প্রকাশ: ১০ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে কূটনীতি, গোয়েন্দা তৎপরতা এবং পারস্পরিক সম্পর্কের সমীকরণ সবসময়ই অত্যন্ত জটিল ও পরিবর্তনশীল এক প্রবাহের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হয়ে থাকে। বিশেষ করে বাংলাদেশ এবং ভারতের মতো দুটি নিকটতম প্রতিবেশী রাষ্ট্রের মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের প্রতিটি মোড়েই রয়েছে নানা কৌশলগত গভীরতা, ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট এবং ভূ-রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ। সাম্প্রতিক সময়ে দুই দেশের মধ্যকার দীর্ঘদিনের জমে থাকা ভুল বোঝাবুঝি, দূরত্ব এবং সম্পর্কের বরফ গলাতে বিভিন্ন কূটনৈতিক চ্যানেলে নানা ধরনের ইতিবাচক উদ্যোগ ও প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। ঠিক এমন একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল, কৌতূহলে ভরা এবং গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সন্ধিক্ষণে অত্যন্ত আকস্মিক ও গোপনীয় এক সরকারি সফরে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় এসে পৌঁছেছেন ভারতের অন্যতম প্রধান ও প্রভাবশালী বৈদেশিক গোয়েন্দা সংস্থা রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস উইং বা জনপ্রিয় সংক্ষেপে ‘র’-এর সর্বময় কর্তা পরাগ জৈন। তাঁর এই অপ্রত্যাশিত ও আকস্মিক ঢাকা সফর দুই দেশের নীতিনির্ধারণী মহলে এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে এক বিরাট আলোড়ন ও আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
সরকারের অত্যন্ত দায়িত্বশীল এবং নির্ভরযোগ্য একটি বিশেষ সূত্র বিশ্বস্ত গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছে যে, বাংলাদেশ সরকারের সংশ্লিষ্ট উচ্চপর্যায়ের কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক ও আন্তরিক আমন্ত্রণের প্রেক্ষিতেই পরাগ জৈন এই বিশেষ সফরে ঢাকায় আগমন করেছেন। অত্যন্ত গোপনীয়তা বজায় রেখে পরিচালিত এই সরকারি সফরে তিনি কেবল একা আসেননি, বরং তাঁর সঙ্গে চার সদস্যের অত্যন্ত শক্তিশালী ও উচ্চপর্যায়ের একটি বিশেষ প্রতিনিধি দল এই সফরে অংশ নিয়েছে। তবে কূটনৈতিক মহলের জন্য অত্যন্ত বিস্ময়কর হলেও সত্যি যে, দুই দেশের পক্ষ থেকেই অত্যন্ত সুকৌশলে এই উচ্চপর্যায়ীয় ভারতীয় প্রতিনিধি দলের বর্তমান ঢাকা সফরের বিষয়ে এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো ধরনের প্রেস বিজ্ঞপ্তি বা বিস্তারিত তথ্য গণমাধ্যমের সামনে প্রকাশ করা হয়নি। এই ধরনের উচ্চপর্যায়ের গোয়েন্দা প্রধানের সফর সাধারণত পর্দার আড়ালের কূটনীতি ও গোপন কৌশলগত আলোচনার মাধ্যমেই পরিচালিত হয়ে থাকে, যার মূল লক্ষ্য থাকে দুই দেশের স্পর্শকাতর বিষয়গুলোর সুরাহা করা।
ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থায় অত্যন্ত প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব পরাগ জৈন বর্তমানে ভারতের বৈদেশিক গোয়েন্দা সংস্থা রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস উইং বা ‘র’-এর প্রধান বা সেক্রেটারি হিসেবে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে অত্যন্ত গুরুদায়িত্ব পালন করে চলেছেন। এর পাশাপাশি তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রীসহ ভিভিআইপি বা অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত অতি সংবেদনশীল সংস্থা স্পেশাল প্রোটেকশন গ্রুপ বা এসপিজির স্পেশাল সেক্রেটারির মতো অতি গুরুত্বপূর্ণ পদের অতিরিক্ত দায়িত্বও অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে সামলাচ্ছেন। তাঁর এই দ্বৈত ও অত্যন্ত শক্তিশালী অবস্থান প্রমাণ করে যে, দিল্লির নিরাপত্তা ও নীতিনির্ধারণী কাঠামোর ভেতরে তাঁর প্রভাব কতখানি সুদূরপ্রসারী। এমন একজন ভিভিআইপি ও শীর্ষস্থানীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তার বাংলাদেশ সফর স্বাভাবিকভাবেই দুই দেশের মধ্যকার নিরাপত্তা সহযোগিতা, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় এবং পারস্পরিক আস্থার ঘাটতি দূর করার ক্ষেত্রে এক নতুন মাত্রা যোগ করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ভারতের এই শীর্ষ গোয়েন্দা কর্মকর্তার অত্যন্ত গোপনীয় ও গুরুত্বপূর্ণ ঢাকা সফরে তাঁর সফরসঙ্গী হিসেবে অত্যন্ত অভিজ্ঞ ও পেশাদার আরও তিন জন শীর্ষ কর্মকর্তা উপস্থিত রয়েছেন। সরকারি ওই সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, পরাগ জৈনের সফরসঙ্গী হিসেবে ঢাকায় এসেছেন অশ্বীন মুকুন্দ কোটনিস, রাহুল নেগি এবং শৈবাল রায় চৌধুরী নামক তিন জন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। অত্যন্ত গোপনীয়তা বজায় রেখে তাঁরা ভারতের জাতীয় পতাকাবাহী বিমান সংস্থা এয়ার ইন্ডিয়ার একটি নিয়মিত ফ্লাইটে গত রোববার দুপুরে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করেন। বিমানবন্দর থেকে অত্যন্ত কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে তাঁদের সরাসরি রাজধানী ঢাকার গুলশান বা সংলগ্ন এলাকার একটি অত্যন্ত সুরক্ষিত ও নামকরা বিলাসবহুল হোটেলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এই ঢাকা সফরকালে তাঁরা ওই হোটেলেই অবস্থান করছেন এবং বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারক ও গোয়েন্দা প্রধানদের সঙ্গে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও রুদ্ধদ্বার বৈঠকে মিলিত হচ্ছেন বলে জানা গেছে।
সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর বিষয় হলো, বাংলাদেশের পবিত্র মাটিতে পা রাখার ঠিক পূর্বমুহূর্তে পরাগ জৈন অন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এশীয় পরাশক্তি দেশ অর্থাৎ চীন সফর সম্পন্ন করে সরাসরি ঢাকা এসে পৌঁছেছেন। বর্তমান বিশ্ব রাজনীতিতে চীন ও ভারতের মধ্যকার ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার বিষয়টি অত্যন্ত ওপেন সিক্রেট। এমন একটি বাস্তবতায় চীনের মাটিতে গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক বা কৌশলগত আলোচনা শেষে ভারতের প্রধান গোয়েন্দা সংস্থার প্রধানের এই বাংলাদেশ সফর দক্ষিণ এশিয়ার সামগ্রিক ভূ-রাজনীতিতে এক বিশেষ ও সুদূরপ্রসারী তাৎপর্য বহন করে। বাংলাদেশ এবং ভারতের মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে যে ধরনের টানাপোড়েন বা শীতলতা বিগত দিনে লক্ষ্য করা গেছে, তা কাটিয়ে দুই দেশের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে এই ত্রিমুখী যোগাযোগের বিশেষ কোনো বার্তা থাকতে পারে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও ভূ-রাজনীতির বিশ্লেষকরা।
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার বর্তমান সম্পর্ক উন্নয়নের এই জটিল প্রক্রিয়ায় গোয়েন্দা প্রধানের এই সফর অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। দুই দেশের সীমান্তবর্তী এলাকার নিরাপত্তা রক্ষা, উগ্রবাদ দমন, আন্তঃসীমান্ত অপরাধ রোধ এবং গোয়েন্দা তথ্যের আদান-প্রদান জোরদার করার মতো বিষয়গুলো এই উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে প্রধান এজেন্ডা হিসেবে স্থান পেয়েছে বলে প্রবল ধারণা করা হচ্ছে। দীর্ঘদিনের বিভিন্ন রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর দুই দেশের সম্পর্ককে নতুন একটি বাস্তবসম্মত ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের ভিত্ত It’s উপর দাঁড় করানোর যে চেষ্টা বর্তমানে চলছে, পরাগ জৈনের এই গোপন সফর তারই একটি অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। দুই দেশের সাধারণ মানুষের মঙ্গল এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার স্বার্থে পর্দার অন্তরালে চলা এই ধরনের উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক ও গোয়েন্দা আলোচনা শেষ পর্যন্ত কী ধরনের ইতিবাচক ফলাফল বয়ে আনে, সেদিকেই এখন তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রয়েছে পুরো রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক মহলের।


