প্রকাশ: ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক ভবিষ্যতে সমমর্যাদা, পারস্পরিক সম্মান ও প্রতিবেশীসুলভ আচরণের ভিত্তিতে এগিয়ে নেওয়ার প্রত্যাশা জানিয়েছেন জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেছেন, ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সুসম্পর্ক প্রয়োজন, তবে সেই সম্পর্ক কোনো একতরফা নির্ভরতা বা অসম অবস্থানের ভিত্তিতে নয়; বরং দুই দেশের স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব ও মর্যাদাকে সমান গুরুত্ব দিয়েই দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক পরিচালিত হওয়া উচিত।
সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) সকালে নিজের নির্বাচনি এলাকা ভোলায় তিন দিনের সফর শেষে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হওয়ার আগে ভোলা সার্কিট হাউসে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে স্পিকার এসব কথা বলেন। এ সময় তিনি ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের পাশাপাশি ব্রিকসে বাংলাদেশের সম্ভাব্য অংশগ্রহণ, ভারতে সাবেক সরকারের প্রধানের অবস্থান, দেশের চলমান সংস্কার এবং জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়েও কথা বলেন।
ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের ধরন প্রসঙ্গে হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বলেন, দুই দেশের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক থাকা প্রয়োজন। তবে সেটি হতে হবে সমমর্যাদা ও পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে। তিনি অতীতে আওয়ামী লীগ সরকারের একজন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দেওয়া ‘স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক’ সংক্রান্ত বক্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে বলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের এমন ধরনের সম্পর্কের প্রয়োজন নেই।
স্পিকারের এই বক্তব্য এমন সময়ে এল, যখন ঢাকা-নয়াদিল্লি সম্পর্ক নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় নানা আলোচনার মধ্য দিয়ে এগোচ্ছে। চলতি মাসের শুরুতেই বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী জাতীয় সংসদের স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের সঙ্গে পৃথক বৈঠক করেন। ওই বৈঠকে দুই দেশের সংসদীয় সম্পর্ক জোরদার, সংসদীয় প্রতিনিধিদলের সফর, রোহিঙ্গা সংকট, প্রত্যাবাসন এবং ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক বিনিময়সহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়।
ভারতের হাইকমিশনার ওই সময় দুই দেশের সংসদ সদস্যদের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ ও মতবিনিময়ের জন্য ‘বাংলাদেশ-ইন্ডিয়া পার্লামেন্টারি ফ্রেন্ডশিপ গ্রুপ’ গঠনের প্রস্তাবও দেন। তাঁর বক্তব্যে জনগণকেন্দ্রিক সম্পর্ক এবং দুই দেশের মানুষের মধ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
এর আগে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদের সঙ্গে ভারতের হাইকমিশনারের বৈঠকে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ঐতিহাসিক ও পরিবর্তনশীল প্রেক্ষাপট নিয়েও আলোচনা হয়েছিল। সেখানে পারস্পরিক সম্মান ও একে অপরের সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধাকে সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরা হয়।
তবে ভোলায় সাংবাদিকদের সঙ্গে সাম্প্রতিক আলাপে স্পিকার সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের কিছু উদ্বেগের কথাও স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন। বিশেষ করে ব্রিকস প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ভারত এখনো বাংলাদেশকে খোলাখুলিভাবে কিছু জানায়নি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে যথাযথভাবে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি বলেও তারা মনে করছে। ফলে ব্রিকস নিয়ে বাংলাদেশের অবস্থানে এখনো কিছু সংরক্ষণ রয়েছে।
ব্রিকসের প্রসঙ্গটি দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর এই জোটে বাংলাদেশের সম্ভাব্য সম্পৃক্ততা নিয়ে গত কয়েক মাস ধরে আলোচনা রয়েছে। এর মধ্যে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সমীকরণও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। তবে ব্রিকসে বাংলাদেশের অবস্থান বা ভবিষ্যৎ অংশগ্রহণ নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের বিষয়টি আলাদাভাবে বিবেচ্য।
ভারতে বাংলাদেশের সাবেক সরকারের প্রধানের অবস্থান নিয়েও অসন্তোষের কথা জানান স্পিকার। তিনি অভিযোগ করেন, ভারত তাঁকে আশ্রয় দেওয়ার পাশাপাশি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার সুযোগ দিয়েছে, যা বাংলাদেশের বর্তমান দৃষ্টিভঙ্গিতে প্রতিবেশীসুলভ আচরণের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এ বিষয়টি বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে একটি সংবেদনশীল রাজনৈতিক ইস্যু হিসেবে সামনে এসেছে।
এর মধ্যেই দুই দেশের সরকারি পর্যায়ে যোগাযোগও অব্যাহত রয়েছে। সেপ্টেম্বরের শুরুতে ভারতীয় হাইকমিশনারের সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশের স্পিকার দুই দেশের সম্পর্ককে জনগণের মধ্যে যোগাযোগ, পারস্পরিক সম্মান ও সার্বভৌমত্বের ভিত্তিতে এগিয়ে নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছিলেন। একই সময়ে ভারতীয় পক্ষ থেকেও জনগণকেন্দ্রিক সম্পর্ক জোরদারের আগ্রহের কথা জানানো হয়।
ফলে স্পিকারের সর্বশেষ বক্তব্যকে একদিকে যেমন ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের প্রত্যাশার একটি রাজনৈতিক বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে, অন্যদিকে দুই দেশের যোগাযোগের দরজাও যে বন্ধ নয়, সাম্প্রতিক কূটনৈতিক তৎপরতায় সেটিও স্পষ্ট। সম্পর্কের ক্ষেত্রে মতপার্থক্য থাকলেও নিয়মিত সংলাপ ও সংসদীয় যোগাযোগ অব্যাহত রাখার বিষয়টি দুই পক্ষের সাম্প্রতিক আলোচনায় গুরুত্ব পেয়েছে।
ভোলায় সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়েও কথা বলেন স্পিকার। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ সময়ের শাসনে দেশের বিভিন্ন খাতে যে অবক্ষয় তৈরি হয়েছে, সেখান থেকে উত্তরণে বর্তমান সরকারের সময় প্রয়োজন। তাঁর মতে, রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও ব্যবস্থাপনায় সংস্কারের প্রয়োজন রয়েছে এবং সেই সংস্কারের কাজ ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে।
আইন ও প্রশাসনিক ব্যবস্থায় পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন তিনি। স্পিকার বলেন, আইনকানুনে অনেক সংস্কার আনতে হবে। তবে বড় ধরনের রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তন বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আলোচনা ও সমঝোতা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে মতপার্থক্য থাকলেও আলোচনার পথ খোলা রাখার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়েও স্পিকার আশাবাদ প্রকাশ করেন। তিনি স্বীকার করেন, সনদ বাস্তবায়নের পদ্ধতি নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে এখনো পুরোপুরি ঐকমত্য তৈরি হয়নি। তবে বিএনপি ও বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে একটি সমঝোতা তৈরি হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে এই সমঝোতার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কারণ রাজনৈতিক সংস্কার, নির্বাচনব্যবস্থা, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা এবং ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে বর্তমানে যে আলোচনা চলছে, তার অনেকটাই রাজনৈতিক দলগুলোর পারস্পরিক বোঝাপড়ার ওপর নির্ভর করছে। স্পিকারের বক্তব্যেও সেই আলোচনার প্রয়োজনীয়তা উঠে এসেছে।
এদিকে ভোলায় স্পিকারের তিন দিনের সফরেও স্থানীয় প্রশাসন, রাজনৈতিক নেতা, জনপ্রতিনিধি ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে মতবিনিময়ের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। সফরের শেষ দিনে সার্কিট হাউসে তাঁর সঙ্গে ভোলা জেলা পরিষদের প্রশাসক ও জেলা বিএনপির আহ্বায়ক গোলাম নবী আলমগীর, জেলা প্রশাসক ডা. শামীম রহমান, পুলিশ সুপার মো. শহিদুল ইসলাম কাওসারসহ স্থানীয় রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের নতুন প্রত্যাশার বিষয়টি এখন কেবল রাজনৈতিক বক্তব্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না; সংসদীয় ও কূটনৈতিক পর্যায়েও পারস্পরিক যোগাযোগের নতুন উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে। ভারতের পক্ষ থেকে জনগণকেন্দ্রিক সম্পর্ক জোরদারের আগ্রহ প্রকাশ এবং বাংলাদেশের পক্ষ থেকে সমমর্যাদা ও সার্বভৌমত্বের ওপর জোর—দুই দেশের সম্পর্কের ভবিষ্যৎ কাঠামো নিয়ে একটি নতুন আলোচনার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে, প্রতিবেশী দুই দেশের সম্পর্ক যতটা ঐতিহাসিক ও বহুমাত্রিক, ততটাই স্পর্শকাতর। সীমান্ত, বাণিজ্য, পানি, নিরাপত্তা, যোগাযোগ, আঞ্চলিক সহযোগিতা ও মানুষের যাতায়াতের মতো বিষয়গুলোতে পারস্পরিক স্বার্থ জড়িত। ফলে রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও নিয়মিত সংলাপ এবং পারস্পরিক আস্থার পরিবেশ বজায় রাখা দুই দেশের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ।
এই বাস্তবতায় স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদের বক্তব্যে বাংলাদেশের অবস্থানটি স্পষ্ট—ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে বাংলাদেশ আগ্রহী, তবে সেই সম্পর্ক হতে হবে সমমর্যাদা, পারস্পরিক সম্মান ও জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে। একই সঙ্গে সাম্প্রতিক সংসদীয় যোগাযোগ বলছে, মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও দুই দেশের মধ্যে সংলাপ ও সহযোগিতার পথ খোলা রাখার প্রয়োজনীয়তা উভয় পক্ষই উপলব্ধি করছে।


