প্রকাশ: ০৫ জুন ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
বিশ্ব পরিবেশ দিবস উপলক্ষে দেওয়া এক বিশেষ বাণীতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় গবেষণা, উদ্ভাবন এবং প্রযুক্তিগত সম্প্রসারণ কার্যক্রমকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, বর্তমান বিশ্ব এক চরম জলবায়ু সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে এবং এই সংকট কেবল একটি দেশের নয়, বরং সমগ্র মানবজাতির অস্তিত্বের জন্য এক বড় বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, অসহনীয় তাপপ্রবাহ, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস এবং আকস্মিক বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগগুলো আমাদের পরিবেশ, অর্থনীতি এবং দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ওপর গভীর ক্ষত সৃষ্টি করছে। এমতাবস্থায় জলবায়ু পরিবর্তনের এই বৈরী প্রভাবকে রুখে দিতে সরকার এক সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদী কর্মপরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে চলেছে।
প্রধানমন্ত্রী তার বাণীতে বাংলাদেশের ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক ঝুঁকির বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেছেন। যদিও বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণে বাংলাদেশের অবদান নামমাত্র, তবুও ভৌগোলিক অবস্থান, উচ্চ জনঘনত্ব এবং জলবায়ু-সংবেদনশীল অর্থনীতির কারণে বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে পরিচিত। ক্লাইমেট রিস্ক ইনডেক্স-২০২৬ অনুযায়ী, বাংলাদেশ প্রতিনিয়ত উচ্চ জলবায়ু ঝুঁকির সম্মুখীন হচ্ছে। উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ততা বৃদ্ধি, কৃষি উৎপাদন কমে যাওয়া এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে মানুষের বাস্তুচ্যুতি হওয়ার ঘটনাগুলো দেশের চলমান উন্নয়ন অগ্রযাত্রার জন্য এক বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই প্রতিকূলতাকে কাটিয়ে উঠতে কৃষিকে আধুনিক, টেকসই ও জলবায়ু-সহিষ্ণু ভিত্তিতে পুনর্গঠন করার কোনো বিকল্প নেই বলে তিনি মন্তব্য করেছেন।
জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকি হ্রাসে বাংলাদেশ বর্তমানে একটি দূরদর্শী ও সমন্বিত নীতিকাঠামো অনুসরণ করছে। প্রধানমন্ত্রী জানান, জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা বা এনএপি এবং জাতীয়ভাবে নির্ধারিত অবদান বা এনডিসির সফল বাস্তবায়নের মাধ্যমে সরকার জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় কাজ করে যাচ্ছে। উপকূলীয় অঞ্চলের সুরক্ষার জন্য নেওয়া বিভিন্ন প্রকল্প, দুর্যোগ মোকাবিলার প্রস্তুতি এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাস্তুচ্যুত হওয়া জনগোষ্ঠীর পুনর্বাসনের জন্য প্রকৃতিভিত্তিক সমাধানগুলোকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তারেক রহমান দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন যে, পরিবেশ সংরক্ষণ, জলবায়ু-সহনশীলতা বৃদ্ধি এবং টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করাই বর্তমান সরকারের মূল লক্ষ্য।
সবুজ বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে সরকার আগামী পাঁচ বছরের জন্য একটি বিশাল ও উচ্চাভিলাষী বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। এর আওতায় সারা দেশে ২৫ কোটি বৃক্ষ রোপণ করা হবে, যা জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে। একই সঙ্গে সারা দেশে দীর্ঘ ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন ও পুনঃখননের কাজ শুরু হয়েছে, যা দেশের প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থাকে উন্নত করবে এবং বন্যার ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করবে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট সংকট নিরসনে সরকারের এই বিশাল কর্মযজ্ঞ পরিবেশবাদী মহলে প্রশংসিত হয়েছে। পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই প্রকল্পগুলো যদি সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়, তবে বাংলাদেশের প্রাকৃতিক ভারসাম্য অনেকাংশে রক্ষা পাবে।
কার্বন নিঃসরণ হ্রাস এবং বৈশ্বিক কার্বন মার্কেটের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতেও সরকার নানামুখী কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। প্রধানমন্ত্রী বাণীতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার সম্প্রসারণ, সবুজ শিল্পায়ন, পরিবেশবান্ধব নগরায়ণ এবং উন্নত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। তার মতে, গণপরিবহনের আধুনিকায়ন এবং পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহারই পারে শহরগুলোর দূষণ কমাতে এবং মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত করতে। এই উদ্যোগগুলো শুধু পরিবেশ রক্ষায় নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদে দেশের অর্থনীতির গতিপথকেও পরিবেশবান্ধব করে তুলবে। তিনি উল্লেখ করেন, পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির ব্যবহার এখন আর বিলাসিতা নয়, বরং টিকে থাকার লড়াইয়ে এটি এক অপরিহার্য অনুষঙ্গ।
বাণীতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশের তরুণ প্রজন্ম ও গবেষকদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের মতো জটিল বিষয়গুলো মোকাবিলায় গবেষণার কোনো বিকল্প নেই। আমাদের বিজ্ঞানীরা যদি স্থানীয় জলবায়ুর সঙ্গে মানানসই উচ্চফলনশীল ও জলবায়ু-সহিষ্ণু ফসলের জাত উদ্ভাবন করতে পারেন, তবে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সহজ হবে। তিনি বিশ্বাস করেন, সম্মিলিত উদ্যোগ, পরিবেশ সচেতনতা এবং প্রতিটি নাগরিকের দায়িত্বশীল আচরণের মাধ্যমেই কেবল একটি সবুজ, নিরাপদ ও জলবায়ু-সহনশীল বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব। এটিই সরকারের পক্ষ থেকে জনগণের কাছে দেওয়া এক দৃঢ় প্রত্যয় এবং অঙ্গীকার।
বিশ্ব পরিবেশ দিবসের গুরুত্ব উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচি বা ইউএনইপি ঘোষিত এ বছরের প্রতিপাদ্য ‘ক্লাইমেট অ্যাকশন’ বিশ্বব্যাপী জলবায়ু উদ্যোগকে আরও গতিশীল করার এক বিশেষ বার্তা বহন করে। তিনি বিশ্ববাসীকে এই বার্তা অনুধাবন করে নিজ নিজ অবস্থান থেকে কাজ করার আহ্বান জানান। জলবায়ু পরিবর্তনের ক্রমবর্ধমান অভিঘাত যে এক কঠিন বাস্তবতা, তা আজকের দিনটি আমাদের নতুন করে স্মরণ করিয়ে দেয়। প্রধানমন্ত্রী তার বাণীতে বিশ্ব পরিবেশ দিবস উপলক্ষে গৃহীত প্রতিটি কর্মসূচির সার্বিক সাফল্য কামনা করেছেন এবং দেশের সকল শ্রেণি-পেশার মানুষকে প্রকৃতি সংরক্ষণে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন।
পরিশেষে বলা যায়, প্রধানমন্ত্রীর এই দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের লড়াইকে আরও শক্তিশালী করবে। পরিবেশ রক্ষা ও উন্নয়নের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখেই বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে আগামীর পানে। উন্নয়নের নেশায় প্রকৃতিকে ধ্বংস করার পরিবর্তে প্রকৃতির সঙ্গে মিলেমিশে বেঁচে থাকার যে দর্শন প্রধানমন্ত্রী তুলে ধরেছেন, তা অনুসরণ করাই এখন সময়ের দাবি। আমাদের প্রতিটি পদক্ষেপ, প্রতিটি উদ্ভাবন এবং প্রতিটি বৃক্ষ রোপণ যেন এই দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য ও নিরাপদ পৃথিবী নিশ্চিত করে—এই হোক আজকের দিনের মূল শিক্ষা ও অঙ্গীকার। পরিবেশের প্রতি এই যত্নশীল আচরণই আমাদের দীর্ঘমেয়াদী উন্নতির চাবিকাঠি হিসেবে কাজ করবে।


