প্রকাশ: ০২ জুন ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সুনামগঞ্জ-সিলেট আঞ্চলিক মহাসড়কের গুরুত্বপূর্ণ একটি যোগাযোগ কেন্দ্র ছাতক উপজেলার বড় কাপন পয়েন্টে যাত্রী পরিবহনকে কেন্দ্র করে বাস ও সিএনজি অটোরিকশা সংশ্লিষ্ট দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। মঙ্গলবার দুপুরে সংঘটিত এ ঘটনায় অন্তত ১৫ জন আহত হয়েছেন বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। সংঘর্ষের সময় মহাসড়কে ব্যাপক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে এবং কিছু সময়ের জন্য যান চলাচল ব্যাহত হওয়ায় দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে এবং সড়কে স্বাভাবিক যান চলাচল পুনরুদ্ধার করে।
স্থানীয় সূত্র, পরিবহন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ এবং পুলিশ জানিয়েছে, দীর্ঘদিন ধরেই বড় কাপন পয়েন্টে যাত্রী পরিবহন ও ওঠানামা নিয়ে বাস ও সিএনজি পরিবহন শ্রমিকদের মধ্যে এক ধরনের অঘোষিত প্রতিযোগিতা চলছিল। মঙ্গলবার দুপুরে সেই বিরোধ প্রকাশ্য সংঘর্ষে রূপ নেয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্যমতে, কয়েকজন যাত্রী জাউয়া বাজারে যাওয়ার উদ্দেশ্যে একটি সিএনজি অটোরিকশায় ওঠেন। এ সময় ওই এলাকায় দায়িত্বে থাকা বাস মালিক সমিতির প্রতিনিধির পক্ষ থেকে সিএনজি চালককে যাত্রী না তোলার জন্য বলা হয়। বিষয়টি নিয়ে শুরু হয় বাকবিতণ্ডা, যা পরে হাতাহাতি এবং সংঘর্ষে রূপ নেয়।
স্থানীয়দের দাবি, প্রথমে সিএনজি চালক সাদিক মিয়া এবং তার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার ও মারধরের ঘটনা ঘটে। এ খবর ছড়িয়ে পড়লে উভয় পক্ষের সমর্থকরা ঘটনাস্থলে জড়ো হন। অল্প সময়ের মধ্যেই দুই পক্ষের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া, ইটপাটকেল নিক্ষেপ এবং মারামারির ঘটনা শুরু হয়। এতে বেশ কয়েকজন আহত হন এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার উপক্রম হয়।
সংঘর্ষের সময় সড়কের দুই পাশে শত শত যানবাহন আটকা পড়ে। দূরপাল্লার বাস, পণ্যবাহী ট্রাক, ব্যক্তিগত যানবাহন এবং যাত্রীবাহী ছোট পরিবহনগুলো দীর্ঘ সময় স্থবির হয়ে পড়ে। যাত্রীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং অনেকেই নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার চেষ্টা করেন। স্থানীয় ব্যবসায়ীরাও দোকানপাট আংশিকভাবে বন্ধ করে দেন।
বড় কাপন পয়েন্ট সিএনজি শ্রমিক সমিতির সভাপতি কপিল উদ্দিন অভিযোগ করেন, যাত্রী পরিবহনকে কেন্দ্র করে তাদের একজন চালককে মারধরের মাধ্যমে ঘটনার সূচনা হয়। তার দাবি, পরে সংঘর্ষে তাদের অন্তত ১৫ জন সদস্য আহত হয়েছেন। তিনি আরও অভিযোগ করেন, প্রতিপক্ষের লোকজন ১৫ থেকে ২০টি সিএনজি অটোরিকশা ভাঙচুর করেছে, যার ফলে মালিক ও চালকরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
অন্যদিকে বাস মালিক সমিতির স্থানীয় ব্যবস্থাপক ছাত্তার মিয়া অভিযোগ অস্বীকার করে পাল্টা দাবি করেন, বাসের জন্য অপেক্ষমাণ যাত্রীদের সিএনজিতে তুলে নেওয়াকে কেন্দ্র করেই মূলত বিরোধের সৃষ্টি হয়। তার বক্তব্য অনুযায়ী, উভয় পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ার পর সংঘর্ষ হয়েছে এবং তাদের পক্ষেরও ১৫ থেকে ১৬ জন আহত হয়েছেন। তিনি সিএনজি ভাঙচুরের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বলেন, তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সত্য নয় এবং ক্ষতিগ্রস্ত যানবাহনের বিষয়ে সঠিক তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।
এ ঘটনার পর এলাকায় উত্তেজনা বিরাজ করলেও পুলিশ দ্রুত হস্তক্ষেপ করায় বড় ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়ানো সম্ভব হয়েছে। ছাতক থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মিজানুর রহমান জানিয়েছেন, খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। প্রাথমিকভাবে পাওয়া তথ্যে কয়েকজন আহত হওয়ার পাশাপাশি একাধিক সিএনজি অটোরিকশা ভাঙচুরের বিষয়টি জানা গেছে। তবে বিভিন্ন পক্ষের দেওয়া তথ্যের মধ্যে কিছু অমিল রয়েছে। তাই প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতি ও আহতের সংখ্যা নির্ধারণে তদন্ত করা হবে।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, সংঘর্ষে জড়িতদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে এবং কেউ লিখিত অভিযোগ দিলে তা গুরুত্বসহকারে তদন্ত করা হবে। অভিযোগের ভিত্তিতে দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের কথাও জানিয়েছে পুলিশ।
পরিবহন খাত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, যাত্রী পরিবহনকে কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রায়ই বাস, লেগুনা, সিএনজি ও অন্যান্য পরিবহনের শ্রমিকদের মধ্যে বিরোধ দেখা যায়। নির্দিষ্ট স্টপেজ, যাত্রী ওঠানামার নিয়ম এবং স্থানীয় সমঝোতা না থাকলে এসব বিরোধ অনেক সময় সংঘর্ষে রূপ নেয়। বড় কাপন পয়েন্টের ঘটনাও দীর্ঘদিনের অসন্তোষ ও প্রতিযোগিতার বহিঃপ্রকাশ হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
স্থানীয় সচেতন মহল মনে করছে, সড়ক পরিবহন ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা এবং যাত্রী পরিবহনের জন্য নির্দিষ্ট নীতিমালা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা না গেলে এ ধরনের সংঘাত বারবার ঘটতে পারে। তারা সংশ্লিষ্ট প্রশাসন, পরিবহন মালিক সমিতি এবং শ্রমিক সংগঠনগুলোর মধ্যে সমন্বয় বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। একই সঙ্গে যাত্রী পরিবহন সংক্রান্ত বিরোধ আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করার আহ্বান জানিয়েছেন।
এদিকে সংঘর্ষের ঘটনায় আহতদের মধ্যে কয়েকজনকে স্থানীয় স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। আহতদের অনেকে প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে বাড়ি ফিরলেও কয়েকজনকে পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। তবে তাদের কারও অবস্থা আশঙ্কাজনক নয় বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে।
বড় কাপন পয়েন্ট সুনামগঞ্জ ও সিলেটের মধ্যকার গুরুত্বপূর্ণ যাতায়াত কেন্দ্র হওয়ায় এ এলাকায় যেকোনো ধরনের অস্থিরতা দ্রুত বৃহত্তর জনজীবনে প্রভাব ফেলে। তাই ঘটনাটি শুধু একটি স্থানীয় বিরোধ নয়, বরং আঞ্চলিক পরিবহন ব্যবস্থাপনার একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট মহল আশা করছে, প্রশাসনের উদ্যোগে দ্রুত তদন্ত সম্পন্ন হবে এবং উভয় পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে স্থায়ী সমাধানের পথ খুঁজে বের করা হবে, যাতে ভবিষ্যতে একই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে।


