প্রকাশ: ১২ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এক অভাবনীয় ও নাটকীয় পরিবর্তন আসার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছে। সবকিছু যদি পরিকল্পনামাফিক এবং দলীয় হাইকমান্ডের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ঠিকঠাকভাবে এগোয়, তবে দেশের পরবর্তী রাষ্ট্রপতি হিসেবে দেখা যেতে পারে অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ, বিএনপির বর্তমান মহাসচিব এবং স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ এই সাংবিধানিক পদে তাঁর সম্ভাব্য আসীন হওয়াকে কেন্দ্র করে শুধু সরকারি কিংবা দলীয় পরিমণ্ডলেই নয়, বরং পুরো দেশের রাজনৈতিক মহলে শুরু হয়েছে গভীর চুলচেরা বিশ্লেষণ ও নানামুখী সমীকরণের হিসাব-নিকাশ। দীর্ঘ প্রায় তিন দশকেরও বেশি সময় পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে পুনরায় ভোটের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু হতে যাওয়ায় এই নির্বাচনকে ঘিরে আগ্রহের পারদ এখন তুঙ্গে। একই সঙ্গে দেশের প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপির অভ্যন্তরেও তৈরি হয়েছে নতুন নেতৃত্বের পালাবদল এবং সাংগঠনিক কাঠামোগত রদবদলের এক বিশাল আলোচনার ঝড়।
রাষ্ট্রপতি পদের নির্বাচনকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গেই বিবেচনা করছে দেশের রাজনৈতিক দলগুলো। ইতোমধ্যেই নির্বাচন কমিশন থেকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক তফসিল ঘোষণা করা হয়েছে এবং গত রোববার থেকেই শুরু হয়েছে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ ও জমাদানের কাজ। নির্বাচন কমিশনের তপশিল অনুযায়ী মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ দিন হিসেবে নির্ধারিত রয়েছে ১৩ আগস্ট। এই প্রেক্ষাপটে বিএনপি দলীয়ভাবে দুটি মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছে বলে নিশ্চিত করা হয়েছে। জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি এবং দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী সশরীরে নির্বাচন কমিশন কার্যালয় থেকে বিএনপির পক্ষে এই মনোনয়নপত্র দুটি সংগ্রহ করেন। তবে দলীয় মনোনয়নপত্র সংগ্রহের সুনির্দিষ্ট মুহূর্তে প্রার্থীর নাম আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা না হলেও, দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম স্থায়ী কমিটির একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্র ও অভ্যন্তরীণ আলোচনা থেকে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে, রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদের জন্য মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নামই সবচেয়ে জোরালোভাবে বিবেচনায় রাখা হয়েছে। জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন এগারো দলীয় ঐক্যের পক্ষ থেকে এই পদে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদকে প্রার্থী করা হয়েছে, যা এবারের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে আরও বেশি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ করে তুলেছে।
দীর্ঘ ৩৫ বছর পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভোটের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের এই বিরল ঘটনাটি বিশেষভাবে নজর কেড়েছে। ১৯৯১ সালের পর থেকে বাংলাদেশে একাধিকবার রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার আনুষ্ঠানিক সুযোগ সৃষ্টি হলেও অতীতে কখনোই ভোটের প্রয়োজন পড়েনি। প্রতিবারই ক্ষমতাসীন দল বা জোটের পক্ষ থেকে একজন মাত্র প্রার্থী মনোনীত হওয়ায় অন্য কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী না থাকায় তারা সবাই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়ে আসছিলেন। তবে বর্তমান রাজনৈতিক সমীকরণ ও বিরোধী ধারার শক্ত অবস্থানের কারণে এবার একাধিক প্রার্থী মাঠে থাকায় জাতীয় সংসদের সম্মানিত সংসদ সদস্যদের গোপন ভোটের মাধ্যমেই নির্ধারিত হতে যাচ্ছে দেশের তেইশতম রাষ্ট্রপতি কে হবেন। এই পরিস্থিতিতে বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম বা স্থায়ী কমিটির একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক গত ১ আগস্ট গুলশানে দলের চেয়ারম্যানের রাজনৈতিক কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত হয়। দীর্ঘ ও বিস্তারিত আলোচনার পর রাষ্ট্রপতি পদে দলীয় প্রার্থী চূড়ান্ত করার সমস্ত ক্ষমতা এবং পূর্ণ দায়িত্ব দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ওপর অর্পণ করেন স্থায়ী কমিটির সম্মানিত সদস্যরা। এরপর থেকেই দলীয় অভ্যন্তরে ও দেশজুড়ে মির্জা ফখরুলের নাম রাষ্ট্রপতির দৌড়ে প্রধান আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বর্ণিল ও দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ পদে তাঁর এই মনোনয়ন পাওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছে। সুদীর্ঘ রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে তিনি জীবনের একটি দীর্ঘ সময় সংসদ সদস্য, সরকারের বিভিন্ন দায়িত্বশীল মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী এবং পূর্ণ মন্ত্রীর দায়িত্ব অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে পালন করেছেন। বিশেষ করে বিগত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপির মহাসচিবের অত্যন্ত দায়িত্বপূর্ণ ও কঠিন কাজটি তিনি অত্যন্ত সুনিপুণভাবে পরিচালনা করে আসছেন। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে দলের বিভিন্ন দুঃসময়ে তিনি যে অবিচল নেতৃত্ব ও সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন, তা দলীয় সীমানা ছাড়িয়ে জাতীয় পর্যায়েও প্রশংসিত হয়েছে। এই দীর্ঘ রাজনৈতিক যাত্রায় তাঁকে নানা মিথ্যা ও রাজনৈতিক হয়রানিমূলক মামলার মুখোমুখি হতে হয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে নথিপত্র অনুযায়ী মোট একশত এগারোটি মামলা দায়ের করা হয়েছিল এবং তাঁকে কারাবরণ করতে হয়েছে এগারো বার। দীর্ঘ রাজনৈতিক লড়াইয়ে তাঁকে প্রায় সাড়ে তিন বছর অন্ধকার কারা প্রকোষ্ঠে বন্দি জীবন কাটাতে হয়েছে। জেল-জুলুম, অত্যাচার ও নির্যাতনের মুখেও দলের প্রতি তাঁর আপসহীন আনুগত্য এবং রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে তাঁর ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতাই তাঁকে আজ রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদে আসীন করার ক্ষেত্রে সবার শীর্ষে নিয়ে এসেছে।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর যদি দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত হন এবং বঙ্গভবনে প্রবেশ করেন, তবে বিএনপির সাংগঠনিক কাঠামোতে স্বাভাবিকভাবেই একটি বড় ধরনের শূন্যতা ও নতুন সমীকরণের সৃষ্টি হবে। দলের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদ তথা মহাসচিবের দায়িত্ব কে পাবেন এবং কার কাঁধে এই বিশাল সাংগঠনিক কাঠামোর ভার ন্যস্ত হবে, তা নিয়ে দলের ভেতরের পাড়ায় পাড়ায় এখন চলছে তীব্র আলোচনা। বিএনপির গঠনতন্ত্র এবং রাজনৈতিক গুরুত্বের দিক থেকে মহাসচিবের পদটি অত্যন্ত সংবেদনশীল। বিভিন্ন গ্রুপ-উপগ্রুপের সমন্বয় সাধন, দলের ভেতরকার কট্টরপন্থী ও মধ্যপন্থীদের সমস্ত বিভাজন ও মতপার্থক্য দূরে সরিয়ে রেখে পুরো দলকে একটি সুদৃঢ় ঐক্যের সুতোয় গেঁথে রাখার মূল গুরুদায়িত্বটি পালন করতে হয় মহাসচিবকে। বিশেষ করে সামনে রয়েছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্থানীয় সরকার নির্বাচন এবং দলের আসন্ন জাতীয় কাউন্সিলসহ অদূর ভবিষ্যতের নানা রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ। এই সমস্ত ইস্যু মোকাবিলায় একজন দক্ষ ও পরীক্ষিত মহাসচিবের বিকল্প নেই।
মহাসচিব পদে দলীয় অভ্যন্তরীণ আলোচনায় যাঁদের নাম জোরালোভাবে উচ্চারিত হচ্ছে, তাঁদের মধ্যে সবার ওপরে রয়েছে দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর নাম। দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের দিনগুলোতে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে অবস্থান করে যেভাবে তিনি রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন, রাজপথের লড়াকু ভূমিকা এবং গণমাধ্যমের সামনে দলের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে তুলে ধরেছেন, তাতে তিনি তৃণমূল নেতাকর্মীদের কাছে অন্যতম ভরসার প্রতীকে পরিণত হয়েছেন। মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি হলে রিজভীকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব অর্পণ করা হতে পারে বলে দলের একাধিক সূত্র আভাস দিয়েছে। তবে এই বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে রুহুল কবির রিজভী অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে জানান যে তিনি দলের প্রতি শতভাগ অনুগত থেকে একজন সাধারণ কর্মীর মতো কাজ করে যাচ্ছেন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রতিটি নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করেই তিনি দলের নেতাকর্মীদের পাশে আছেন এবং দল যদি তাঁকে কোনো বিশেষ দায়িত্ব অর্পণ করে, তবেই সে বিষয়ে তিনি চিন্তা করবেন। এর বাইরে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্বে থাকা স্থায়ী কমিটির প্রভাবশালী সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ এবং অভিজ্ঞ নেতা আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নামও মহাসচিব পদের আলোচনায় রয়েছে। তবে তাঁরা দুজনেই বর্তমানে সরকারের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ব্যস্ত থাকায় দলীয় সাংগঠনিক দিকটি দেখার জন্য সরকারের বাইরের কোনো জ্যেষ্ঠ নেতাকে এই দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এদিকে বিএনপির মূল গঠনতন্ত্র পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, সরাসরি ‘ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব’ বলে সুনির্দিষ্ট বা স্থায়ী কোনো পদের উল্লেখ সেখানে নেই। তবে গঠনতন্ত্রের বিধান অনুযায়ী দলের মহাসচিবের অনুপস্থিতি, গুরুতর অসুস্থতা বা পদ শূন্য হওয়ার মতো জরুরি পরিস্থিতিতে দলের প্রধান বা চেয়ারম্যান তাঁর বিশেষ সাংগঠনিক ক্ষমতাবলে যেকোনো জ্যেষ্ঠ নেতাকে ‘ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব’ হিসেবে সাময়িক দায়িত্ব প্রদান করতে পারেন। দলের গঠনতন্ত্রে মহাসচিবের কার্যাবলি ও ক্ষমতা সম্পর্কে আলাদাভাবে সুনির্দিষ্ট ধারা না থাকলেও দলের চেয়ারম্যানের সিদ্ধান্ত এবং নির্দেশনাই মূলত মহাসচিব পদের মূল পরিচালিকা শক্তি হিসেবে কাজ করে। দলীয় কাউন্সিল বা বিশেষ জরুরি পরিস্থিতিতে চেয়ারম্যানের হাতেই মহাসচিব নিয়োগ, পদায়ন বা যেকোনো কাঠামোগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার পূর্ণ সাংগঠনিক ক্ষমতা অর্পণ করা আছে। রুহুল কবির রিজভীকে যদি শেষ পর্যন্ত দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব বা পূর্ণাঙ্গ দায়িত্ব প্রদান করা হয়, তবে তাঁর বর্তমান পদ অর্থাৎ সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিবের শূন্যস্থানটিতে কাকে স্থলাভিষিক্ত করা হবে, তা নিয়েও চলছে নানা জল্পনা-কল্পনা। এই পদের জন্য দলের অন্যতম সক্রিয় ও লড়াকু নেতা যুগ্ম মহাসচিব শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি এবং হাবিব উন নবী খান সোহেলের নাম অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন এবং দলীয় রদবদলের এই পুরো প্রক্রিয়ার বাইরে আরেকটি উল্লেখযোগ্য বিষয় আলোচনার কেন্দ্রে চলে এসেছে, সেটি হলো মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নিজের সংসদীয় আসন। তিনি রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলে তাঁর বর্তমান সংসদীয় আসন অর্থাৎ ঠাকুরগাঁও-১ (সদর) আসনটি আনুষ্ঠানিকভাবে শূন্য ঘোষণা করা হবে। সংবিধান ও নির্বাচনী বিধিমালা অনুযায়ী আসনটি শূন্য হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সেখানে একটি উপনির্বাচন অনুষ্ঠানের যাবতীয় প্রস্তুতি গ্রহণ করবে নির্বাচন কমিশন। সব মিলিয়ে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এখন এক অভাবনীয় পরিবর্তনের হাওয়া বইছে। একদিকে দীর্ঘ ৩৫ বছর পর সংসদীয় ভোটের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সম্পন্ন হওয়ার ঐতিহাসিক প্রক্রিয়া, অন্যদিকে দেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক দলের নীতিনির্ধারণী স্তরে বড় ধরনের রদবদল—এই সবকিছু মিলেই আগামী দিনগুলোতে বাংলাদেশের রাজনীতি এক নতুন ও গতিশীল অধ্যায়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।


