প্রকাশ: ০৫ জুন ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
এক বুক আশা নিয়ে প্রিয়জনের জীবন বাঁচাতে ভারতের রাজধানী দিল্লিতে পাড়ি জমিয়েছিলেন নুরুল আমিন। ভগ্নিপতির দুটি কিডনিই বিকল হয়ে যাওয়ায় চিকিৎসার জন্য তিনি বেছে নিয়েছিলেন উন্নত চিকিৎসার ঠিকানা। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, যে বাঁচার আকুতি নিয়ে তারা সীমান্ত পেরিয়েছিলেন, দিল্লি তাদের জন্য নিয়ে এল এক ভয়াবহ দুঃসংবাদ। মালভিয়া নগরের একটি হোটেলে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় দগ্ধ হয়ে না ফেরার দেশে চলে গেলেন কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামের এই বাসিন্দা। চারজন স্বজন নিয়ে যে স্বপ্নের জাল বুনেছিলেন নুরুল আমিন, তা মুহূর্তে পরিণত হলো ছাইয়ে। তার এই অকাল মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে তার নিজ গ্রাম চিওড়ার সাঙ্গীশ্বরসহ পুরো এলাকায়।
গত ২ জুন পরিবারের পাঁচ সদস্যকে সঙ্গে নিয়ে ঢাকা থেকে আকাশপথে দিল্লি পৌঁছান নুরুল আমিন। তার ভগ্নিপতি মোশারফ হোসেনের কিডনি প্রতিস্থাপনের যাবতীয় প্রস্তুতি নিতেই তারা দক্ষিণ দিল্লির মালভিয়া নগরের ‘ফ্লোরিশ স্টে’ নামক হোটেলে উঠেছিলেন। সব পরিকল্পনা ছিল ঠিকঠাক। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী কিডনি প্রতিস্থাপনের জটিল অস্ত্রোপচার ও পরবর্তী চিকিৎসা নিয়ে পরিবারের সদস্যদের মাঝে একধরণের আশার আলো ছিল। কিন্তু গত বুধবার সকাল সাড়ে আটটার দিকে সেই হোটেলেই হঠাৎ ছড়িয়ে পড়ে আগুনের লেলিহান শিখা। মুহূর্তের মধ্যে হোটেলের নিচতলার রেস্তোরাঁ থেকে শুরু হওয়া এই আগুন ভবনের ওপরের তলাগুলোতে গ্রাস করে নেয় সবকিছু। ঘটনার সময় নুরুল আমিন হোটেলের নিচে নাশতা করতে নামলেও ওপরের কক্ষে আটকে পড়া পরিবারের সদস্যদের বাঁচাতে গিয়ে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের শিকার হন।
নুরুল আমিনের ভগ্নিপতি মোহাম্মদ বাচ্চু মিয়ার কণ্ঠে সেই বিভীষিকাময় মুহূর্তের বর্ণনা যেন হৃদয়ে রক্তক্ষরণ ঘটায়। তিনি জানান, নুরুল আমিন পরিবারের অন্য সদস্যদের জীবন বাঁচাতে জীবনপণ চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু আগুনের তীব্রতা এতটাই বেশি ছিল যে, তাকে শেষ পর্যন্ত বাঁচানো সম্ভব হয়নি। চিকিৎসাধীন অবস্থায় বৃহস্পতিবার দিল্লির একটি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন ৪৪ বছর বয়সী এই মানুষটি। মৃত্যুর সময় তিনি এক ছেলে ও দুই মেয়ের জনক ছিলেন। চট্টগ্রামে ‘আমিন অ্যান্ড ব্রাদার্স’ নামের একটি খাদ্যপণ্য উৎপাদন প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার হিসেবে পরিচিত নুরুল আমিন ছিলেন পরিবারের অভিভাবক। তার মৃত্যুতে কেবল একটি পরিবার নয়, বরং একটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান ও সমাজ একজন উদ্যমী ও পরোপকারী মানুষকে হারাল।
এই দুর্ঘটনায় নুরুল আমিনের বোন রেহানা আক্তার, ভগ্নিপতি মোশারফ হোসেন, চাচাতো বোন উম্মে জোহরা এবং তার মেয়ে উম্মে জাইমা মারাত্মক দগ্ধ হয়েছেন। তাদের সবাইকে দিল্লির একটি হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রে (আইসিইউ) রাখা হয়েছে। তাদের শারীরিক অবস্থা এখনো সংকটাপন্ন বলে জানা গেছে। আহতদের সুস্থতা নিয়ে স্বজনরা এখন প্রহর গুণছেন এবং প্রার্থনা করছেন যেন প্রিয়জনদের এমন করুণ পরিণতি আর দেখতে না হয়। চৌদ্দগ্রাম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাহাদাৎ হোসেন বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, প্রশাসনের পক্ষ থেকে ভুক্তভোগী পরিবারের স্বজনদের নিয়মিত খোঁজখবর রাখা হচ্ছে এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে নুরুল আমিনের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার সবরকম উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
দিল্লির মালভিয়া নগরের মিকাসা ইন বা ফ্লোরিশ স্টে হোটেলে ঘটা এই অগ্নিকাণ্ড যেন এক বিশাল ট্র্যাজেডি। আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যম ও বাংলাদেশ হাইকমিশনের তথ্যমতে, এই ঘটনায় ভারতসহ মোজাম্বিক, লাইবেরিয়া, নাইজেরিয়া, উজবেকিস্তান ও বাংলাদেশের নাগরিকসহ মোট ২২ জনের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন আরও অন্তত ২৮ জন। হোটেলের নিচতলায় রেস্তোরাঁ ও ওপরের তলায় হোটেল থাকার কারণে আগুনের উৎস থেকে দ্রুত ধোঁয়া ও তাপ উপরের দিকে উঠে যায়, ফলে অতিথিরা বের হওয়ার পথ খুঁজে পাননি। হোটেলের অগ্নি নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে এখন আন্তর্জাতিকভাবে বড় ধরণের প্রশ্ন উঠছে। বিদেশি পর্যটক ও রোগীদের জন্য নিরাপদ আবাসস্থল হিসেবে গণ্য হওয়া এই হোটেলটি যে এভাবে মৃত্যুর ফাঁদে পরিণত হবে, তা ছিল কারো কল্পনার বাইরে।
নুরুল আমিনের পরিবার আজ এক অনিশ্চিত পরিস্থিতির মুখোমুখি। চিকিৎসার প্রয়োজনে গিয়ে যে ট্র্যাজেডির কবলে তারা পড়লেন, তা যেন এক অভিশপ্ত অভিজ্ঞতার নামান্তর। দিল্লিতে অবস্থানরত বাংলাদেশ হাইকমিশন জানিয়েছে, তারা শোকাহত পরিবারটিকে সম্ভাব্য সব ধরনের আইনি ও লজিস্টিক সহায়তা দিতে প্রস্তুত। মরদেহ দ্রুত দেশে পাঠাতে এবং আহতদের চিকিৎসার মান নিশ্চিত করতে হাইকমিশন দিল্লির স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখছে। প্রবাসে কোনো প্রিয়জনকে হারানো এবং আহত অবস্থায় অন্য দেশে আটকা পড়া পরিবারটির জন্য এই সময়টা যে কতটা যন্ত্রণাদায়ক, তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়।
এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয় জীবন কতটা অনিশ্চিত। চিকিৎসার মতো একটি পবিত্র উদ্দেশ্যে ভ্রমণে গিয়ে এমন মৃত্যু মেনে নেওয়া কঠিন। নুরুল আমিনের মৃত্যুতে তার সাঙ্গীশ্বর গ্রামের বাড়িতে এখন মাতম চলছে। ছোট ছেলে-মেয়েদের আর্তনাদ আর বৃদ্ধ স্বজনদের আহাজারিতে আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে। তারা এখন কেবল একটিই প্রার্থনা করছেন, আহত স্বজনরা যেন দ্রুত সুস্থ হয়ে দেশে ফিরে আসেন এবং নুরুল আমিনের মরদেহ যেন দ্রুত তার মাটির কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে। একটি হাসিখুশি পরিবারকে মুহূর্তের মধ্যে ছিন্নভিন্ন করে দেওয়া এই অগ্নিকাণ্ড আমাদের জন্য বড় একটি সতর্কবার্তা। পর্যটন কেন্দ্রগুলো এবং হোটেলের অগ্নি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি এখন সময়ের দাবিতে পরিণত হয়েছে, যাতে আর কোনো মানুষ চিকিৎসার উদ্দেশ্যে গিয়ে লাশ হয়ে ফিরে না আসে। নুরুল আমিনের রেখে যাওয়া শূন্যস্থান কখনো পূরণ হওয়ার নয়, কিন্তু তার পরিবারের এই কঠিন সময়ে দেশবাসীর সহানুভূতি ও সরকারি সহায়তা কিছুটা হলেও তাদের শোক সামলাতে শক্তি জোগাবে। আমরা গভীর শোক প্রকাশ করছি এই পরিবারের প্রতি এবং আশা করছি খুব শীঘ্রই তারা এই সংকট কাটিয়ে উঠতে পারবে।


