প্রকাশ: ২৩ মে ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
যুক্তরাষ্ট্রে অস্থায়ী ভিসায় অবস্থানরত বিদেশি নাগরিকদের জন্য গ্রিনকার্ড বা স্থায়ী বসবাসের অনুমতি পাওয়ার প্রক্রিয়ায় নতুন কড়াকড়ি আরোপ করেছে দেশটির প্রশাসন। নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, এখন থেকে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত সাময়িক ভিসাধারীদের গ্রিনকার্ডের জন্য আবেদন করতে হলে নিজ দেশে ফিরে গিয়ে আবেদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে।
এই সিদ্ধান্তকে অভিবাসন ব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ, নিয়ন্ত্রিত এবং আইনগতভাবে শক্তিশালী করার অংশ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছে ট্রাম্প প্রশাসন। একই সঙ্গে এটিকে বিদ্যমান ব্যবস্থার ভেতরে থাকা আইনি ফাঁকফোকর বন্ধ করার একটি পদক্ষেপ বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।
মার্কিন নাগরিকত্ব ও অভিবাসন সেবা বিভাগ (ইউএসসিআইএস) শুক্রবার এ বিষয়ে একটি নতুন নীতিগত নির্দেশনা জারি করে। সেখানে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে থেকে স্থায়ী বসবাসের মর্যাদা পরিবর্তন বা ‘অ্যাডজাস্টমেন্ট অব স্ট্যাটাস’ কোনো স্বয়ংক্রিয় অধিকার নয়; বরং এটি কর্তৃপক্ষের বিবেচনার ওপর নির্ভরশীল একটি প্রক্রিয়া।
নতুন নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন কাঠামো মূলত এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যেখানে অস্থায়ী ভিসাধারীরা তাদের নির্ধারিত সময় শেষ হলে নিজ দেশে ফিরে যাবেন—এটাই মূল নীতি। তবে এখন থেকে প্রতিটি গ্রিনকার্ড আবেদন পৃথকভাবে মূল্যায়ন করা হবে এবং আবেদনকারীর ব্যক্তিগত পরিস্থিতি, নথিপত্র ও অভিবাসন ইতিহাস গভীরভাবে যাচাই করা হবে।
ইউএসসিআইএস জানিয়েছে, আবেদন মূল্যায়নের সময় কিছু বিষয়কে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে। এর মধ্যে রয়েছে ভিসার শর্ত ভঙ্গ করা হয়েছে কি না, নির্ধারিত সময়ের বেশি অবস্থান করা হয়েছে কি না, অনুমতি ছাড়া কাজ করা হয়েছে কি না এবং প্রবেশের সময় দেওয়া শর্তগুলো যথাযথভাবে মানা হয়েছে কি না। এসব বিষয় ভবিষ্যতের সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
তবে নতুন নীতিতে কিছু ব্যতিক্রমও রাখা হয়েছে। বিশেষ করে যেসব ভিসা ‘ডুয়াল ইনটেন্ট’ বা দ্বৈত উদ্দেশ্য অনুমোদন করে, সেগুলোর ক্ষেত্রে আলাদা বিবেচনা করা হবে। এই ধরনের ভিসাধারীরা আইন অনুযায়ী সাময়িকভাবে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করলেও গ্রিনকার্ডের জন্য আবেদন করার সুযোগ পান। তবে ইউএসসিআইএস স্পষ্ট করে জানিয়েছে, এই সুযোগ গ্রিনকার্ড পাওয়ার কোনো নিশ্চয়তা নয়।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিবর্তনের ফলে আবেদন প্রক্রিয়া আরও জটিল ও সময়সাপেক্ষ হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে যারা শিক্ষার্থী, কর্মসংস্থান বা বিনিময় কর্মসূচির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে রয়েছেন, তাদের জন্য নিজ দেশে ফিরে আবেদন করা নতুন ধরনের প্রশাসনিক ও আর্থিক চাপ তৈরি করতে পারে।
অন্যদিকে, মার্কিন প্রশাসনের দাবি, নতুন ব্যবস্থা অভিবাসন ব্যবস্থাকে আরও শৃঙ্খলিত করবে এবং আবেদন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বাড়াবে। একই সঙ্গে অতিরিক্ত চাপ কমিয়ে অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অভিবাসন মামলার নিষ্পত্তি দ্রুত করার সুযোগ তৈরি হবে বলেও জানিয়েছে ইউএসসিআইএস।
তবে এই সিদ্ধান্তকে ঘিরে ইতোমধ্যেই মানবাধিকার ও অভিবাসী অধিকার সংগঠনগুলো উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তাদের মতে, নতুন নিয়ম অনেক আবেদনকারীকে অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে ফেলে দেবে এবং বৈধভাবে প্রক্রিয়াধীন থাকা মানুষদের জন্য ঝুঁকি তৈরি করবে।
শরণার্থী ও অভিবাসী সহায়তা সংস্থা ‘হায়াস’ জানিয়েছে, এই নীতির কারণে নির্যাতনের শিকার ব্যক্তি, মানবপাচারের শিকার মানুষ এবং ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় থাকা শিশুরাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। কারণ অনেক ক্ষেত্রেই তাদের নিজ দেশে ফেরত যাওয়া নিরাপদ নয়।
অভিবাসন নীতির এই পরিবর্তনকে ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর অভিবাসন অবস্থানের ধারাবাহিক অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এর আগে বিভিন্ন সময় শিক্ষার্থী ভিসা, সাংস্কৃতিক বিনিময় কর্মসূচি এবং গণমাধ্যম কর্মীদের ভিসার মেয়াদ কমানোসহ একাধিক কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, বর্তমান প্রশাসনের মেয়াদে এক বছরের মধ্যে এক লাখেরও বেশি ভিসা বাতিল করা হয়েছে বলে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই নতুন নীতি যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন ব্যবস্থায় দীর্ঘমেয়াদে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ও দক্ষ কর্মীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা বাড়তে পারে, যা দেশটির শ্রমবাজার ও উচ্চশিক্ষা খাতেও প্রভাব ফেলতে পারে।
সব মিলিয়ে গ্রিনকার্ড আবেদন প্রক্রিয়ায় এই নতুন নির্দেশনা যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন নীতিতে আরও একটি কঠোর অধ্যায় যুক্ত করল, যা ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক অভিবাসন প্রবাহে নতুন আলোচনার জন্ম দিতে পারে।


