প্রকাশ: ০৫ জুন ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের নির্বাচিত হওয়াটা ছিল বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের এক অনন্য কূটনৈতিক সাফল্য। দীর্ঘ ১০ বছরের অপেক্ষার পর এই গৌরবময় বিজয় অর্জিত হয়েছে, যা দেশের জন্য বয়ে এনেছে সম্মান ও মর্যাদা। কিন্তু এই খুশির জোয়ারের মধ্যেই প্রশ্ন উঠেছিল—পররাষ্ট্রমন্ত্রী কি তার বর্তমান দায়িত্ব পালন করবেন, নাকি জাতিসংঘের এই বৈশ্বিক গুরুদায়িত্ব সামলাতে দীর্ঘ ছুটি নেবেন? নির্বাচন-পূর্ববর্তী সময়ে যে গুঞ্জন শোনা গিয়েছিল, দেশে ফিরে বৃহস্পতিবার বিকেলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কণ্ঠে শোনা গেল সম্পূর্ণ অন্য সুর। তিনি এখন দুই দায়িত্ব একসঙ্গে পালনের ইঙ্গিত দিচ্ছেন, যা দেশের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক মহলে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
জাতিসংঘের এই বিজয়ের পর বৃহস্পতিবার সকালে নিউ ইয়র্ক থেকে ঢাকায় ফিরে আসেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে তাকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানানো হয়। এই জয়কে তিনি ব্যক্তিগত অর্জন না বলে দেশের ও প্রধানমন্ত্রীর দূরদর্শী নেতৃত্বের ফসল হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর অবিচল সমর্থন ও বিরোধহীন সিদ্ধান্ত না থাকলে ১০ বছরের এই দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়া এত অল্প সময়ে সম্ভব হতো না। মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা ও কূটনৈতিক মিশনের সদস্যদের টিম স্পিরিটকে সাধুবাদ জানিয়ে তিনি এই সাফল্য বাংলাদেশের ভবিষ্যতের কাছে উৎসর্গ করেন। কিন্তু আনন্দের এই আবহে যখনই সাংবাদিকেরা তার ছুটি নেওয়া বা পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন, তখনই মন্ত্রী কিছুটা বিরক্ত ও কিছুটা কৌতুহলী প্রতিক্রিয়া দেখান।
ছুটির বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে তিনি সরাসরি কোনো ঘোষণা না দিয়ে উল্টো প্রশ্ন ছুড়ে দেন যে, সবাই এত ব্যস্ত কেন হচ্ছে? তিনি বলেন, দায়িত্ব পালন ও ছুটি নেওয়া—এই বিষয়টি নিয়ে জল ঘোলা করার কিছু নেই। অতীতের নজির টেনে তিনি বলেন, আজ থেকে প্রায় চার দশক আগে তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী যখন জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন, তিনিও একই সঙ্গে দুই দায়িত্ব পালন করেছিলেন। মন্ত্রীর দাবি, সে সময় প্রযুক্তির এত সহজলভ্যতা ছিল না, তখন ইন্টারনেটের যুগ ছিল না, তবুও তিনি সফলভাবে দুই কাজ চালিয়েছিলেন। আর বর্তমান ডিজিটাল যুগে নিরবচ্ছিন্নভাবে দুই গুরুত্বপূর্ণ পদ সামলানো এখনকার সময়ে খুব স্বাভাবিক একটি বিষয়।
মন্ত্রীর এই বক্তব্যের পেছনে রয়েছে একধরণের কূটনৈতিক কৌশল। তবে সমালোচকরা বলছেন, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে জাতিসংঘের সভাপতি হওয়া কোনো সাধারণ দায়িত্ব নয়। এটি একটি পূর্ণকালীন ও অতি গুরুত্বপূর্ণ পদ, যেখানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধান ও কূটনীতিকদের সঙ্গে সমন্বয় করতে হয়। পাশাপাশি একটি দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে তাকে নিজস্ব পররাষ্ট্রনীতির বাস্তবায়ন, দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের উন্নয়ন এবং দেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট সংকটে সরাসরি মাঠে থাকতে হয়। এই দুই দায়িত্বই সমানভাবে পালন করা কতটা বাস্তবসম্মত, তা নিয়ে কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে নানা সংশয় রয়েছে। মন্ত্রী হয়তো তার অভিজ্ঞতা ও দক্ষতার ওপর ভরসা রেখেই দুই দায়িত্ব পালনের কথা বলছেন, কিন্তু বাস্তব কাজের চাপ তার সক্ষমতাকে কতটুকু চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলবে, সেটিই এখন বড় আলোচনার বিষয়।
এ সময় তিনি জার্মান পররাষ্ট্রমন্ত্রীর উদাহরণ টেনে বিভ্রান্তি দূর করার চেষ্টা করেন। অনেকেই বলে থাকেন, জাতিসংঘের সভাপতি থাকাকালীন জার্মানির সেই পররাষ্ট্রমন্ত্রী পদত্যাগ করেছিলেন। খলিলুর রহমান ব্যাখ্যা করেন যে, ওই পররাষ্ট্রমন্ত্রী পদ ছেড়েছিলেন মূলত রাজনৈতিক কারণে, কারণ তার দল গ্রিন পার্টি নির্বাচনে পরাজিত হয়েছিল। অর্থাৎ, এটি জাতিসংঘের সভাপতির দায়িত্ব পালনের বাধ্যবাধকতার জন্য ছিল না। মন্ত্রী বোঝাতে চেয়েছেন, চাইলে দুই দায়িত্ব একসঙ্গে পালন করা আইনত বা নীতিগতভাবে অসম্ভব কিছু নয়। তবে তার এই বক্তব্যের সারমর্ম অনুযায়ী, তিনি এখন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর পদ ছেড়ে ছুটিতে যাওয়ার কোনো পরিকল্পনা করছেন না বরং দুটি চেয়ারেই সমানতালে বসতে আগ্রহী।
পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এমন অবস্থানে রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা কানাঘুষা চলছে। কেউ কেউ মনে করছেন, তিনি হয়তো দীর্ঘমেয়াদে এই দুই দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে একধরণের ভারসাম্য তৈরি করার চেষ্টা করবেন। আবার অনেকে মনে করছেন, সরকারের উচ্চপর্যায়ে হয়তো এরই মধ্যে একটি বোঝাপড়া হয়েছে যে, তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে তার দায়িত্ব থেকে আপাতত অব্যাহতি নিচ্ছেন না। কারণ বাংলাদেশ যখন বিশ্ব কূটনীতিতে এক গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে পৌঁছানোর স্বপ্ন দেখছে, তখন একজন অভিজ্ঞ পররাষ্ট্রমন্ত্রীর পরামর্শ ও নেতৃত্ব দেশের জন্য অপরিহার্য। অন্যদিকে জাতিসংঘের সভাপতি হিসেবে তার এই নতুন পথচলা বাংলাদেশের ভাবমূর্তিকে বিশ্বদরবারে আরও উঁচুতে তুলে ধরবে।
সাংবাদিকদের বারবার প্রশ্ন করাটা হয়তো তার কাছে কিছুটা অস্বস্তিকর ঠেকছে। তিনি যে ভাষায় বলেছেন, ‘ভাই, এত ব্যস্ত হইয়েন না’, তাতে পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে তিনি এখন এই বিতর্কিত ইস্যুকে বড় করে দেখতে চাইছেন না। তিনি চাইছেন কাজের মাধ্যমে প্রমাণ করতে যে, দুই দায়িত্বে সমানতালে চলা সম্ভব। তবে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও কূটনীতিবিদরা বলছেন, দিনশেষে পারফরম্যান্সই আসল কথা। বিশ্বের অনেক দেশেরই চোখ থাকবে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই কর্মপদ্ধতির ওপর। যদি তিনি দুই দায়িত্বই সফলভাবে পালন করতে পারেন, তবে তা বাংলাদেশের জন্য একটি নতুন মাইলফলক হবে। আর যদি কাজের চাপে কোনো একটি দায়িত্ব অবহেলিত হয়, তবে তা দেশের কূটনৈতিক ভাবমূর্তির জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
পরিশেষে বলা যায়, পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই নতুন সুর এক নতুন রাজনীতির ইঙ্গিত দেয়। তিনি শুধু পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে নন, বরং বিশ্বনেতা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার দৌড়ে নেমেছেন। এই লড়াইয়ে জয়ী হতে হলে তাকে সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিতে হবে এবং প্রযুক্তির সর্বোত্তম ব্যবহারের মাধ্যমে এই বিশাল কাজের চাপ সামলাতে হবে। তার সাফল্যের ওপর নির্ভর করছে বাংলাদেশের কূটনৈতিক ভবিষ্যৎ। এখন দেখার বিষয়, সময় তাকে কোন দিকে নিয়ে যায়—তিনি কি দুই দায়িত্ব একসঙ্গে সফলভাবে পালন করে ইতিহাস গড়বেন, নাকি সময়ের ব্যবধানে তাকে এক পথ বেছে নিতে হবে। এই রহস্যের সমাধান পেতে আমাদের অপেক্ষা করতে হবে আগামী দিনগুলোর জন্য। তবে আপাতত এটি স্পষ্ট যে, তিনি দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ানোর মোটেও কোনো ইঙ্গিত দিচ্ছেন না।

