প্রকাশ: ১২ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
আন্তর্জাতিক রাজনীতি এবং মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে এক দীর্ঘমেয়াদী ও রক্তক্ষয়ী সংঘাতের অবসান ঘটিয়ে শান্তি প্রতিষ্ঠার পথে এক নতুন ও আশাব্যঞ্জক মোড় নিয়েছে বর্তমান পরিস্থিতি। দীর্ঘদিনের বৈরিতা ও উত্তেজনার অবসান ঘটিয়ে নির্ধারিত ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতির সময়সীমা সম্পূর্ণ শেষ হওয়ার আগেই এর মেয়াদ আরও বৃদ্ধি করতে নীতিগতভাবে সম্মত হয়েছে পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্র এবং মধ্যপ্রাচ্যের প্রভাবশালী রাষ্ট্র ইরান। আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক অঙ্গনে যুদ্ধাবস্থার অবসান এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে এই যুগান্তকারী অগ্রগতি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা। তুরস্কের মর্যাদাপূর্ণ রাষ্ট্রায়ত্ত সংবাদমাধ্যম আনাদোলু এজেন্সির পরিবেশিত একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেদনের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে জানা গেছে যে, পাকিস্তান সরকারের অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য ও উচ্চপর্যায়ের একটি কূটনৈতিক সূত্রের মাধ্যমেই এই ইতিবাচক সংবাদটি বিশ্ববাসীর সামনে প্রকাশ পায়। দীর্ঘ আলাপ-আলোচনা ও পারস্পরিক আস্থার পরিবেশ সৃষ্টির মধ্য দিয়ে দুই দেশের শীর্ষ পর্যায়ের নীতিনির্ধারকরা এই যুদ্ধবিরতির সময়সীমা বাড়ানোর এই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন।
আনাদোলু এজেন্সির বিস্তারিত প্রতিবেদনে সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, গত কিছুদিন পূর্বে সম্পাদিত ঐতিহাসিক ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারকের অধীনে দুই দেশের মধ্যে সংঘাত স্থগিত রাখার জন্য প্রাথমিকভবে যে সুনির্দিষ্ট ৬০ দিনের সময়সীমা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছিল, সেই নির্ধারিত মেয়াদ ফুরিয়ে আসার আগেই তা সম্প্রসারণের বিষয়ে উভয় পক্ষ একমত পোষণ করেছে। গত কয়েক দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার সম্পর্কে যে গভীর অবিশ্বাস ও অনাস্থার দেওয়াল তৈরি হয়েছিল, এই কূটনৈতিক সমঝোতা এবং যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত সেই বরফ গলাতে শুরু করেছে। যদিও যুদ্ধবিরতির মেয়াদ ঠিক কত দিন পর্যন্ত বাড়ানো হবে কিংবা এই সমঝোতা বা চুক্তির অন্যান্য গোপন ও প্রকাশ্য শর্তগুলো কী কী হতে পারে, সে বিষয়ে ওই প্রতিবেদনে তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত কিছু প্রকাশ করা হয়নি। তবে কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা, দুই দেশের মধ্যে চলমান উত্তেজনা প্রশমিত করতে এবং স্থায়ী শান্তির পথ সুগম করতে এই সময়সীমা বাড়ানো অত্যন্ত ফলপ্রসূ ভূমিকা পালন করবে।
এই পুরো শান্তি প্রক্রিয়ার নেপথ্যে মূল মধ্যস্থতাকারী হিসেবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও প্রশংসনীয় ভূমিকা পালন করে চলেছে ভ্রাতৃপ্রতিম রাষ্ট্র পাকিস্তান। পাকিস্তানের প্রত্যক্ষ কূটনৈতিক মধ্যস্থতা এবং আন্তরিক প্রচেষ্টার ফলেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের নীতিনির্ধারকদের একই টেবিলে বসানো সম্ভব হয়েছিল। দুই দেশের মধ্যকার এই চলমান বৈরিতা ও সামরিক সংঘাত অবসানের মহান লক্ষ্যকে সামনে রেখেই মূলত ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছিল। পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত বিভিন্ন কূটনৈতিক বৈঠকের ফলশ্রুতিতেই এই সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়, যা পরবর্তীতে দুই দেশের মধ্যে চলমান রক্তক্ষয়ী সংঘাত বন্ধে এক শক্তিশালী ব্রেকথ্রু বা মোড় পরিবর্তনকারী হিসেবে কাজ করে। দীর্ঘ সামরিক উত্তেজনার পর দুই দেশের পক্ষ থেকেই শান্তি বজায় রাখার এই সদিচ্ছা বিশ্বজুড়ে শান্তিপ্রিয় মানুষের মনে নতুন আশার সঞ্চার করেছে।
মধ্যপ্রাচ্যসহ পুরো বিশ্বজুড়ে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের এই পারস্পরিক সমঝোতা অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলবে বলে মনে করছেন বিশ্বনেতারা। যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বৃদ্ধির এই সিদ্ধান্ত কেবল দুই দেশের সামরিক সংঘাতকেই দীর্ঘ সময়ের জন্য থামিয়ে রাখবে না, বরং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে স্বাভাবিক করতে এবং অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতা দূর করতেও সাহায্য করবে। বিগত দিনগুলোতে সংঘাতের কারণে উভয় দেশের সাধারণ মানুষকে যে চরম দুর্ভোগ ও অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে দিন কাটাতে হয়েছিল, যুদ্ধবিরতির এই ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে সেই সংকটের স্থায়ী সমাধান ত্বরান্বিত হবে। যুদ্ধাবস্থার কারণে বিশ্ব অর্থনীতিতেও যে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছিল, তা থেকে উত্তরণের জন্য এই শান্তি প্রক্রিয়া অত্যন্ত কার্যকর হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকেও পাকিস্তান সরকারের এই সফল মধ্যস্থতা এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানোর নীতিগত সিদ্ধান্তকে অত্যন্ত সাধুবাদ জানানো হয়েছে। বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় সব ধরনের যুদ্ধংদেহী মনোভাব ত্যাগ করে আলোচনার মাধ্যমে যে কোনো দীর্ঘস্থায়ী সংকটের শান্তিপূর্ণ সমাধান সম্ভব, এই ঘটনা তারই এক উজ্জ্বল প্রমাণ। আগামী দিনগুলোতে এই সমঝোতা স্মারকের শর্তগুলো আরও সুদৃঢ় করার মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক উন্নয়নের পথ আরও প্রশস্ত হবে বলে আশা প্রকাশ করছেন সংশ্লিষ্ট কূটনৈতিক মহল। যুদ্ধবিরতির এই ধারাবাহিকতা বজায় রেখে উভয় দেশ যদি পূর্ণাঙ্গ ও স্থায়ী শান্তি চুক্তির দিকে এগিয়ে যেতে পারে, তবে তা কেবল দুই দেশের জন্যই নয়, বরং সমগ্র বিশ্বমানবতার জন্য এক বিরাট বিজয় হিসেবে ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।


