প্রকাশ: ০৫ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা রাজনৈতিক পটপরিবর্তন, রক্তক্ষয়ী সংঘাত, গুম, খুন এবং রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের কাল অধ্যায় পেরিয়ে এসে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন আবারও এক নতুন উত্তাপের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। ছাত্র-জনতার রক্তে অর্জিত অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ফ্যাসিবাদের পতন ঘটলেও রাজনৈতিক পুনর্বাসনের নানামুখী গুঞ্জন এবং পতিত শক্তির ফিরে আসার ঘোষণায় জনমনে তীব্র ক্ষোভ ও আশঙ্কার সৃষ্টি হয়েছে। এমন এক সংকটময় ও উত্তাল রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে অত্যন্ত কঠোর ও দ্ব্যর্থহীন বার্তা দেওয়া হয়েছে। পতিত স্বৈরাচারী রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ যদি পুনরায় দেশে ফেরার দুঃসাহস দেখায় এবং পুনর্বাসিত হওয়ার চেষ্টা করে, তবে তাদের বিরুদ্ধে জনগণের শক্তি নিয়ে অপ্রতিরোধ্য যুদ্ধ ঘোষণা করা হবে বলে স্পষ্ট হুংকার ছেড়েছেন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম। ৫ আগস্ট ঐতিহাসিক জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস স্মরণে রাজধানী ঢাকার শেরেবাংলা নগরের বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত এক বিশাল ও মর্যাদাপূর্ণ আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এই কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন।
বুধবার দুপুরে আয়োজিত ওই অনুষ্ঠানে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বীর যোদ্ধা, শহীদ পরিবারের সদস্য, সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এবং বিশিষ্ট রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বরা উপস্থিত ছিলেন। পুরো অনুষ্ঠানজুড়ে যখন জুলাইয়ের সেই গৌরবোজ্জ্বল দিনগুলোর স্মৃতিচারণা চলছিল, ঠিক তখনই বর্তমান রাজনৈতিক স্থবিরতা এবং পতিত শক্তির নানা ষড়যন্ত্রের প্রসঙ্গ টেনে দেশের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি তার স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে অত্যন্ত কড়া ভাষায় বক্তব্য রাখেন। তিনি বলেন, দেশজুড়ে দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে চলা নজিরবিহীন খুন, বিরোধী মত দমনের নামে অমানবিক গুম এবং পৈশাচিক আয়নাঘরের মতো গোপন বন্দিশালার সৃষ্টি করে যারা মানবতাবিরোধী অপরাধ ঘটিয়েছে, সেই আওয়ামী লীগ আজ নতুন করে ষড়যন্ত্রের জাল বুনছে। বিভিন্ন মাধ্যমে খবর পাওয়া যাচ্ছে যে, তারা আগামী ডিসেম্বরে যেকোনো মূল্যে দেশে ফিরে আসার পরিকল্পনা করছে। এই প্রসঙ্গে তিনি অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে বলেন, আওয়ামী লীগ যদি সত্যিই মাঠে নামার দুঃসাহস দেখায়, তবে তাদের বিরুদ্ধে রাজপথেই চূড়ান্ত রাজনৈতিক মোকাবিলা ও যুদ্ধ হবে। জনগণের অধিকার হরণকারী এই শক্তিকে বাংলার মাটিতে আর মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে দেওয়া হবে না বলে তিনি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা করেন।
অনুষ্ঠানের শুরুতে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের গৌরবময় ইতিহাস ও আত্মত্যাগের ওপর নির্মিত একটি বিশেষ প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়। তবে সেই প্রামাণ্যচিত্রের বিষয়বস্তু এবং নির্মাণশৈলী নিয়ে তীব্র অসন্তোষ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি। তিনি আক্ষেপের সুরে বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানের সবচেয়ে বড় ও শক্তিশালী প্রতীক, পুলিশের গুলিতে বুক পেতে দেওয়া শহিদ আবু সাঈদের ছবি এবং ফ্যাসিবাদবিরোধী দীর্ঘ লড়াইয়ের আপসহীন নেত্রী খালেদা জিয়ার ছবি ওই প্রামাণ্যচিত্রে যথাযথভাবে স্থান না পাওয়া অত্যন্ত হতাশার ও দুঃখজনক। ইতিহাসের এই গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলোকে বাদ দেওয়া কিংবা অবমূল্যায়ন করার পেছনে কোনো অসৎ উদ্দেশ্য থাকতে পারে বলে ইঙ্গিত করেন তিনি। প্রামাণ্যচিত্রে এমন গুরুতর অসঙ্গতি থাকার কারণে ইতোমধ্যে আয়োজকদের পক্ষ থেকে দুঃখপ্রকাশ করা হলেও, জাতীয় পর্যায়ের এই গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানে হট্টগোল ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হওয়া কোনোভাবেই কাম্য ছিল না বলে মন্তব্য করেন তিনি। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, শহিদ ও আহত যোদ্ধাদের স্মরণে আয়োজিত এমন একটি ভাবগাম্ভীর্যপূর্ণ জাতীয় অনুষ্ঠানে এ ধরনের বিশৃঙ্খলা জাতি হিসেবে আমাদের জন্য লজ্জাজনক।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে জীবন বাজি রাখা আহত ও বীর যোদ্ধাদের বর্তমান মানবেতর জীবনযাপন এবং রাষ্ট্রীয় অবহেলার চিত্র তুলে ধরে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি তীব্র ভাষায় অসন্তোষ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, যে তরুণেরা নিজেদের রক্ত দিয়ে দেশকে স্বৈরাচারমুক্ত করেছে, আজ সেই জুলাই যোদ্ধাদের নিজেদের ন্যায্য অধিকার ও চিকিৎসার সহায়তার জন্য বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের বারান্দায় বারান্দায় ঘুরে বেড়াতে হচ্ছে। এটি অত্যন্ত বেদনাদায়ক এবং আমাদের সমগ্র জাতির জন্য চরম লজ্জার বিষয়। আহত ও শহিদ পরিবারগুলোর কষ্ট লাঘব করা এবং তাদের জীবনযাত্রার মান নিশ্চিত করা এই অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অন্যতম প্রধান নৈতিক দায়িত্ব ও কর্তব্য হওয়া উচিত। সরকার গঠনের পর থেকে প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে যে স্থবিরতা বা আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দেখা দিয়েছে, তা দ্রুত দূর করার জন্য সংশ্লিষ্ট মহলের প্রতি কঠোর নির্দেশ দেন তিনি। বর্তমান সরকারের মূল লক্ষ্য ও দর্শন হওয়া উচিত জুলাইয়ের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে সাধারণ মানুষের আকাঙ্ক্ষা পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও বিশিষ্ট নাগরিকরা মনে করছেন যে, ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির এই কড়া বক্তব্য দেশের চলমান রাজনৈতিক সংকটে একটি বড় টার্নিং পয়েন্ট হিসেবে কাজ করবে। একদিকে যখন পতিত স্বৈরাচারী শক্তি দেশের বাইরে বসে নানা ধরনের অস্থিতিশীলতা তৈরির অপচেষ্টা চালাচ্ছে, অন্যদিকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে এমন আপসহীন অবস্থান সাধারণ জনতা এবং জুলাই যোদ্ধাদের মনে নতুন করে আস্থার জন্ম দিয়েছে। দীর্ঘ ১৬ বছরের দুঃশাসনে যারা সর্বস্ব হারিয়েছেন, তাদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত না করা পর্যন্ত দেশের প্রকৃত গণতন্ত্র ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয় বলেও মত প্রকাশ করেন বক্তারা।
অনুষ্ঠানের শেষ পর্যায়ে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহিদ হওয়া বীরদের আত্মার মাগফিরাত কামনা এবং আহত যোদ্ধাদের দ্রুত সুস্বাস্থ্য ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করার জন্য বিশেষ মোনাজাত করা হয়। পুরো আয়োজনে উপস্থিত রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, ছাত্র প্রতিনিধি ও আমন্ত্রিত অতিথিরা একসুরে ফ্যাসিবাদের যেকোনো ধরনের পুনরুত্থান রুখে দেওয়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রের এই ঐতিহাসিক সমাবেশ থেকে দেশের প্রতিটি কোণায় একটি শক্তিশালী বার্তা পৌঁছে গেছে যে, রক্তে কেনা এই নতুন স্বাধীনতাকে রক্ষা করতে আপামর জনসাধারণ সর্বদা রাজপথে অতন্দ্র প্রহরীর মতো সজাগ রয়েছে।


