প্রকাশ: ১২ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সহজ শর্তে এবং নামমাত্র সুদে বড় অঙ্কের ঋণ পাইয়ে দেওয়ার লোভ দেখিয়ে সাধারণ মানুষের কষ্টের সঞ্চিত অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিনব এক প্রতারণার ঘটনা ঘটেছে। ফরিদপুর জেলার সদরপুর উপজেলায় ‘এমপাওয়ারমেন্ট সেন্টার ফর ওমেন (ইসিডব্লিউ)’ নামের একটি নামসর্বস্ব ও সম্পূর্ণ ভুয়া প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে এলাকার শত শত নিরীহ মানুষের সঙ্গে প্রতারণার অভিযোগ উঠেছে। ঋণ বিতরণের নির্ধারিত দিনে অফিসে এসে দরজায় ঝুলন্ত তালা দেখতে পেয়ে সর্বস্বান্ত হওয়া গ্রাহকদের মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ে। প্রতারক চক্রের সদস্যরা গ্রাহকদের কাছ থেকে সঞ্চয়ের নামে বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ করে রাতের অন্ধকারে উধাও হয়ে গেছে। এই আকস্মিক ও মর্মান্তিক প্রতারণার শিকার হয়ে এলাকার সাধারণ মানুষ এখন চরম বিপাকে পড়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন।
স্থানীয় সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, ঘটনার সূত্রপাত হয় প্রায় এক সপ্তাহ আগে। সে সময় এক নারীসহ চার থেকে পাঁচজন অপরিচিত ব্যক্তি নিজেদের ইসিডব্লিউ নামক একটি প্রখ্যাত এনজিও বা সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও মাঠকর্মী হিসেবে পরিচয় দিয়ে সদরপুর উপজেলার ঢেউখালী ইউনিয়নের চর কুমারিয়া এলাকার সৌদি প্রবাসী শিহাব বেপারীর তিনতলা বিশিষ্ট আবাসিক ভবনের নিচতলাটি মাসিক ভাড়ায় নেওয়ার জন্য চুক্তি করেন। সুচতুর এই প্রতারক চক্রটি অত্যন্ত সুকৌশলে তাদের প্রলোভনের জাল বিস্তার করে। তারা উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম ও জনপদে ঘুরে সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এবং সহজ-সরল নারীদের টার্গেট করে। কম সুদে ও সহজ শর্তে বড় অংকের ঋণ পাইয়ে দেওয়ার লোভ দেখিয়ে তারা এলাকার সহজ-সরল মানুষকে প্রলুব্ধ করে। ঋণ পাইয়ে দেওয়ার পূর্বশর্ত হিসেবে প্রতিটি গ্রাহকের কাছ থেকে সঞ্চয় বা জামানত বাবদ সর্বনিম্ন দশ হাজার থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ পঞ্চাশ হাজার টাকা পর্যন্ত নগদ অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হয়।
প্রতারক চক্রের পূর্বনির্ধারিত ঘোষণা অনুযায়ী বুধবারই ছিল গ্রাহকদের মাঝে সেই কাঙ্ক্ষিত ঋণ বিতরণের দিন। ঋণ পাওয়ার আশায় বুক বেঁধে এবং নানা জায়গা থেকে চড়া সুদে বা ধারদেনা করে টাকা জোগাড় করে সকাল সকাল ওই অফিসে হাজির হন বিভিন্ন ইউনিয়নের অসংখ্য গ্রাহক। কিন্তু অফিসে পৌঁছে তারা দেখতে পান মূল দরজায় বড় তালা ঝুলছে। উপস্থিত গ্রাহকরা প্রথমে বিষয়টি স্বাভাবিক মনে করে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলেও দীর্ঘক্ষণ পেরিয়ে যাওয়ার পরও কোনো কর্মকর্তার দেখা মেলেনি। এরপর সন্দেহ হলে তারা ওই তথাকথিত কর্মকর্তাদের ব্যবহৃত মোবাইল ফোন নম্বরগুলোতে যোগাযোগের চেষ্টা করেন, কিন্তু প্রতিটি নম্বরই বন্ধ পাওয়া যায়। একে একে সব কটি নম্বর বন্ধ থাকায় এবং অফিসের আশপাশে কাউকে খুঁজে না পেয়ে ভুক্তভোগী গ্রাহকদের বুঝতে বাকি থাকে না যে তারা ভয়াবহ এক প্রতারণার শিকার হয়েছেন। পরে শত আক্ষেপ ও কান্না নিয়ে প্রতারিত মানুষেরা দল বেঁধে সদরপুর থানায় উপস্থিত হয়ে সংঘবদ্ধ এই চক্রের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন।
ঘটনাস্থলে সরেজমিন অনুসন্ধানে গিয়ে দেখা যায়, তালাবদ্ধ সেই অফিসের সামনে উপজেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছুটে আসা প্রায় পনেরো থেকে ষোলো জন নারী-পুরুষ উৎকণ্ঠিত ও বিপর্যস্ত অবস্থায় দাঁড়িয়ে রয়েছেন। তাঁদের চোখে-মুখে কেবলই সর্বস্ব হারানোর বেদনা। প্রতারণার শিকার ঢেউখালী ইউনিয়নের দুর্জয় খার ডাঙ্গী গ্রামের বাসিন্দা জোসনা বেগম গণমাধ্যমকে জানান যে, তিনি চক্রের লোকজনকে বিশ্বাস করে নগদ পঞ্চাশ হাজার টাকা সঞ্চয় হিসেবে জমা দিয়েছিলেন। বুধবার তাঁকে চুক্তি অনুযায়ী পাঁচ লাখ টাকা ঋণ দেওয়ার কথা ছিল। সেই কাঙ্ক্ষিত টাকা পাওয়ার আশায় এবং নানা জনের কাছ থেকে ধারকর্জ করে তিনি এই সঞ্চয়ের টাকা জোগাড় করেছিলেন। এখন সর্বস্ব হারিয়ে তিনি চরম অসহায় অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন। একই রকম করুণ চিত্র তুলে ধরে ভাষণচর ইউনিয়নের হাওলাদার ডাঙ্গী গ্রামের সাহিনুর বেগম জানান, তিনিও সরল বিশ্বাসে পনেরো হাজার টাকা জমা দিয়েছিলেন। ঋণ দেওয়ার নাম করে তাঁদের কাছ থেকে কষ্টার্জিত টাকাগুলো কেড়ে নিয়ে প্রতারকরা এখন উধাও হয়ে গেছে। দশ হাজার গ্রামের মরিয়ম বেগম নামের আরেক নারী জানান যে, তিনি তো দীর্ঘমেয়াদি লাভের আশায় বা প্রয়োজনের তাগিদে বা দশ লাখ টাকা ঋণের আশায় একান্ন হাজার টাকারও বেশি নগদ অর্থ তুলে দিয়েছিলেন প্রতারকদের হাতে। কিন্তু ঋণের টাকা তো দূরে থাক, উল্টো নিজের জমানো মূলধনটুকু হারিয়ে এখন তিনি পথে বসেছেন।
এদিকে ভবনটির মালিক সৌদি প্রবাসী শিহাব বেপারীর স্ত্রীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রতারক চক্রটি অত্যন্ত চতুর প্রকৃতির ছিল। প্রায় এক সপ্তাহ আগে এক নারীসহ পাঁচজন ব্যক্তি নিজেদের এনজিওর প্রতিনিধি পরিচয় দিয়ে ওই ভবনের নিচতলা ভাড়া নেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করে। বাড়িভাড়া দেওয়ার বিষয়ে সম্মতি প্রকাশ করে শিহাবের স্ত্রী তাদের কাছে জাতীয় পরিচয়পত্রসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় দাপ্তরিক কাগজপত্র দেখতে চান। তখন ওই প্রতারকরা কৌশলে সময়ক্ষেপণ করে বলে যে, আগামী শুক্রবার রাজধানী ঢাকা থেকে তাদের মূল প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্তাব্যক্তিরা আসবেন এবং আনুষ্ঠানিকভাবে অফিস উদ্বোধন করবেন। সেই উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের দিনই তারা সমস্ত আইনি কাগজপত্র এবং অগ্রিম ভাড়ার পুরো টাকা বুঝিয়ে দেবেন বলে আশ্বস্ত করেছিল। কিন্তু তাদের কথায় বিশ্বাস করে কোনো ধরনের কড়াকড়ি না করায় সুযোগ বুঝে তারা পাকাপোক্তভাবে প্রতারণা সম্পন্ন করে রাতের আঁধারে বা সুকৌশলে অফিসে তালা ঝুলিয়ে পালিয়ে যায়। বাড়িওয়ালা ও স্থানীয়রা ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পারেননি যে ভালো মানুষ সেজে আসা এই ব্যক্তিগুলো আদতে একটি সংঘবদ্ধ ও ধুর্ত অপরাধী চক্র।
ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর থেকে পুরো এলাকায় তীব্র চাঞ্চল্য ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। সাধারণ মানুষের সরলতার সুযোগ নিয়ে এ ধরনের ভুয়া প্রতিষ্ঠান কীভাবে নির্বিঘ্নে তৎপরতা চালায়, তা নিয়েও নানা প্রশ্ন উঠছে। এ বিষয়ে সদরপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল আল মামুন শাহ্ গণমাধ্যমকে জানান যে, এই চাঞ্চল্যকর প্রতারণার ঘটনায় ইতিমধ্যেই ভুক্তভোগী গ্রাহকদের পক্ষ থেকে থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। পুলিশ অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে পুরো বিষয়টি খতিয়ে দেখছে এবং তদন্ত কার্যক্রম শুরু হয়েছে। প্রতারণার সঙ্গে জড়িত মূল অপরাধীদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে পুলিশি অভিযান অব্যাহত রয়েছে বলেও তিনি জানান। প্রাথমিক তদন্ত শেষে খুব শীঘ্রই আইনি পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে অপরাধীদের মুখোশ উন্মোচন করা হবে বলে আশা প্রকাশ করছেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা।


