প্রকাশ: ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সম্পত্তি বণ্টনসংক্রান্ত নতুন আইনকে কোরআন ও সুন্নাহবিরোধী দাবি করে তা বাতিলের দাবিতে রাজধানীতে বিক্ষোভ মিছিল করেছে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ও খেলাফত মজলিসের নেতাকর্মীরা। শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) জুমার নামাজের পর জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের সামনে থেকে পৃথক সময়ে এসব মিছিল বের করা হয়। পরে মিছিলগুলো পল্টন মোড় হয়ে বিজয়নগর পানির ট্যাংকি মোড় পর্যন্ত যায়।
বিক্ষোভ থেকে বক্তারা সরকারের প্রতি আইনটি কার্যকর না করার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে সম্পত্তি বণ্টনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলেম-ওলামাদের সঙ্গে পরামর্শ করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার দাবি তোলেন তারা। তাদের অভিযোগ, আইনটি সংসদে পাস করার আগে এ বিষয়ে দেশের ইসলামি চিন্তাবিদ ও আলেমদের মতামত যথাযথভাবে নেওয়া হয়নি।
জুমার নামাজ শেষে বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের সামনে বিক্ষোভ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে দুই ইসলামি দলের নেতাকর্মীদের পাশাপাশি মসজিদে নামাজ পড়তে আসা কিছু সাধারণ মুসল্লিও মিছিলে অংশ নেন। এ সময় তারা আইনটি বাতিলের দাবিতে বিভিন্ন স্লোগান দেন। বিক্ষোভকারীদের হাতে বিভিন্ন ধরনের প্ল্যাকার্ড ও ব্যানারও দেখা যায়।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ও খেলাফত মজলিসের নেতারা তাদের বক্তব্যে বলেন, সম্পত্তি বণ্টনের বিধান কোরআন ও সুন্নাহতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে। তাদের দাবি, নতুন আইনের মাধ্যমে জীবিত অবস্থায় বাবা-মায়ের সম্পত্তি সন্তানদের মধ্যে বণ্টনের সুযোগ তৈরি হলে এর অপব্যবহারের আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে কন্যাসন্তানরা সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত হতে পারেন বলে তারা উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
বক্তারা বলেন, বাংলাদেশে এখনো অনেক পরিবারে কন্যাসন্তানদের উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত করার প্রবণতা রয়েছে। এ অবস্থায় জীবদ্দশায় সম্পত্তি হস্তান্তরের সুযোগ তৈরি হলে কেউ কেউ মেয়েদের বাদ দিয়ে সম্পত্তি বণ্টন করতে পারেন। তাদের মতে, এতে নারীদের সম্পত্তির অধিকার আরও ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে।
তবে সম্পত্তি বণ্টনসংক্রান্ত আইন নিয়ে ইসলামি দলগুলোর আপত্তির পাশাপাশি এর উদ্দেশ্য ও প্রয়োগ নিয়ে জনপরিসরে ভিন্ন ভিন্ন মত রয়েছে। ফলে আইনটির প্রকৃত বিধান, এর প্রয়োগের সুযোগ এবং বিদ্যমান উত্তরাধিকার আইনের সঙ্গে এর সম্পর্ক নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিক্ষোভে দেওয়া বক্তব্যে ইসলামি দলগুলোর নেতারা সরকারের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়েও সমালোচনা করেন। তারা অভিযোগ করেন, নির্বাচনের আগে আলেম-ওলামাদের সমর্থন নেওয়া হলেও ক্ষমতায় আসার পর তাদের মতামতকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। তারা সরকারের প্রতি ধর্মীয় ও সামাজিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে পরামর্শ করার আহ্বান জানান।
বক্তারা আরও বলেন, সম্পত্তি বণ্টনের মতো একটি স্পর্শকাতর বিষয়ে আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে শুধু রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়, ধর্মীয় ও সামাজিক বাস্তবতাকেও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। তাদের ভাষ্য, দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনগোষ্ঠীর ধর্মীয় মূল্যবোধের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কোনো আইন তারা মেনে নেবেন না।
বিক্ষোভে সরকারের বিভিন্ন নীতির সমালোচনাও করা হয়। বক্তারা দেশের অর্থনৈতিক ও নাগরিক সেবা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন এবং বিদ্যুৎ ও গ্যাসসহ বিভিন্ন মৌলিক সেবা নিশ্চিত করার দাবি জানান। একই সঙ্গে সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের কয়েকজন ব্যক্তির বক্তব্য ও ভূমিকারও সমালোচনা করেন তারা।
এ সময় বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্বাচনের আগে দেওয়া বিভিন্ন বক্তব্যের প্রসঙ্গও তুলে ধরেন বিক্ষোভকারীরা। তারা দাবি করেন, ইসলাম ও ধর্মীয় মূল্যবোধের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে রাষ্ট্র পরিচালনার বিষয়ে রাজনৈতিক অঙ্গীকার থাকলে আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রেও সেই অবস্থানের প্রতিফলন থাকা প্রয়োজন।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মিছিলটি মাওলানা মামুনুল হকের নেতৃত্বে এবং খেলাফত মজলিসের মিছিলটি মাওলানা আহমদ আব্দুল কাদেরের নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত হয়েছে বলে আয়োজকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়। দুই দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা পৃথক মিছিলে অংশ নেন। বায়তুল মোকাররমে জুমার নামাজ পড়তে আসা কিছু মুসল্লিও কর্মসূচিতে যোগ দেন।
বিক্ষোভকারীরা বিভিন্ন স্লোগানের মাধ্যমে আইনটি বাতিলের দাবি জানান। তাদের স্লোগানে ধর্মীয় মূল্যবোধ ও শরিয়াহভিত্তিক সম্পত্তি বণ্টনের দাবির পাশাপাশি সরকারের প্রতি আইনটি পুনর্বিবেচনার আহ্বান উঠে আসে। কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে এলাকায় রাজনৈতিক ও ধর্মীয় আবহ তৈরি হয়।
সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ বাংলাদেশে নতুন কোনো বিষয় নয়। পারিবারিক সম্পত্তির উত্তরাধিকার, জমি ভাগ-বাটোয়ারা এবং জীবদ্দশায় সম্পদ হস্তান্তর নিয়ে দেশের বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে নানা ধরনের বিরোধ দেখা যায়। বিশেষ করে নারী ও কন্যাসন্তানের উত্তরাধিকার নিশ্চিত করা, পারিবারিক বিরোধ কমানো এবং সম্পত্তি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে আলোচনা হয়েছে।
এ কারণে নতুন সম্পত্তি আইন নিয়ে ইসলামি দলগুলোর আপত্তি শুধু ধর্মীয় দৃষ্টিকোণেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; এর সামাজিক প্রভাব নিয়েও তারা উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তাদের বক্তব্যে বিশেষভাবে উঠে এসেছে, বাবা-মায়ের জীবদ্দশায় সম্পত্তি বণ্টনের সুযোগ যেন কোনোভাবেই উত্তরাধিকারীদের ন্যায্য অধিকার ক্ষুণ্ন করার হাতিয়ার না হয়।
অন্যদিকে, যেকোনো আইন নিয়ে মতপার্থক্য থাকলে সাংবিধানিক ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মধ্যেই তা পর্যালোচনা ও সংশোধনের সুযোগ রয়েছে। ইসলামি দলগুলোর নেতারা সেই প্রক্রিয়ায় আলেম-ওলামা ও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতামত অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, ধর্মীয় বিধান, পারিবারিক বাস্তবতা এবং নাগরিক অধিকার—তিনটি বিষয় বিবেচনায় রেখেই সম্পত্তি সংক্রান্ত আইন প্রণয়ন করা প্রয়োজন।
শুক্রবারের কর্মসূচি থেকে বক্তারা সরকারকে দ্রুত আইনটি পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে তারা ভবিষ্যতে এ বিষয়ে আরও কর্মসূচি দেওয়ার ইঙ্গিত দেন। তবে আইনটি নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে কী ধরনের পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
রাজধানীতে ইসলামি দলগুলোর এই বিক্ষোভের মধ্য দিয়ে সম্পত্তি বণ্টনসংক্রান্ত আইনটি নিয়ে রাজনৈতিক ও সামাজিক বিতর্ক আরও দৃশ্যমান হলো। বিশেষ করে ধর্মীয় বিধান, নারীর উত্তরাধিকার অধিকার এবং বাবা-মায়ের জীবদ্দশায় সম্পত্তি হস্তান্তরের সুযোগ—এই তিনটি বিষয়কে ঘিরে সামনে আরও আলোচনা ও মতবিনিময় হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।


