সিলেটে হামের দুঃসংবাদ, আরও এক শিশুর মৃত্যু

প্রকাশ: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।

সিলেটে হামের পরিস্থিতিতে স্বস্তির খবর মিলছে না। প্রতিদিনই নতুন করে সন্দেহজনক হামে আক্রান্ত রোগী হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন, একই সঙ্গে মৃত্যুর ঘটনাও ঘটছে। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় আরও এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে চলতি বছর সিলেট বিভাগে নিশ্চিত ও সন্দেহজনক হামে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৬৫ জনে।

মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) সিলেট বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের কার্যালয়ের প্রকাশিত প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে। স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, মারা যাওয়া শিশুটির নাম শুভ তালুকদার। সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলার সাত মাস বয়সী এই শিশুটি হামের উপসর্গ নিয়ে সিলেটের শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিল। সেখানেই চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।

একটি শিশুর এমন মৃত্যু আবারও সিলেটের চলমান হাম পরিস্থিতির ভয়াবহতা সামনে এনেছে। এর আগের ২৪ ঘণ্টাতেও বিভাগে হামের উপসর্গ নিয়ে চার শিশুর মৃত্যু হয়েছিল। ফলে মাত্র দুই দিনের ব্যবধানে মৃত্যুর সংখ্যা আরও বেড়েছে। ১৪ সেপ্টেম্বরের স্বাস্থ্য বিভাগের হিসাবে, তখন পর্যন্ত বিভাগে হাম ও হামের উপসর্গে মৃত্যুর সংখ্যা ছিল ১৬৪ জন।

নতুন মৃত্যুর পাশাপাশি হাসপাতালে রোগীর চাপও কমেনি। গত ২৪ ঘণ্টায় সিলেট বিভাগের বিভিন্ন হাসপাতালে সন্দেহজনক হামে আক্রান্ত ১৯৩ জন নতুন করে ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে ৫৮ জন এবং সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৭১ জন ভর্তি হয়েছেন। সুনামগঞ্জ জেলা সদর হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ২২ জন। মৌলভীবাজার জেলা সদর হাসপাতালে ১৩ জন এবং গোলাপগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ১৬ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন। বাকি রোগীরা বিভাগের অন্যান্য হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে গেছেন।

নতুন রোগী ভর্তি হওয়ার ফলে হাসপাতালগুলোর ওপর চাপও বাড়ছে। মঙ্গলবার পর্যন্ত সিলেট বিভাগের বিভিন্ন হাসপাতালে সন্দেহজনক হামে আক্রান্ত ৪৯০ জন চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এর মধ্যে শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে ১৬৪ জন এবং ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১৬৩ জন ভর্তি রয়েছেন। সুনামগঞ্জ জেলা সদর হাসপাতালেও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

সিলেট নগরীর হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপের চিত্র আরও স্পষ্ট। ১৫ সেপ্টেম্বরের এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নির্ধারিত শয্যার তুলনায় রোগীর সংখ্যা অনেক বেশি এবং শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালেও ধারণক্ষমতার ওপর চাপ তৈরি হয়েছে। চিকিৎসক সংকট ও কোথাও কোথাও ওষুধের সরবরাহ নিয়েও উদ্বেগের কথা উঠে এসেছে।

এ পরিস্থিতির মধ্যে মঙ্গলবারের প্রতিবেদনে নতুন কোনো নিশ্চিত হামের রোগী শনাক্ত হয়নি। তবে সন্দেহজনক রোগীর সংখ্যা অব্যাহতভাবে বাড়তে থাকায় স্বাস্থ্যসেবার ওপর চাপ কমছে না। হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হওয়া প্রত্যেক রোগী যে পরীক্ষায় নিশ্চিত হাম হিসেবে শনাক্ত হচ্ছেন, এমন নয়। তাই স্বাস্থ্য বিভাগের পরিসংখ্যানে নিশ্চিত হাম এবং সন্দেহজনক হামের তথ্য আলাদাভাবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সিলেট বিভাগে নিশ্চিত হামের রোগী শনাক্ত হয়েছে ১ হাজার ৪৪ জন। এর মধ্যে সিলেট জেলায় ৩৭৬ জন, হবিগঞ্জে ১৫৩ জন, মৌলভীবাজারে ১৫৮ জন এবং সুনামগঞ্জে ৩৫৭ জন নিশ্চিত রোগী শনাক্ত হয়েছেন।

মৃত্যুর হিসাবেও চার জেলার মধ্যে সিলেট ও সুনামগঞ্জে পরিস্থিতি বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। স্বাস্থ্য বিভাগের হিসাবে সিলেট জেলায় সন্দেহজনক হামে ৬৩ জন এবং নিশ্চিত হামে চারজনের মৃত্যু হয়েছে। হবিগঞ্জে সন্দেহজনক ও নিশ্চিত হামে যথাক্রমে ১৯ ও চারজনের মৃত্যু হয়েছে। মৌলভীবাজারে এ সংখ্যা যথাক্রমে ১৩ ও একজন। আর সুনামগঞ্জে সন্দেহজনক হামে ৬০ জন এবং নিশ্চিত হামে একজনের মৃত্যু হয়েছে। সব মিলিয়ে সন্দেহজনক ও নিশ্চিত হামে মৃত্যুর সংখ্যা এখন ১৬৫।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ১৬৫ জনের পুরো সংখ্যাটিকে নিশ্চিতভাবে হামে মৃত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। স্বাস্থ্য বিভাগের হিসাবের মধ্যে হামের উপসর্গ নিয়ে মারা যাওয়া ব্যক্তিরাও রয়েছেন। ১৪ সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদনে বিভাগে মোট ১৬৪ মৃত্যুর মধ্যে ১৫৪ জনের মৃত্যু সন্দেহজনক হামের ক্ষেত্রে এবং ১০ জনের মৃত্যু নিশ্চিত হামের ক্ষেত্রে হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল।

সিলেটের এই পরিস্থিতি দেশের সামগ্রিক হাম পরিস্থিতির সঙ্গেও সম্পর্কিত। সাম্প্রতিক জাতীয় তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশজুড়েই চলতি বছর হামের প্রাদুর্ভাব গুরুতর আকার ধারণ করেছে। সেপ্টেম্বরের প্রথমার্ধে সারা দেশে নিশ্চিত ও সন্দেহজনক হামের সঙ্গে সম্পর্কিত মৃত্যুর সংখ্যা এক হাজার ছাড়িয়েছে। একই সময়ে বিপুলসংখ্যক মানুষ হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।

স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্টদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হয়ে দাঁড়িয়েছে হাসপাতালগুলোর ওপর অতিরিক্ত চাপ। সিলেটের বড় হাসপাতালগুলোতে একই সময়ে বিপুলসংখ্যক শিশুকে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। এর ফলে শয্যা, চিকিৎসক, নার্স, ওষুধ এবং অন্যান্য চিকিৎসা সরঞ্জামের ওপর চাপ বাড়ছে। নগরীর বড় হাসপাতালগুলোতে রোগীর ভিড় বাড়ায় সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।

স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা এর আগে গুরুতর অসুস্থ রোগীদের দ্রুত উন্নত চিকিৎসার জন্য বড় হাসপাতালে পাঠানোর পাশাপাশি অপেক্ষাকৃত স্থিতিশীল রোগীদের স্থানীয় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। এতে নগরীর হাসপাতালগুলোর ওপর অতিরিক্ত চাপ কিছুটা কমানো সম্ভব হতে পারে বলে স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা মনে করছেন। একই সঙ্গে জনসচেতনতার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

সিলেটের পরিস্থিতিতে সবচেয়ে উদ্বেগের জায়গাটি হলো শিশুদের বড় একটি অংশ এই রোগের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে আসছে। গত কয়েক দিনের মৃত্যুর তালিকাতেও শিশুদের সংখ্যাই বেশি। ১৪ সেপ্টেম্বর মারা যাওয়া চার শিশুর মধ্যে সিলেট, সুনামগঞ্জ ও হবিগঞ্জের শিশু ছিল। এর এক দিন পরই শাল্লার সাত মাস বয়সী শুভ তালুকদারের মৃত্যু সেই উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে।

একটি সাত মাসের শিশুর মৃত্যু শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়—এর পেছনে রয়েছে একটি পরিবারের শোক, উদ্বেগ ও অপূরণীয় ক্ষতি। একই সময়ে হাসপাতালের শয্যায় চিকিৎসাধীন শত শত শিশুর পরিবারও প্রতিটি মুহূর্ত অনিশ্চয়তার মধ্যে পার করছে। কারও সন্তান সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরছে, আবার কারও পরিবারকে শুনতে হচ্ছে মৃত্যুর খবর।

তবে বর্তমান পরিস্থিতিকে শুধু মৃত্যুর সংখ্যা দিয়ে দেখলে এর মানবিক দিকটি পুরোপুরি ধরা পড়ে না। হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসাধীন রোগীদের দ্রুত সেবা দেওয়া, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিশ্চিত করা এবং রোগীর স্বজনদের যথাযথ পরামর্শ দেওয়া এখন সমান গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি হামের বিস্তার ঠেকাতে স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের নেওয়া কর্মসূচি ও জনসচেতনতামূলক উদ্যোগ কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করাও জরুরি।

সিলেটে প্রতিদিন নতুন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন এবং মৃত্যুর তালিকায় যুক্ত হচ্ছে নতুন নাম। মঙ্গলবারের হিসাব সেই বাস্তবতাকেই আবার সামনে এনেছে। বিশেষ করে সাত মাস বয়সী শুভ তালুকদারের মৃত্যু দেখিয়ে দিয়েছে, পরিস্থিতি এখনো পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি।

স্বাস্থ্য বিভাগের পরিসংখ্যান বলছে, চলতি বছরের শুরু থেকে সিলেট বিভাগে নিশ্চিত হামের রোগী শনাক্ত হয়েছে এক হাজারের বেশি। আর সন্দেহজনক ও নিশ্চিত হামে মৃত্যুর সংখ্যা পৌঁছেছে ১৬৫-তে। এই পরিস্থিতিতে হাসপাতালের চিকিৎসা সক্ষমতা বাড়ানো, রোগীর চাপ সামাল দেওয়া, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

এই সপ্তাহের খবরাখবর

জুলাই গণঅভ্যুত্থান মামলায় ওবায়দুল কাদেরের মৃত্যুদণ্ড

প্রকাশ: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

চিকিৎসাশিক্ষায় অবদান রাখতে দেহদান করলেন লিটন দাশ

প্রকাশ: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

দক্ষিণ আফ্রিকায় ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনা, নিহত ২১

প্রকাশ: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

গায়েবি মামলা নয়, প্রকৃত অপরাধীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা: জি কে গউস

প্রকাশ: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

‘ভেনিসের পর টিম আমাকে ডিজওন করেছে’: বাঁধন

প্রকাশ: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

বিষয়বস্তু

জুলাই গণঅভ্যুত্থান মামলায় ওবায়দুল কাদেরের মৃত্যুদণ্ড

প্রকাশ: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

চিকিৎসাশিক্ষায় অবদান রাখতে দেহদান করলেন লিটন দাশ

প্রকাশ: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

দক্ষিণ আফ্রিকায় ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনা, নিহত ২১

প্রকাশ: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

গায়েবি মামলা নয়, প্রকৃত অপরাধীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা: জি কে গউস

প্রকাশ: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

‘ভেনিসের পর টিম আমাকে ডিজওন করেছে’: বাঁধন

প্রকাশ: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সাইবার আইনের সংশোধনী নিয়ে সিপিজের উদ্বেগ

প্রকাশ: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

ময়মনসিংহ মেডিকেলে আগুন, ৬ জনের মৃত্যু নিয়ে নতুন তথ্য

প্রকাশ: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সিলেটে সন্ধ্যা পর্যন্ত বৃষ্টির পূর্বাভাস

প্রকাশ: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সম্পর্কিত নিবন্ধ

জনপ্র্যিয় পেজ