চিকিৎসাশিক্ষায় অবদান রাখতে দেহদান করলেন লিটন দাশ

প্রকাশ: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।

মৃত্যুর পর মানুষের জন্য আর কীই-বা করা সম্ভব—এই প্রশ্নের এক মানবিক উত্তর রেখে গেছেন নবীগঞ্জের লিটন দাশ তালুকদার। জীবদ্দশায় দীর্ঘদিন অসুস্থতার সঙ্গে লড়াই করা এই ব্যক্তি নিজের মৃত্যুর পরও যেন অন্যদের কাজে আসতে পারেন, সেই ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন আগেই। সেই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী মৃত্যুর পর তাঁর মরদেহ শিক্ষা ও গবেষণার কাজে ব্যবহারের জন্য হস্তান্তর করা হয়েছে হবিগঞ্জ মেডিকেল কলেজে।

সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, হবিগঞ্জ মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার পর শিক্ষা ও গবেষণার কাজে ব্যবহারের জন্য কোনো মৃত ব্যক্তির মরদেহ গ্রহণের এটিই প্রথম ঘটনা। ফলে লিটন দাশের এই সিদ্ধান্ত শুধু তাঁর ব্যক্তিগত ইচ্ছাপূরণ নয়, স্থানীয় চিকিৎসাশিক্ষা ও গবেষণার ক্ষেত্রেও একটি স্মরণীয় ঘটনা হয়ে উঠেছে।

৩৯ বছর বয়সী লিটন দাশ তালুকদার নবীগঞ্জ পৌরসভার শিবপাশা এলাকার বাসিন্দা ছিলেন। তাঁর বাবা প্রয়াত দ্বিজেন্দ্র দাশ তালুকদার এবং মা রেখা রাণী দাশ। তিনি ছাত্রজীবনে সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পাশাপাশি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ছিলেন। দীর্ঘদিন ধরে কিডনি সমস্যায় ভুগছিলেন তিনি। একপর্যায়ে তাঁর দুটি কিডনিই নষ্ট হয়ে যায় এবং শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটতে থাকে।

অসুস্থতার সময়ই লিটন দাশ তাঁর পরিবারের সদস্যদের নিজের শেষ ইচ্ছার কথা জানান। মৃত্যুর পর প্রচলিত রীতিতে তাঁর মরদেহ দাহ না করে যেন মানবকল্যাণে ব্যবহার করা হয়—এমন ইচ্ছা ছিল তাঁর। চিকিৎসা ও মেডিকেল শিক্ষায় নিজের দেহকে কাজে লাগানোর সিদ্ধান্তটি তিনি শুধু মৌখিকভাবে পরিবারের কাছে জানাননি; বরং আনুষ্ঠানিকভাবেও তা নথিভুক্ত করেছিলেন।

গত ১৩ আগস্ট হবিগঞ্জের নোটারি কার্যালয়ের মাধ্যমে তিনি মরণোত্তর দেহদানের ঘোষণাপত্র সম্পাদন করেন। ওই ঘোষণায় তাঁর ভাই দিপু দাশ তালুকদার এবং মা রেখা রাণী দাশ স্বাক্ষর করেন। অর্থাৎ মৃত্যুর প্রায় এক মাস আগেই নিজের মরদেহ শিক্ষা ও গবেষণার কাজে ব্যবহারের বিষয়ে তাঁর সিদ্ধান্ত আনুষ্ঠানিক রূপ পায়।

পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, লিটন দাশ মনে করতেন মৃত্যুর পরও তাঁর দেহ যদি চিকিৎসাবিজ্ঞানের শিক্ষার্থী ও গবেষকদের কাজে লাগে, তাহলে সেটি অন্য মানুষের উপকারে আসতে পারে। তাঁর এই চিন্তার মধ্যে ছিল ব্যক্তিগত বিশ্বাসের পাশাপাশি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের চিকিৎসাশিক্ষায় অবদান রাখার আকাঙ্ক্ষাও।

১৩ সেপ্টেম্বর রোববার সকাল ১১টার দিকে নবীগঞ্জের শিবপাশা এলাকায় নিজ বাসভবনে মারা যান লিটন দাশ। মৃত্যুর খবর পাওয়ার পরই তাঁর পূর্বঘোষিত ইচ্ছা বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া শুরু হয়। হবিগঞ্জ মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. জাবেদ জিল্লুল বারি, অ্যানাটমি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ডা. সুপার্থ ভট্টাচার্যসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মরদেহ গ্রহণের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করতে উদ্যোগ নেন।

মরদেহ হস্তান্তরের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও আইনি প্রক্রিয়াও সম্পন্ন করা হয়। সংশ্লিষ্টদের প্রচেষ্টায় জেলা প্রশাসনের অনুমতিসহ প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষ করার পর ১৩ সেপ্টেম্বর রাত সাড়ে ৮টার দিকে লিটন দাশের বড় ভাই দিপু দাশ তালুকদার ও পরিবারের অন্য সদস্যরা মরদেহটি হবিগঞ্জ মেডিকেল কলেজ কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করেন।

মেডিকেল কলেজের পক্ষ থেকে অ্যানাটমি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ডা. সুপার্থ ভট্টাচার্য, প্রধান টেকনোলজিস্ট প্রশান্ত চন্দ্র দেব, হিসাবরক্ষক সূর্য লাল রায় এবং ক্যাশিয়ার নারায়ণ পালসহ সংশ্লিষ্টরা নবীগঞ্জে উপস্থিত ছিলেন। মরদেহ গ্রহণের পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হয় পরিবারের সদস্য ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সহযোগিতায়।

মরদেহ হস্তান্তরের আগে লিটন দাশের কর্ম ও স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হয়। বাসদ হবিগঞ্জ জেলা ও নবীগঞ্জ উপজেলা শাখার পক্ষ থেকে তাঁকে শ্রদ্ধাঞ্জলি দেওয়া হয়। তাঁর রাজনৈতিক সহযাত্রী ও পরিচিতজনেরা তাঁর এই সিদ্ধান্তকে মানবিক এবং সাহসী উদ্যোগ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

লিটন দাশের সিদ্ধান্তের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর একটি হলো, এটি ছিল তাঁর নিজের নেওয়া সিদ্ধান্ত। শারীরিক অবস্থার অবনতির সময় তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে জীবন হয়তো দীর্ঘ হবে না। সেই বাস্তবতার মধ্যেও মৃত্যুর পর নিজের দেহকে কীভাবে মানুষের কাজে লাগানো যায়, সে বিষয়ে তিনি আগেভাগেই সিদ্ধান্ত নেন। নোটারি করা ঘোষণাপত্রের মাধ্যমে সেই ইচ্ছাকে আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করাও তাঁর সিদ্ধান্তের দৃঢ়তার বিষয়টি তুলে ধরে।

চিকিৎসাশিক্ষায় মানবদেহের গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। মেডিকেল শিক্ষার্থীদের শরীরের গঠন ও অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সম্পর্কে বাস্তব ধারণা অর্জনের ক্ষেত্রে মানবদেহ নিয়ে শিক্ষা ও গবেষণার সুযোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এ কারণে মরণোত্তর দেহদান চিকিৎসাবিজ্ঞানের জ্ঞানচর্চায় অবদান রাখার একটি পথ হিসেবে বিবেচিত হয়। লিটন দাশের মরদেহ হবিগঞ্জ মেডিকেল কলেজে গ্রহণের ঘটনাটি সেই দিক থেকে স্থানীয় চিকিৎসাশিক্ষার জন্যও তাৎপর্যপূর্ণ।

হবিগঞ্জ মেডিকেল কলেজের জন্য বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে, কারণ সংশ্লিষ্টদের মতে প্রতিষ্ঠানটি প্রতিষ্ঠার পর এই প্রথম কোনো মৃত মানবদেহ শিক্ষা ও গবেষণার কাজে গ্রহণ করেছে। এর ফলে লিটন দাশের দেহদান প্রতিষ্ঠানটির ইতিহাসেও একটি বিশেষ ঘটনা হিসেবে যুক্ত হলো।

তাঁর এই সিদ্ধান্ত ঘিরে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে এসেছে—মৃত্যুর পর মানুষের শরীরকে নিয়ে সামাজিক ও পারিবারিক নানা ধারণা থাকলেও কেউ কেউ সেই প্রচলিত ধারণার বাইরে গিয়ে মানবকল্যাণকে অগ্রাধিকার দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। লিটন দাশের পরিবারও তাঁর জীবদ্দশায় নেওয়া সিদ্ধান্তকে সম্মান করে তা বাস্তবায়নে সহযোগিতা করেছে। এই সহযোগিতা ছাড়া তাঁর শেষ ইচ্ছা বাস্তবায়ন সম্ভব হতো না।

লিটন দাশের মৃত্যুর খবর যেমন তাঁর পরিবার ও স্বজনদের জন্য শোকের, তেমনি তাঁর শেষ সিদ্ধান্ত সেই শোকের মধ্যেও একটি ভিন্ন অর্থ তৈরি করেছে। প্রিয় মানুষটিকে হারানোর কষ্টের পাশাপাশি তাঁর ইচ্ছাকে সম্মান জানিয়ে মানবকল্যাণের কাজে তাঁর দেহ হস্তান্তরের মাধ্যমে পরিবারও একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছে।

মেডিকেল কলেজের সংশ্লিষ্টদের কাছেও এটি কেবল একটি মরদেহ গ্রহণের ঘটনা নয়; বরং একজন মানুষের মৃত্যুর পরও শিক্ষা ও জ্ঞানচর্চার সঙ্গে তাঁর সংযোগ তৈরি হওয়ার ঘটনা। একজন চিকিৎসাশিক্ষার্থী ভবিষ্যতে যে জ্ঞান অর্জন করবেন, গবেষণায় যে তথ্য ব্যবহার করবেন বা চিকিৎসাসেবায় যে দক্ষতা কাজে লাগাবেন—তার পেছনে মরণোত্তর দেহদানের মতো উদ্যোগের অবদান থাকতে পারে।

লিটন দাশের জীবন হয়তো দীর্ঘ হয়নি। দীর্ঘদিনের অসুস্থতা তাঁকে শারীরিকভাবে দুর্বল করে দিয়েছিল। কিন্তু মৃত্যুর আগে নেওয়া তাঁর একটি সিদ্ধান্ত তাঁকে স্থানীয় মানুষের কাছে আলাদা পরিচয় দিয়েছে। নিজের জন্য নয়, মৃত্যুর পরও অন্যের উপকারে আসার যে ইচ্ছা তিনি প্রকাশ করেছিলেন, সেটিই শেষ পর্যন্ত তাঁর জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হয়ে থাকল।

হবিগঞ্জ মেডিকেল কলেজে তাঁর মরদেহ গ্রহণের মধ্য দিয়ে সেই ইচ্ছার বাস্তবায়ন হয়েছে। তাঁর পরিবার, মেডিকেল কলেজ কর্তৃপক্ষ এবং সংশ্লিষ্টদের সমন্বয়ে সম্পন্ন হয়েছে পুরো প্রক্রিয়া। এখন তাঁর রেখে যাওয়া সিদ্ধান্ত চিকিৎসাশিক্ষা ও গবেষণার কাজে কতটা অবদান রাখে, সেটিই হবে এই উদ্যোগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিণতি।

মৃত্যু একজন মানুষের জীবনের সমাপ্তি হলেও লিটন দাশ তালুকদারের ক্ষেত্রে তাঁর নিজের সিদ্ধান্ত সেই সমাপ্তির পরেও একটি মানবিক অধ্যায়ের দরজা খুলে দিয়েছে। মানুষের জন্য কিছু রেখে যাওয়ার ইচ্ছা যে শুধু জীবদ্দশার কাজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, তাঁর মরণোত্তর দেহদান সেই কথাই মনে করিয়ে দেয়। হবিগঞ্জ মেডিকেল কলেজে প্রথম মরণোত্তর দেহদানের এই ঘটনা তাই শুধু একটি ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের গল্প নয়; এটি চিকিৎসাশিক্ষা, মানবকল্যাণ এবং মৃত্যুর পরও মানুষের কাজে থাকার এক অনন্য দৃষ্টান্ত।

এই সপ্তাহের খবরাখবর

সিলেটে হামের দুঃসংবাদ, আরও এক শিশুর মৃত্যু

প্রকাশ: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

দক্ষিণ আফ্রিকায় ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনা, নিহত ২১

প্রকাশ: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

গায়েবি মামলা নয়, প্রকৃত অপরাধীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা: জি কে গউস

প্রকাশ: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

‘ভেনিসের পর টিম আমাকে ডিজওন করেছে’: বাঁধন

প্রকাশ: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সাইবার আইনের সংশোধনী নিয়ে সিপিজের উদ্বেগ

প্রকাশ: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

বিষয়বস্তু

সিলেটে হামের দুঃসংবাদ, আরও এক শিশুর মৃত্যু

প্রকাশ: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

দক্ষিণ আফ্রিকায় ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনা, নিহত ২১

প্রকাশ: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

গায়েবি মামলা নয়, প্রকৃত অপরাধীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা: জি কে গউস

প্রকাশ: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

‘ভেনিসের পর টিম আমাকে ডিজওন করেছে’: বাঁধন

প্রকাশ: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সাইবার আইনের সংশোধনী নিয়ে সিপিজের উদ্বেগ

প্রকাশ: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

ময়মনসিংহ মেডিকেলে আগুন, ৬ জনের মৃত্যু নিয়ে নতুন তথ্য

প্রকাশ: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সিলেটে সন্ধ্যা পর্যন্ত বৃষ্টির পূর্বাভাস

প্রকাশ: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

রাষ্ট্রপতিকে স্বাগত জানাতে সিলেটে বিএনপির প্রস্তুতি

প্রকাশ: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সম্পর্কিত নিবন্ধ

জনপ্র্যিয় পেজ