প্রকাশ: ১২ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বিশ্ব অর্থনীতির পরিবর্তিত গতিপ্রকৃতি এবং ক্রমবর্ধমান চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশের রপ্তানি বাণিজ্যকে নতুন এক উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার এক অপার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে এতদিন ধরে পোশাক খাতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা থাকলেও এবার দেশের অর্থনীতিকে বৈচিত্র্যময় করে তুলতে এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন হতে যাচ্ছে। বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের জীবনযাত্রার মান এবং খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তনে বিশ্বজুড়ে হালাল পণ্যের বাজার এখন দিন দিন অপ্রতিরোধ্য গতিতে সম্প্রসারিত হচ্ছে। এই ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক হালাল বাজারের একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ও গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হয়ে ওঠার বিরাট সুযোগ রয়েছে বাংলাদেশের সামনে। আর এই লক্ষ্যে পৌঁছাতে আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর দীর্ঘদিনের সফল অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগানোর ওপর বিশেষ জোর দিয়েছেন দেশের নীতিনির্ধারকরা।
সম্প্রতি রাজধানীর বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের (বিআইআইএসএস) মিলনায়তনে আয়োজিত এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সেমিনারে এই সম্ভাবনার কথা জোরালোভাবে তুলে ধরা হয়। ‘আসিয়ান অঞ্চলে হালাল ইকোসিস্টেম: বাংলাদেশের জন্য সম্ভাবনা’ শীর্ষক এই সেমিনারে প্রধান অতিথির আসনে উপস্থিত থেকে দেশের বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির অত্যন্ত দূরদর্শী ও দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য দেন। তিনি তাঁর বক্তৃতায় স্পষ্টভাষায় উল্লেখ করেন যে, হালাল অর্থনীতিকে কেবল গতানুগতিক কিছু খাদ্যপণ্যের গণ্ডি বা সীমার মধ্যে আটকে না রেখে একে একটি বৃহত্তর ও বহুমুখী অর্থনৈতিক খাত হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। আসিয়ানভুক্ত বিভিন্ন দেশের দীর্ঘদিনের সমৃদ্ধ অভিজ্ঞতা ও সফল কৌশলগুলো নিখুঁতভাবে অনুধাবন করে বাংলাদেশও খুব সহজেই একটি আন্তর্জাতিক মানসম্মত ও সুসংহত হালাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সক্ষম হবে বলে তিনি দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
বাণিজ্যমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে আরও পরিষ্কার করেন যে, আধুনিক বিশ্বে হালাল অর্থনীতির পরিধি কেবল খাওয়া-দাওয়ার মাঝেই সীমাবদ্ধ নেই। এর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে গেছে ওষুধশিল্প, প্রসাধনী ও পার্সোনাল কেয়ার পণ্য, আধুনিক পোশাক খাত, বিশ্বমানের পর্যটন বা হালাল ট্যুরিজম, লজিস্টিকস ও সাপ্লাই চেইন ব্যবস্থাপনা, উন্নত প্রযুক্তি, ইসলামিক অর্থায়ন ব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক মানসম্মত সনদ বা সার্টিফিকেশন প্রক্রিয়া। এসব বিভিন্ন খাতকে কেন্দ্র করে বর্তমানে বিশ্বজুড়ে কয়েক ট্রিলিয়ন ডলারের একটি বিশাল বৈশ্বিক বাজার তৈরি হয়েছে। এই সম্ভাবনাময় বাজারের সোনালি সুযোগটি লুফে নিতে হলে বাংলাদেশকে কেবল উৎপাদন বাড়ালেই চলবে না, সেই সঙ্গে বিশ্বমানের কঠোর মানদণ্ড শতভাগ নিশ্চিত করতে হবে। প্রতিযোগিতাপূর্ণ বৈশ্বিক বাজারে নিজেদের অবস্থান সুসংহত করতে হলে দেশের ভেতরে উৎপাদন সক্ষমতা বহুগুণ বাড়ানো জরুরি, যার জন্য প্রয়োজন পর্যাপ্ত দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগ। আর এই কাঙ্ক্ষিত বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য একটি সম্পূর্ণ নিরাপদ, স্থিতিশীল এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করার ওপরও বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
স্বল্পোন্নত দেশ বা এলডিসি ক্যাটাগরি থেকে বাংলাদেশের আসন্ন উত্তরণের পর আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বিভিন্ন সুবিধা ও অগ্রাধিকার টিকিয়ে রাখার চ্যালেঞ্জের কথাও সেমিনারে গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনায় উঠে আসে। বাণিজ্যমন্ত্রী এ প্রসঙ্গে জানান যে, বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের শুল্কমুক্ত বা অগ্রাধিকারমূলক প্রবেশাধিকার অটুট রাখতে বর্তমান সরকার অত্যন্ত তৎপর রয়েছে। এই লক্ষ্য অর্জনের অংশ হিসেবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি, অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তি এবং অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি স্বাক্ষরের বহুমুখী উদ্যোগ চলমান রয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক হালাল পণ্যের বাজারে সফলভাবে প্রবেশ করতে হলে سب থেকে বড় শর্ত হলো একটি স্বাধীন, নিরপেক্ষ, নির্ভরযোগ্য এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত দেশীয় হালাল সনদ ব্যবস্থা গড়ে তোলা। দেশে এ ধরনের একটি বিশ্বমানের সার্টিফিকেশন বডি থাকলে বিদেশি ক্রেতাদের মনে বাংলাদেশের হালাল পণ্যের গুণগত মান ও স্বচ্ছতা নিয়ে কোনো সন্দেহের অবকাশ থাকবে না, যা নতুন নতুন রপ্তানি বাজার জয়ের পথকে অত্যন্ত সুগম করবে।
সেমিনারে আমন্ত্রিত বিশিষ্ট বক্তা ও গবেষকরা তাঁদের আলোচনায় দেশের রপ্তানি খাতের দীর্ঘমেয়াদি স্থবিরতা ও একক খাতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার কথা স্মরণ করিয়ে দেন। তাঁরা বলেন যে, গত কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশের বৈদেশিক আয়ের মূল ভিত্তি তৈরি পোশাক খাত হলেও ভবিষ্যতে তীব্র বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে রপ্তানি পণ্য এবং বাজার—উভয় ক্ষেত্রেই বৈচিত্র্য আনা অপরিহার্য। এই পরিবর্তনের যাত্রায় হালাল অর্থনীতি বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে সম্ভাবনাময় ও নতুন দিগন্ত উন্মোচনকারী ক্ষেত্র হতে পারে। সারা বিশ্বে যেভাবে হালাল জীবনযাপন ও পণ্যের চাহিদা বৃদ্ধি পাচ্ছে, তাতে খাদ্যপণ্য থেকে শুরু করে প্রসাধন, ওষুধ ও পোশাকের বাজারে নিজেদের শক্ত অবস্থান তৈরি করা সময়ের দাবি। তবে এই বাজারে টেকসই ও দীর্ঘমেয়াদিভাবে টিকে থাকতে হলে কাঁচামাল সংগ্রহ থেকে শুরু করে চূড়ান্ত উৎপাদন, মান নিয়ন্ত্রণ, ল্যাবরেটরি পরীক্ষা এবং সনদ প্রদানের পুরো প্রক্রিয়াটিকে একটি সুসংহত ব্যবস্থার আওতায় আনতে হবে।
আলোচনায় মালয়েশিয়ার হালাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনাকে বাংলাদেশের জন্য একটি অনুকরণীয় ও সফল মডেল হিসেবে সামনে নিয়ে আসা হয়। বক্তারা উল্লেখ করেন যে, মালয়েশিয়া হালালকে কেবল ধর্মীয় আচারভিত্তিক নির্দিষ্ট কিছু পণ্যের পরিসরে সীমিত না রেখে একে গবেষণা, উৎপাদন, আধুনিক বিপণন এবং আন্তর্জাতিক রপ্তানির সঙ্গে যুক্ত একটি পূর্ণাঙ্গ ও লাভজনক অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় রূপান্তর করেছে। বাংলাদেশের জন্যও এই মডেলটি অনুসরণ করার সুবৰ্ণ সুযোগ রয়েছে। দেশের বিশাল অভ্যন্তরীণ বাজার সুবিধার পাশাপাশি শক্তিশালী কৃষি খাত, উদীয়মান খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প, ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান, চামড়া শিল্প এবং ঐতিহ্যবাহী পোশাক খাতের বিশাল সক্ষমতা আমাদের রয়েছে। এই সমস্ত প্রতিষ্ঠিত খাতগুলোকে যদি আন্তর্জাতিক হালাল মানদণ্ডের সঙ্গে সফলভাবে সম্পৃক্ত করা যায়, তবে বাংলাদেশ অতি দ্রুত বিশ্বমানের হালাল সরবরাহ শৃঙ্খলের একটি অপরিহার্য ও গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠতে পারবে।
বাংলাদেশের হালাল খাতকে বিশ্বমানের করে গড়ে তুলতে সেমিনারে বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট ও অত্যন্ত সময়োপযোগী অগ্রাধিকার নির্ধারণের প্রস্তাব দেওয়া হয়। এর মধ্যে অন্যতম হলো একটি আন্তর্জাতিকভাবে সর্বজনগ্রাহ্য জাতীয় হালাল নিশ্চয়তা কাঠামো বা ফ্রেমওয়ার্ক প্রণয়ন করা, আধুনিক ল্যাবরেটরি পরীক্ষা ও উন্নত কোল্ড চেইন বা পরিবহন সুবিধা সংবলিত বিশেষায়িত হালাল শিল্পাঞ্চল স্থাপন করা, বিদ্যমান উৎপাদন শিল্পগুলোকে বৈশ্বিক মানে উন্নীত করা এবং দেশের তরুণ উদ্যোক্তা, গবেষক ও ছোট-বড় মাঝারি উদ্যোক্তাদের এই সম্ভাবনাময় কার্যক্রমে সম্পৃক্ত করা। এ ছাড়াও সঠিক অর্থনৈতিক কূটনীতির মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাজারে ‘বাংলাদেশ হালাল’ ব্র্যান্ডকে একটি বিশ্বস্ত ও মানসম্মত প্রতীক হিসেবে পরিচিত করে তোলার ওপরও বিশেষ জোর দেওয়া হয়।
অনুষ্ঠানের শুরুতে স্বাগত বক্তব্য প্রদান করেন বিআইআইএসএসের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল এ এস এম রেদওয়ানুর রহমান এবং মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন প্রতিষ্ঠানটির সম্মানিত গবেষণা পরিচালক ড. মাহফুজ কবীর। এ ছাড়া প্যানেল আলোচনায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মতামত ও পরামর্শ তুলে ধরেন ইসলামিক ফাউন্ডেশনের হালাল সনদ বিভাগের উপপরিচালক আকতার হোসেন এবং বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশনের (বিএসটিআই) হালাল সনদের উপপরিচালক এস এম আবু সাঈদ। পরিশেষে বক্তারা একমত পোষণ করেন যে, কেবল ধর্মীয় অনুশাসন অনুসরণের পাশাপাশি পণ্যের সর্বোচ্চ মান, শতভাগ নিরাপত্তা, বাণিজ্যিক স্বচ্ছতা এবং আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করতে পারলে হালাল অর্থনীতি অচিরেই বাংলাদেশের রপ্তানি খাতের সবচেয়ে শক্তিশাল ভিত্তিমূল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে। এর জন্য প্রয়োজন সরকারি নীতিমালার জোরালো সহায়তা, বেসরকারি খাতের স্বতঃস্ফূর্ত বিনিয়োগ, উচ্চতর গবেষণা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার এক অপূর্ব সমন্বয়।


