প্রকাশ: ১২ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
গ্রীষ্মের তীব্র দাবদাহ এবং বৈরী আবহাওয়ার কারণে দেশজুড়ে চলমান তীব্র বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের মধ্যেই সাধারণ মানুষের জন্য কিছুটা স্বস্তির বার্তা দিয়েছে সরকার। বঙ্গোপসাগরের অস্বাভাবিক উত্তাল অবস্থার কারণে এলএনজি সরবরাহ ও কার্গো খালাসে যে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছিল, তা কাটিয়ে উঠতে সর্বাত্মক চেষ্টা চলছে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। বুধবার সচিবালয়ে গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, উদ্ভূত সংকট মোকাবিলায় গৃহীত বিশেষ কৌশলের ফলে আজ সন্ধ্যা থেকেই দেশের বিদ্যুৎ পরিস্থিতি কিছুটা হলেও উন্নত হতে শুরু করবে। দেশবাসীর দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ভোগান্তি ও কষ্টের কথা সম্পূর্ণ স্বীকার করে প্রতিমন্ত্রী বারবার সাধারণ মানুষের কাছে দুঃখ প্রকাশ করেছেন এবং পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে সরকারের নিরলস প্রচেষ্টার কথা তুলে ধরেছেন।
সাম্প্রতিক বিদ্যুৎ সংকটের মূল কারণ ব্যাখ্যা করে প্রতিমন্ত্রী জানান যে, বঙ্গোপসাগর এখন অত্যন্ত উত্তাল অবস্থায় রয়েছে, যার ফলে গভীর সমুদ্রে অবস্থিত সামিটের ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে যথাসময়ে কার্গো থেকে গ্যাস খালাস করা সম্পূর্ণ অসম্ভব হয়ে পড়েছে। বর্তমানে এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালটি কেবল তার আংশিক সক্ষমতা নিয়ে চালু রাখা সম্ভব হচ্ছে। তবে এই টার্মিনালটিকে যদি আবার শতভাগ পূর্ণ সক্ষমতায় সচল করতে হয়, তবে তা প্রায় বাহাত্তর ঘণ্টার জন্য সম্পূর্ণ বন্ধ রাখতে হবে, যা সরকারের জন্য বর্তমান মুহূর্তে একটি অত্যন্ত বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ। এই সংকট নিরসনের লক্ষ্যে এক্সিলারেট এনার্জি কর্তৃপক্ষের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে দফায় দফায় আলোচনা চলছে এবং আজকেও তাদের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক নির্ধারিত রয়েছে। কোন নির্দিষ্ট সময়ে বা রাতে টার্মিনালটি সাময়িক বন্ধ রাখলে সাধারণ জনগণের দুর্ভোগ সর্বনিম্ন পর্যায়ে রাখা সম্ভব হবে, সেই বিষয়ে খুব দ্রুত একটি সুনির্দিষ্ট ও কৌশলগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে তিনি জানান। একই সঙ্গে দেশের শিল্পোৎপাদন ও ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ অক্ষুণ্ণ রাখতে ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গেও নিয়মিত আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে মন্ত্রণালয়।
সাধারণ মানুষের চরম দুর্ভোগের কথা অকপটে স্বীকার করে প্রতিমন্ত্রী বলেন যে, জনগণের যে সীমাহীন কষ্ট হচ্ছে, তা নিয়ে সরকারের নীতিনির্ধারক মহলে কোনো দ্বিমত নেই। প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও প্রতিকূল আবহাওয়ার কাছে মানুষের হাত যে অনেক সময় বশে থাকে না, সেকথা উল্লেখ করে তিনি বলেন যে, প্রকৃতির এই রুদ্ররোষের কাছে মাঝেমধ্যে অসহায় আত্মসমর্পণ করতে হয়। তবে হাত গুটিয়ে বসে না থেকে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার অপেক্ষায় থেকে যত দ্রুত সম্ভব গ্যাস খালাস সম্পন্ন করার চেষ্টা চলছে, যা নিশ্চিত হলে দেশের বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা দ্রুত স্বাভাবিক ধারায় ফিরে আসবে। বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর নিরবচ্ছিন্ন উৎপাদন বজায় রাখতে গ্যাসের পর্যাপ্ত সরবরাহ অত্যন্ত জরুরি। পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে বিদ্যুৎ উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়, যার প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ে সাধারণ গ্রাহকদের ওপর। এই বাস্তবতাকে সামনে রেখেই সরকার একটি নতুন ও কার্যকর কৌশল গ্রহণ করেছে, যা গত সন্ধ্যা থেকেই মাঠপর্যায়ে কার্যকর করা হয়েছে। এই বিশেষ কৌশলগত পদক্ষেপে সুফল মিলবে এবং আজ সন্ধ্যা থেকে দেশবাসীকে লোডশেডিংয়ের যন্ত্রণা থেকে কিছুটা হলেও স্বস্তি দেওয়া সম্ভব হবে বলে তিনি দৃঢ় আশা প্রকাশ করেন।
সংকট উত্তরণে কেবল তাৎক্ষণিক পদক্ষেপই নয়, বরং মধ্যমেয়াদি ও টেকসই সমাধানের বিভিন্ন দিক নিয়েও কাজ করছে বর্তমান মন্ত্রণালয়। এই প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে মালয়েশিয়া সরকারের সঙ্গে ইতিমধ্যেই উচ্চপর্যায়ের আনুষ্ঠানিক বৈঠক সম্পন্ন হয়েছে এবং জ্বালানি খাতের একটি বিশেষজ্ঞ দল দেশটিতে সফরও করেছে। মালয়েশিয়ার পক্ষ থেকে পাওয়া বিভিন্ন প্রস্তাব ও অফার নিয়ে বর্তমানে চুলচেরা বিশ্লেষণ চলছে। আশা করা যাচ্ছে যে, এই কূটনৈতিক প্রচেষ্টার ফলস্বরূপ খুব শীঘ্রই মালয়েশিয়ার কাছ থেকে অন্তত এক কার্গো অতিরিক্ত এলএনজি আমদানির ব্যবস্থা করা সম্ভব হবে, যা দেশের বর্তমান জ্বালানি সংকটের একটি কার্যকর মধ্যমেয়াদি সমাধান হিসেবে কাজ করবে। এ ছাড়াও হাতে থাকা অন্যান্য সমস্ত বিকল্প ও সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত রেখে অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছে জ্বালানি বিভাগ। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের সুবাদে ইউএস-বাংলাদেশ বিজনেস কাউন্সিলের কাছেও এলএনজি সরবরাহ ও কারিগরি সহায়তার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ জানানো হয়েছে।
বিগত সরকারগুলোর ভুল ও अदূরদর্শী নীতির কঠোর সমালোচনা করে প্রতিমন্ত্রী বলেন যে, অতীতে যারা ক্ষমতায় ছিল তারা কখনোই বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের টেকসই, দীর্ঘমেয়াদি বা স্থায়ী কোনো সমাধান খুঁজে বের করার চেষ্টা করেনি। তারা সবসময়ই ভোটের রাজনীতি বা সাময়িক লোকদেখানোর জন্য তাৎক্ষণিক বা শর্টকাট সমাধানের পথে হেঁটেছে। ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে কোনো বৃহত্তর পরিকল্পনা বা স্থায়ী অবকাঠামো গড়ে না তোলার কারণেই মূলত আজকের এই হঠাৎ এবং ভয়াবহ সংকটের মুখে পড়তে হয়েছে দেশকে। একটি নির্দিষ্ট সময়ে এই কাঠামোগত দুর্বলতার মুখোমুখী হতেই হতো, যা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনকভাবে বর্তমান গ্রীষ্মকালীন ও চরম তাপপ্রবাহের সময়ে এসে হাজির হয়েছে। তবে কবে নাগাদ দেশের পুরো জ্বালানি ও বিদ্যুৎ পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়ে যাবে, সেটির কোনো সুনির্দিষ্ট দিনক্ষণ বা তারিখ এখনই বেঁধে দেওয়া সম্ভব নয় বলে তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন।
জনদুর্ভোগকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে বর্তমান সরকার যে প্রাণান্তকর ও আন্তরিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, তা দেশের সচেতন নাগরিকরা নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন বলে তিনি বিশ্বাস করেন। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে সরকারের তরফ থেকে চেষ্টার ন্যূনতম কোনো ত্রুটি নেই এবং আগামীতেও পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে না আসা পর্যন্ত এই লড়াই অব্যাহত থাকবে। প্রচণ্ড গরমে কষ্ট পাওয়া সাধারণ মানুষের ধৈর্য ও সহনশীলতার প্রশংসা করে প্রতিমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন যে, খুব শীঘ্রই এই প্রাকৃতিক ও ব্যবস্থাপনাগত বৈরিতা কাটিয়ে দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত একটি স্থায়ী ও স্বস্তিদায়ক অবস্থানে ফিরে আসবে।


