প্রকাশ: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
ভেনিস আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে অংশ নিতে গিয়ে হামলা ও হয়রানির শিকার হওয়ার পর দেশে ফিরেছেন অভিনেত্রী আজমেরী হক বাঁধন। তবে দেশে ফেরার পর তাঁর বক্তব্যে নতুন করে আলোচনায় এসেছে আরেকটি বিষয়—হামলার পর নিজের সিনেমার টিমের কাছ থেকেই তিনি প্রত্যাশিত সহযোগিতা পাননি বলে অভিযোগ করেছেন এই অভিনেত্রী। বরং ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবের বাকি কার্যক্রম এবং পরবর্তী সময়ে টরন্টো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে অংশ নেওয়ার ক্ষেত্রেও তাঁকে টিমের পক্ষ থেকে বাধা দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেছেন তিনি।
সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) সকালে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ফিরে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় বাঁধন এসব অভিযোগ করেন। রুবাইয়াত হোসেন পরিচালিত ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’ সিনেমার প্রিমিয়ারে অংশ নিতে তিনি ৮৩তম ভেনিস আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে গিয়েছিলেন। উৎসবের ব্যস্ততা ও সিনেমাকে ঘিরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্বের মুহূর্তের মধ্যেই ঘটে যায় অনাকাঙ্ক্ষিত সেই ঘটনা।
বাঁধনের ভাষ্য অনুযায়ী, ইতালির মেস্ত্রে শহরে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সময় কাটানোর সময় একদল বাংলাদেশি তাঁকে ঘিরে ধরে হেনস্তা ও শারীরিকভাবে আক্রমণ করে। তিনি অভিযোগ করেন, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে তাঁর সক্রিয় অবস্থানের কারণেই তাঁকে লক্ষ্য করা হয়। পরে ঘটনার বিষয়ে ইতালির পুলিশের কাছে অভিযোগও করেন তিনি। ইতালির সংবাদ সংস্থা আনসা ঘটনাটিকে রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি হামলা হিসেবে উল্লেখ করে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।
ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও নিয়ে ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়। ডেটা যাচাইকারী প্রতিষ্ঠান ডিসমিসল্যাবও জানিয়েছে, ঘটনার পর কিছু প্রো-আওয়ামী লীগ অ্যাকাউন্ট থেকে বাঁধনের বিরুদ্ধে কটূক্তি ও বিদ্বেষমূলক মন্তব্য ছড়ানো হয়েছিল। তবে হামলার সঙ্গে জড়িত প্রত্যেক ব্যক্তির রাজনৈতিক পরিচয় বা সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয়েছে—এমন দাবি করা যায় না। বাঁধনের অভিযোগের ভিত্তিতেই পুলিশি প্রক্রিয়া এগিয়েছে।
হামলার পর বাঁধন জানান, তিনি একা হয়ে যাননি। বরং বাংলাদেশ সরকার, ইতালিতে বাংলাদেশের কূটনৈতিক মিশন এবং ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসব কর্তৃপক্ষ তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ঘটনার রাতেই বাংলাদেশ সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও ইতালিতে বাংলাদেশের দূতাবাস তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করে। ইতালির স্থানীয় পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষও তাঁকে নিরাপত্তা দেয়। ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবের পরিচালক নিরাপত্তার কারণে তাঁকে লিডো এলাকায় থাকার ব্যবস্থা করে দেন বলেও জানিয়েছেন বাঁধন।
কিন্তু এই সহযোগিতার বিপরীতে নিজের সিনেমার টিমের আচরণ তাঁকে সবচেয়ে বেশি কষ্ট দিয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি। বাঁধনের ভাষ্য, হামলার পর উৎসবের বাকি দিনগুলোতে তাঁকে টিমের সঙ্গে অংশ নিতে নিষেধ করা হয়। শুধু ভেনিসেই নয়, পরবর্তী সময়ে টরন্টো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে যাওয়ার পরিকল্পনাতেও তাঁকে রাখা হয়নি বলে দাবি করেছেন তিনি।
বাঁধনের এই বক্তব্যের পর স্বাভাবিকভাবেই চলচ্চিত্র অঙ্গনে প্রশ্ন উঠেছে, একজন শিল্পী বিদেশের মাটিতে এমন একটি পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়ার পর তাঁর নিজের টিমের দায়িত্ব ও অবস্থান কী হওয়া উচিত। তবে এ বিষয়ে সিনেমাটির পরিচালক বা প্রযোজনা দলের পক্ষ থেকে বাঁধনের অভিযোগের বিস্তারিত কোনো পাল্টা বক্তব্য এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। ফলে তাঁর অভিযোগকে অভিযোগ হিসেবেই দেখা হচ্ছে এবং সংশ্লিষ্ট অন্য পক্ষের বক্তব্য পাওয়া গেলে সেটিও সমান গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
অভিনেত্রী অবশ্য পুরো টিমের আচরণ নিয়ে কথা বললেও কয়েকজন সহকর্মীর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, সহশিল্পী সুনেরাহ, জায়নিন এবং জায়নিনের মা কঠিন সময়ে তাঁর পাশে ছিলেন। অর্থাৎ একই সিনেমার দলের সবাই যে তাঁর থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলেন, এমনটি তিনি বলেননি; বরং কিছু মানুষের সহযোগিতার কথা আলাদাভাবে উল্লেখ করেছেন।
‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’ নিয়ে এবারের ভেনিস যাত্রা ছিল বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। রুবাইয়াত হোসেন পরিচালিত সিনেমাটি আন্তর্জাতিক উৎসবের প্ল্যাটফর্মে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রকে নতুন করে আলোচনায় নিয়ে আসে। এর আগে সিনেমাটির অভিনয়শিল্পীদের মধ্যে বাঁধন, শিমু ও সুনেরাহর নাম প্রকাশ্যে আসে এবং আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র অঙ্গনে নির্মাণটির প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়।
একদিকে সিনেমার আন্তর্জাতিক প্রদর্শনী, অন্যদিকে ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ—এই দুই বিপরীত অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে ভেনিসে সময় কাটাতে হয়েছে বাঁধনকে। তাঁর অভিযোগ অনুযায়ী, ঘটনার পর উৎসব কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে নিরাপত্তা পাওয়া গেলেও নিজের টিমের কাছ থেকে দূরত্বের অভিজ্ঞতা তাঁকে মানসিকভাবে আঘাত করেছে।
দেশে ফিরে বাঁধন আরও বলেন, বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশিদের হাতে এমন ঘটনা দেশের ভাবমূর্তির ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাঁর মতে, ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও বিদেশের মাটিতে সহিংসতা বা হেনস্তার মাধ্যমে তা প্রকাশ করা উচিত নয়। রাজনৈতিক মতাদর্শের বিভাজন যেন ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ও দেশের সম্মানকে ক্ষতিগ্রস্ত না করে—এমন আহ্বানও জানিয়েছেন তিনি।
বাঁধনের ওপর হামলার ঘটনায় ইতালিতে আইনগত প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে। এর আগে তিনি স্থানীয় পুলিশের কাছে অভিযোগ দায়ের করেন এবং বাংলাদেশি কূটনৈতিক মিশন তাঁকে আইনি ও অন্যান্য সহায়তা দেওয়ার কথা জানিয়েছিল। ফলে বিষয়টি এখন শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিতর্কে সীমাবদ্ধ নেই; স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা কর্তৃপক্ষের পর্যায়েও এর অনুসন্ধান চলছে।
এই ঘটনার আরেকটি দিকও গুরুত্বপূর্ণ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো ঘটনা ছড়িয়ে পড়ার পর মুহূর্তেই নানা ধরনের রাজনৈতিক ব্যাখ্যা, অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগ সামনে আসে। বাঁধনের ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। ফলে হামলার সঙ্গে কারা জড়িত, তাদের সুনির্দিষ্ট পরিচয় কী এবং ঘটনার পেছনে কী উদ্দেশ্য ছিল—এসব প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তর তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নির্ধারিত হওয়াই সবচেয়ে দায়িত্বশীল পথ।
একজন শিল্পীর রাজনৈতিক অবস্থান বা ব্যক্তিগত মতাদর্শ নিয়ে কারও ভিন্নমত থাকতেই পারে। কিন্তু সেই মতপার্থক্য যদি নিরাপত্তাহীনতা, হয়রানি বা শারীরিক আক্রমণের পর্যায়ে পৌঁছে যায়, তখন বিষয়টি আর নিছক মতের বিরোধ থাকে না। একইভাবে কোনো অভিযোগ ওঠার পর সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য শোনাও ন্যায়সংগত ও দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
বাঁধনের সাম্প্রতিক বক্তব্য তাই একদিকে ভেনিসে তাঁর অভিজ্ঞতার নতুন একটি অধ্যায় সামনে এনেছে, অন্যদিকে শিল্পী ও তাঁর কাজের টিমের পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়েও প্রশ্ন তৈরি করেছে। ভেনিসের ঘটনায় তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়া যেমন এগিয়ে যাবে, তেমনি তাঁর টিমের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ নিয়েও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য সামনে আসতে পারে। সব পক্ষের বক্তব্য ও যাচাইযোগ্য তথ্য পাওয়া গেলে পুরো ঘটনার চিত্র আরও স্পষ্ট হবে।
সবশেষে বাঁধনের অভিজ্ঞতা যে প্রশ্নটি সামনে এনেছে, তা শুধু একজন অভিনেত্রীর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আন্তর্জাতিক কোনো চলচ্চিত্র উৎসবে দেশের প্রতিনিধিত্ব করতে যাওয়া একজন শিল্পীর নিরাপত্তা, মর্যাদা ও পেশাগত অধিকার নিশ্চিত করা কতটা গুরুত্বপূর্ণ—এই ঘটনাও সেই আলোচনাকে নতুন করে সামনে এনেছে। মতের ভিন্নতা থাকবে, সমালোচনাও থাকবে; কিন্তু শিল্প ও সংস্কৃতির আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্বকারী ব্যক্তিদের ঘিরে সহনশীলতা, পেশাদারিত্ব ও মানবিকতার চর্চাই শেষ পর্যন্ত দেশের ভাবমূর্তিকে শক্তিশালী করতে পারে।


