ও ব্যাখ্যা নিয়েও। তাদের আশঙ্কা, এসব শব্দের সুনির্দিষ্ট ও স্পষ্ট সীমা নির্ধারিত না থাকলে জনস্বার্থে করা অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা, সরকারের সমালোচনা, রাজনৈতিক বক্তব্য কিংবা তথ্য প্রকাশের মতো বৈধ কর্মকাণ্ডও আইনি ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে।

সিপিজের এশিয়া-প্যাসিফিক প্রোগ্রাম কো-অর্ডিনেটর কুনাল মজুমদার বলেন, প্রস্তাবিত সংশোধনী এতটাই বিস্তৃত যে এটি সংবাদপত্রের স্বাধীনতার ওপর গুরুতর প্রভাব ফেলতে পারে। তাঁর মতে, সাংবাদিকদের স্বাধীন উৎস থেকে পাওয়া এবং যথাযথভাবে যাচাই করা তথ্য প্রকাশের সুযোগ থাকা প্রয়োজন, এমনকি সেই তথ্য কর্তৃপক্ষের অনুমোদিত না হলেও। একই সঙ্গে তিনি বাংলাদেশের অতীত অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে সাইবার আইনকে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে অপব্যবহার না করার আহ্বান জানান।

সিপিজের উদ্বেগের সঙ্গে সাম্প্রতিক সময়ে আরও কয়েকটি দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণও যুক্ত হয়েছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) প্রস্তাবিত আইনের অস্পষ্ট সংজ্ঞা ও বিস্তৃত প্রয়োগক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। সংস্থাটি বলেছে, খসড়ায় সাইবার অপরাধ, সাইবার নিরাপত্তা এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার মতো আলাদা বিষয়কে একই আইনের আওতায় আনা হয়েছে, কিন্তু প্রতিটির জন্য প্রয়োজনীয় সুরক্ষা ও ভারসাম্য যথেষ্ট স্পষ্ট নয়।

বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্টও (ব্লাস্ট) প্রস্তাবিত আইনে ‘মানহানি’, ‘হেয় প্রতিপন্ন’, ‘বুলিং’, ‘গুজব’ ও ‘অপতথ্য’-সংক্রান্ত অপরাধের বিস্তৃত সংজ্ঞা নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে। সংগঠনটির মতে, অনলাইনে নারী, শিশু ও অন্যান্য ব্যক্তিকে গুরুতর হয়রানি থেকে সুরক্ষা দেওয়া জরুরি হলেও সেই উদ্যোগ যেন বৈধ সমালোচনা, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা, ব্যঙ্গ, রাজনৈতিক বক্তব্য বা জনস্বার্থের আলোচনাকে অপরাধে পরিণত না করে।

প্রস্তাবিত সংশোধনী নিয়ে সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিদের মধ্যেও উদ্বেগ রয়েছে। ১০ সেপ্টেম্বরের সরকারি পরামর্শ সভায় অংশ নেওয়া বিভিন্ন গণমাধ্যমসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি খসড়ার কিছু বিধান অপব্যবহারের সম্ভাবনা নিয়ে সতর্ক করেন। দ্য ডেইলি স্টারের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গণমাধ্যমসংশ্লিষ্টরা বিশেষ করে এমন বিধানের বিরুদ্ধে সুরক্ষা চেয়েছেন, যেগুলো আগের বিতর্কিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের কিছু ধারার সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ বলে তারা মনে করছেন। সরকার অবশ্য জানিয়েছে, খসড়াটি এখনো চূড়ান্ত নয় এবং অংশীজনদের মতামত নেওয়ার পর তা চূড়ান্ত করা হবে।

সরকারের পক্ষ থেকে অবশ্য বিষয়টি ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী আন্দালিব রহমান বলেছেন, প্রস্তাবিত আইন দিয়ে মুক্তচিন্তা, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা বা সাংবাদিকদের দমন করার কোনো উদ্দেশ্য সরকারের নেই। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিশৃঙ্খলা কমানো, সামাজিক সম্প্রীতি রক্ষা এবং অনলাইনে ক্ষতিকর ও নৈতিকভাবে অবক্ষয়মূলক কনটেন্ট মোকাবিলা করাই সংশোধনীর অন্যতম লক্ষ্য।

সরকারের এই অবস্থান অনুযায়ী, অনলাইনে সংগঠিত অপতথ্য, গুজব, হয়রানি ও সাইবার অপরাধের বিস্তার ঠেকাতে বিদ্যমান আইনকে আরও কার্যকর করার প্রয়োজন রয়েছে। তবে একই সঙ্গে মন্ত্রী বলেছেন, নতুন আইন এমনভাবে তৈরি করা হবে না, যাতে তা সাংবাদিক বা সংবাদমাধ্যমের কণ্ঠরোধে ব্যবহারের সুযোগ তৈরি করে।

প্রস্তাবিত আইনে শুধু সংবাদ প্রকাশ নয়, অনলাইনে মানহানি, কাউকে হেয়প্রতিপন্ন করা এবং বুলিংয়ের উদ্দেশ্যে ডিজিটাল তথ্য তৈরি, সংরক্ষণ, প্রকাশ বা প্রচারের বিষয়ও অপরাধের আওতায় আনার প্রস্তাব রয়েছে। পাশাপাশি অনলাইন কনটেন্ট অপসারণ বা ব্লক করার ক্ষেত্রে সরকারের ক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। ফলে আইনটির প্রয়োগের ক্ষেত্রে বিচারিক নজরদারি, স্পষ্ট সংজ্ঞা এবং আপিলের সুযোগ কতটা থাকবে—সেটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

বাংলাদেশে সাইবার আইন ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। ২০১৮ সালে প্রণীত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে সাংবাদিক, মানবাধিকারকর্মী ও নাগরিক সমাজের বিভিন্ন অংশ উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছিল। ওই আইনের অধীনে সাংবাদিকসহ বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের বিরুদ্ধে মামলা হওয়ার ঘটনাও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। পরবর্তী সময়ে আইনটি পরিবর্তিত হয়ে সাইবার নিরাপত্তা আইন প্রণীত হলেও নতুন আইন নিয়ে বিতর্ক পুরোপুরি শেষ হয়নি।

এখন নতুন সংশোধনী সামনে আসায় সেই পুরোনো অভিজ্ঞতাই আবার আলোচনায় এসেছে। একটি কার্যকর সাইবার আইন যেমন নাগরিকদের অনলাইন নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে, তেমনি অস্পষ্ট ও অতিরিক্ত বিস্তৃত বিধান থাকলে সেটি মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর চাপ তৈরি করতে পারে—এমন আশঙ্কাই তুলে ধরছেন সমালোচকেরা।

এ অবস্থায় খসড়াটি চূড়ান্ত করার আগে সাংবাদিক, আইনজীবী, প্রযুক্তিবিদ, মানবাধিকারকর্মী, নাগরিক সমাজ এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর মতামত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করার দাবি উঠেছে। সরকারের পক্ষ থেকেও জানানো হয়েছে, আইনটি চূড়ান্ত করার আগে অংশীজনদের মতামত নেওয়া হচ্ছে। ফলে সামনে আলোচনার মাধ্যমে বিতর্কিত বিধানগুলো কতটা পরিবর্তন করা হয়, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

সাইবার অপরাধ মোকাবিলা এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করা বাংলাদেশের জন্য নিঃসন্দেহে একটি বড় নীতিগত চ্যালেঞ্জ। একদিকে অনলাইনে মিথ্যা তথ্য, প্রতারণা, হয়রানি ও ক্ষতিকর কনটেন্ট থেকে নাগরিকদের সুরক্ষা প্রয়োজন; অন্যদিকে সাংবাদিকতা ও জনস্বার্থের তথ্য প্রকাশ যাতে অপরাধ হিসেবে বিবেচিত না হয়, তার নিশ্চয়তাও জরুরি। প্রস্তাবিত সংশোধনী নিয়ে বর্তমান বিতর্ক মূলত এই ভারসাম্য কোথায় এবং কীভাবে নিশ্চিত করা হবে, সেই প্রশ্নকেই সামনে নিয়ে এসেছে।

সিপিজে তাই সংশোধনী প্রত্যাহার বা ব্যাপক সংস্কারের আহ্বান জানিয়েছে। অন্যদিকে সরকার বলছে, আইনটি এখনো চূড়ান্ত নয় এবং সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষার বিষয়টি বিবেচনায় রেখেই সংশোধন করা হবে। এখন অংশীজনদের মতামত ও পরবর্তী আলোচনার ভিত্তিতে খসড়াটি কী রূপ নেয়, তার ওপরই নির্ভর করবে বাংলাদেশের নতুন সাইবার আইন নাগরিক নিরাপত্তা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার মধ্যে কতটা কার্যকর ভারসাম্য তৈরি করতে পারে।

এই সপ্তাহের খবরাখবর

‘ভেনিসের পর টিম আমাকে ডিজওন করেছে’: বাঁধন

প্রকাশ: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

ময়মনসিংহ মেডিকেলে আগুন, ৬ জনের মৃত্যু নিয়ে নতুন তথ্য

প্রকাশ: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সিলেটে সন্ধ্যা পর্যন্ত বৃষ্টির পূর্বাভাস

প্রকাশ: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

রাষ্ট্রপতিকে স্বাগত জানাতে সিলেটে বিএনপির প্রস্তুতি

প্রকাশ: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

আসিফ নজরুলকে ‘বিদেশি এজেন্ট’ বললেন পাটওয়ারী

প্রকাশ: ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

বিষয়বস্তু

‘ভেনিসের পর টিম আমাকে ডিজওন করেছে’: বাঁধন

প্রকাশ: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

ময়মনসিংহ মেডিকেলে আগুন, ৬ জনের মৃত্যু নিয়ে নতুন তথ্য

প্রকাশ: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সিলেটে সন্ধ্যা পর্যন্ত বৃষ্টির পূর্বাভাস

প্রকাশ: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

রাষ্ট্রপতিকে স্বাগত জানাতে সিলেটে বিএনপির প্রস্তুতি

প্রকাশ: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

আসিফ নজরুলকে ‘বিদেশি এজেন্ট’ বললেন পাটওয়ারী

প্রকাশ: ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

হবিগঞ্জে গোসলের ছবি ধারণ নিয়ে সংঘর্ষ, আহত ৫০

প্রকাশ: ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

ওবায়দুল কাদেরসহ ৭ জনের রায় মঙ্গলবার

প্রকাশ: ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

শুভশ্রীর সঙ্গে সম্পর্কের গুঞ্জন নিয়ে মুখ খুললেন দেব

প্রকাশ: ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সম্পর্কিত নিবন্ধ

জনপ্র্যিয় পেজ