প্রকাশ: ২৫ মে ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলার শাহজীবাজার বিদ্যুৎকেন্দ্র এখন যেন দেশের বিদ্যুৎখাতের এক দীর্ঘস্থায়ী অস্বস্তির নাম। কয়েক হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত দুটি বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র যান্ত্রিক ত্রুটি, অগ্নিকাণ্ড এবং দীর্ঘসূত্রতায় কার্যত অচল হয়ে পড়ায় প্রতিদিন বিপুল আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছে সরকার। সংশ্লিষ্টদের দাবি, ১০০ মেগাওয়াট ও ৩৩০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন শাহজীবাজার বিদ্যুৎকেন্দ্র দুটি পরিকল্পনা অনুযায়ী সচল থাকলে জাতীয় গ্রিডে বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ সরবরাহ সম্ভব হতো। কিন্তু বাস্তবতায় কেন্দ্র দুটির উৎপাদন বারবার বন্ধ হয়ে যাওয়ায় প্রতিদিন প্রায় ১৮ কোটি টাকার ক্ষতি গুনতে হচ্ছে রাষ্ট্রকে।
বিদ্যুৎ বিভাগের বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, শাহজীবাজার ১০০ মেগাওয়াট গ্যাস টারবাইন বিদ্যুৎকেন্দ্রটি নির্মাণে ব্যয় হয় প্রায় ৮৯০ কোটি টাকা। ২০২০ সালে কেন্দ্রটি পূর্ণাঙ্গ উৎপাদনে যাওয়ার কথা থাকলেও নানা জটিলতা ও কারিগরি সমস্যার কারণে তা আর সম্ভব হয়নি। ২০২১ সালে পরীক্ষামূলক উৎপাদনের সময় টারবাইনের ব্লেড ভেঙে যাওয়ার পর থেকেই একের পর এক যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দিতে থাকে। পরে কয়েক দফা মেরামতের উদ্যোগ নেওয়া হলেও স্থায়ী সমাধান হয়নি। সর্বশেষ ২০২৪ সালের এপ্রিল মাসে পুনরায় ব্লেড বিকল হলে কেন্দ্রটির উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।
প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গত চার বছরে কেন্দ্রটি মাত্র এক হাজার ৬১০ ঘণ্টা চালু ছিল। অথচ পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রতিদিন প্রায় ২৪ লাখ ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা ছিল এই কেন্দ্রের। জাতীয় গ্রিডে এই কেন্দ্র থেকে মাত্র ৬৪ কোটি টাকার বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব হয়েছে। বর্তমান বাজারমূল্য বিবেচনায় প্রতিদিন প্রায় দুই কোটি টাকার বিদ্যুৎ উৎপাদনের সুযোগ হারিয়েছে সরকার। হিসাব অনুযায়ী, শুধু ১০০ মেগাওয়াট কেন্দ্র থেকেই গত ছয় বছরে প্রায় চার হাজার কোটি টাকার সম্ভাব্য উৎপাদন ক্ষতি হয়েছে।
অন্যদিকে আরও বড় সংকটে রয়েছে শাহজীবাজার ৩৩০ মেগাওয়াট কম্বাইন্ড সাইকেল বিদ্যুৎকেন্দ্র। প্রায় ২ হাজার ৮০৯ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই কেন্দ্রটি চালুর পরপরই বিভিন্ন যান্ত্রিক জটিলতায় পড়ে। তবে সবচেয়ে বড় বিপর্যয় ঘটে ২০২২ সালের ২৯ মে। ওইদিন ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে কেন্দ্রটির একটি গুরুত্বপূর্ণ ট্রান্সফরমার পুড়ে যায়। এর পর থেকেই উৎপাদন কার্যত বন্ধ হয়ে পড়ে। দীর্ঘ সময় ধরে মেরামত কাজও থেমে থাকায় জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়।
শাহজীবাজার বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রধান প্রকৌশলী আব্দুল মান্নান জানিয়েছেন, বর্তমানে কেন্দ্রটির একটি ইউনিট আংশিকভাবে চালু করে ১০০ থেকে ১৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হচ্ছে। এর ফলে প্রতিদিন প্রায় আট কোটি টাকা সাশ্রয় সম্ভব হচ্ছে। তবে বাকি দুটি ইউনিট পুরোপুরি সচল করা গেলে প্রতিদিন আরও প্রায় ১৬ কোটি টাকার সাশ্রয় করা যেত বলে জানিয়েছেন তিনি।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, ৩৩০ মেগাওয়াট কেন্দ্রটি দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় গত চার বছরে সরকার সম্ভাব্য প্রায় ২৩ হাজার কোটি টাকার সাশ্রয় থেকে বঞ্চিত হয়েছে। পাশাপাশি ১০০ মেগাওয়াট কেন্দ্রের উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় আরও কয়েক হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। সবমিলিয়ে শাহজীবাজার বিদ্যুৎকেন্দ্রকে ঘিরে সরকারের মোট ক্ষতির পরিমাণ ৪০ হাজার কোটি টাকারও বেশি বলে দাবি করা হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, এই বিদ্যুৎকেন্দ্র ঘিরে তাদের প্রত্যাশা ছিল অনেক। শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান এবং বিদ্যুৎ সংকট নিরসনে বড় ভূমিকা রাখবে—এমন আশায় ছিলেন তারা। কিন্তু বছরের পর বছর ধরে কেন্দ্রগুলো নানা সমস্যায় পড়ে থাকায় হতাশা বাড়ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, বিপুল অঙ্কের অর্থ ব্যয়ের পরও প্রকল্পগুলোর কার্যকর ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা যায়নি।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের বিদ্যুৎখাতে বড় প্রকল্প গ্রহণের ক্ষেত্রে পরিকল্পনা, তদারকি এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতার ঘাটতি থাকলে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়। আন্তর্জাতিক মানের যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা হলেও সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ ও দক্ষ পরিচালনা নিশ্চিত না হলে বড় ধরনের ক্ষতির ঝুঁকি থেকেই যায়।
এ বিষয়ে প্রকল্প ব্যবস্থাপক এ কে মফিজউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, ১০০ মেগাওয়াট কেন্দ্রের জন্য ব্যবহৃত টারবাইন আন্তর্জাতিক মানের। এরপরও কেন বারবার যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দিচ্ছে, তা খতিয়ে দেখতে বিশেষজ্ঞরা কাজ করছেন। তিনি জানান, প্রকল্পের কাজের বিপরীতে ইতোমধ্যে প্রায় ৬০০ কোটি টাকা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে পরিশোধ করা হয়েছে। তবে কাজ পুরোপুরি শেষ না হওয়ায় এখনো প্রায় ৯০ কোটি টাকা আটকে রেখেছে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)।
বিদ্যুৎখাত বিশ্লেষকরা বলছেন, বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো দীর্ঘ সময় অচল থাকায় শুধু আর্থিক ক্ষতিই নয়, জাতীয় বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনাতেও চাপ তৈরি হয়েছে। উৎপাদন ঘাটতি পূরণে বিকল্প উৎস থেকে ব্যয়বহুল বিদ্যুৎ কিনতে হচ্ছে, যার প্রভাব শেষ পর্যন্ত সাধারণ গ্রাহকদের ওপরও পড়ছে।
এদিকে দেশে বিদ্যুতের চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। শিল্প, কৃষি ও নগরজীবনে বিদ্যুতের ওপর নির্ভরতা যত বাড়ছে, ততই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর নিরবচ্ছিন্ন উৎপাদন। এমন বাস্তবতায় শাহজীবাজার বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো প্রকল্পের দীর্ঘ অচলাবস্থা সরকারের জন্য যেমন বড় আর্থিক চাপ, তেমনি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্যও উদ্বেগের বিষয়।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, দ্রুত ও কার্যকর সংস্কার উদ্যোগ ছাড়া এই ক্ষতি কমানো সম্ভব নয়। একইসঙ্গে প্রকল্প বাস্তবায়নে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এবং কারিগরি ত্রুটির প্রকৃত কারণ খুঁজে বের করাও জরুরি। অন্যথায় হাজার হাজার কোটি টাকার এই প্রকল্প ভবিষ্যতেও দেশের জন্য এক বড় আর্থিক বোঝা হয়ে থাকবে।


