প্রকাশ: ০৫ জুন ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
ইউরোপের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্র মাল্টা আজ প্রবাসী বাংলাদেশিদের কাছে একটি উজ্জ্বল সম্ভাবনার নাম। ভূমধ্যসাগরের নীল জলরাশির মাঝে অবস্থিত এই দেশটি বর্তমানে সেনজেনভুক্ত হওয়ার কারণে বাংলাদেশি তরুণদের কাছে আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। গত এপ্রিল মাসে মাল্টায় কর্মরত খায়রুল ইসলাম নামের এক প্রবাসী রেমিটেন্স যোদ্ধার সঙ্গে কথা হলে বেরিয়ে আসে এক বাস্তব চিত্র। তিনি মাত্র তিন মাস আগে বৈধ ওয়ার্ক পারমিটের মাধ্যমে মাল্টায় পা রেখেছেন। খায়রুলের ভাষ্যমতে, দেশটিতে কাজের পরিবেশ যেমন চমৎকার, তেমনি বেতন ও জীবনযাত্রার মানও সন্তোষজনক। অথচ তার এক বন্ধু একই সময়ে অবৈধভাবে ইতালি যাওয়ার জন্য লিবিয়া রুট বেছে নিয়েছিলেন। সেই বন্ধুটি আজ লিবিয়ার মাফিয়াদের হাতে বন্দি এবং মুক্তির জন্য ইতিমধ্যে ২০ লাখ টাকা খরচ করেও তিনি চরম নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। এই দুটি ভিন্ন চিত্রই প্রমাণ করে, অবৈধ পথে ভাগ্যান্বেষণের চেয়ে বৈধ পথে মাল্টায় আসা কতটুকু নিরাপদ ও লাভজনক।
মাল্টা কেবল একটি পর্যটননির্ভর দেশই নয়, বরং এটি ইউরোপের অন্যতম নিরাপদ রাষ্ট্র। মাত্র ২২ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের এই ছোট্ট দ্বীপটিতে অপরাধের হার প্রায় শূন্যের কোঠায়। সদরুল নামে আরেক প্রবাসী যুবকের মতে, বর্তমানে যারা ইউরোপের স্বপ্ন দেখছেন, তাদের জন্য মাল্টাই হতে পারে সেরা গন্তব্য। কারণ এখানে বৈধপথে কাজ করলে নাগরিক সুবিধা পাওয়ার সুযোগ রয়েছে, যা অন্য অনেক দেশে পাওয়া অসম্ভব। মাল্টার রিক্রুটমেন্ট এজেন্সিগুলোর তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে রেস্টুরেন্ট, কফিশপ, সুপারশপ এবং হোটেল খাতে বাংলাদেশি কর্মীদের প্রচুর চাহিদা রয়েছে। মাল্টা স্কিল টেস্ট পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর তিন থেকে চার মাসের মধ্যেই ওয়ার্ক পারমিট ভিসা পাওয়া সম্ভব।
মাল্টায় একজন কর্মীর বেতন শুরু হয় গড়ে ১২০০ ইউরো বা প্রায় এক লাখ ৭০ হাজার টাকা থেকে। সেখানে থাকা-খাওয়া ও ব্যক্তিগত খরচ মিটিয়ে একজন কর্মী অনায়াসে প্রতি মাসে এক লাখ টাকার ওপরে সঞ্চয় করতে পারেন। পাঁচ বছর একটানা বৈধভাবে কাজ করার পর স্থানীয় ভাষা শিখে সেখানে নাগরিকত্ব বা পাসপোর্ট পাওয়ার সুযোগ রয়েছে, যা ইউরোপের অন্য কোনো দেশে এত দ্রুত পাওয়া যায় না। অথচ দুঃখজনক হলেও সত্য যে, অনেক বাংলাদেশি মাল্টাকে কেবল একটি ট্রানজিট পয়েন্ট হিসেবে ব্যবহার করে। তারা মাল্টার ভিসা পাওয়ার পর ইউরোপের অন্য দেশে অবৈধভাবে চলে যাওয়ার প্রবণতা দেখায়। এই অবৈধ প্রবণতাই আজ মাল্টার শ্রমবাজারে বাংলাদেশি কর্মীদের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করছে।
ফাস্ট কনসালটেন্সি লিমিটেড নামের একটি বৈধ রিক্রুটমেন্ট এজেন্সির পরিচালক রাসেল বিভান বলেন, বাংলাদেশিদের জন্য মাল্টায় অপার সুযোগ রয়েছে, কিন্তু এই সুযোগ হাতছাড়া হচ্ছে সচেতনতার অভাবে। তিনি সতর্ক করে বলেন, অবৈধভাবে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ইউরোপে যাওয়ার চেয়ে মাল্টায় বৈধভাবে কাজ করা অনেক বেশি সম্মানজনক ও লাভজনক। মাল্টা সরকার বর্তমানে বাংলাদেশিদের কাজের সুযোগ দিচ্ছে, কিন্তু যদি কর্মীরা সেই বিশ্বাসভঙ্গ করে অন্য দেশে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা অব্যাহত রাখে, তবে অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশিদের জন্য মাল্টার শ্রমবাজার বন্ধ হয়ে যেতে পারে। একটি ভালো রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে গেলে প্রতারণার শিকার হওয়ার কোনো অবকাশ থাকে না, অথচ দালালদের খপ্পরে পড়ে মানুষ নিজের ভিটেমাটি হারিয়ে জীবন উৎসর্গ করছে।
মাল্টায় বাংলাদেশিদের এই নেতিবাচক ভাবমূর্তি দূর করতে প্রয়োজন ব্যাপক সচেতনতা। দালালদের চটকদার কথায় ভুলে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে লিবিয়া বা অন্য কোনো ঝুঁকিপূর্ণ পথে না গিয়ে বৈধ রিক্রুটমেন্ট এজেন্সির শরণাপন্ন হওয়া জরুরি। মাল্টায় কাজের জন্য বিশেষ কোনো উচ্চশিক্ষার চেয়ে কারিগরি দক্ষতা বা স্কিল টেস্টে উত্তীর্ণ হওয়া বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তরুণদের এই স্কিল ডেভেলপমেন্টের ওপর গুরুত্ব দিলে তাদের সফলতা দ্রুত নিশ্চিত হবে। বৈধভাবে বিদেশে যাওয়ার বিষয়টি কেবল একটি চাকরির পথ নয়, বরং এটি দেশের জন্য বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম বড় মাধ্যম।
বর্তমান বিশ্বে ইউরোপের শ্রমবাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে দক্ষতা ও সততার কোনো বিকল্প নেই। মাল্টায় এখন যারা বৈধপথে কাজ করছেন, তারা কেবল নিজেরাই লাভবান হচ্ছেন না, বরং দেশের অর্থনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন। যদি একজন কর্মী প্রতি মাসে এক লাখ টাকা সঞ্চয় করতে পারেন, তবে বছরে তিনি ১২ লাখ টাকা দেশে পাঠাতে পারছেন। অথচ অবৈধভাবে যাওয়ার জন্য দালালদের পেছনে ১৯-২০ লাখ টাকা খরচ করার পর যদি সর্বস্বান্ত হতে হয়, তবে সেই অর্থনীতির চাকা আর কখনো সচল হয় না। তাই তরুণ প্রজন্মের কাছে আবেদন, দালালের ফাঁদ থেকে সাবধান হোন, বৈধ পথে মাল্টায় যাওয়ার প্রস্তুতি নিন।
পরিশেষে বলা যায়, মাল্টা কেবল একটি দেশ নয়, এটি হাজারো তরুণের স্বপ্নপূরণের এক নিরাপদ ক্ষেত্র। সেখানে নিয়ম মেনে কাজ করলে এবং নিজেদের দক্ষতা প্রমাণ করতে পারলে আগামী পাঁচ বছরেই ইউরোপের স্থায়ী নাগরিক হওয়ার সুযোগ রয়েছে। যারা ইউরোপের সেনজেনভুক্ত দেশে বৈধভাবে কাজ করতে চান, তাদের জন্য এখন মাল্টাই হতে পারে সবচেয়ে কার্যকর গন্তব্য। আমরা যেন অবৈধ পথের মোহ ত্যাগ করি এবং দায়িত্বশীল হয়ে বৈধ কাজের পথ বেছে নিই। তবেই মাল্টায় বাংলাদেশিদের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হবে এবং আরও হাজারো তরুণ সেখানে কর্মসংস্থানের সুযোগ পাবে। মাল্টার এই সুবর্ণ সুযোগ আমাদের জন্য এক আশীর্বাদ, যা সঠিক পরিকল্পনায় কাজে লাগিয়ে আমরা গড়ে তুলতে পারি এক সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ।


