প্রকাশ: ২৫ মে ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সিলেটে ইউরোপে পাঠানোর নামে ভয়াবহ প্রতারণার অভিযোগে চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়েছে। উচ্চ বেতনের চাকরি, দ্রুত ভিসা এবং স্বপ্নের ইউরোপযাত্রার আশ্বাস দিয়ে শত শত তরুণের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে ‘অ্যামেক্স এসোসিয়েটস’ নামের একটি কনসালট্যান্সি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে। অভিযোগ অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটির দুই মূল কর্ণধার রাজনৈতিক পরিচয় ও সামাজিক প্রভাব ব্যবহার করে প্রায় সাতশ মানুষের কাছ থেকে অন্তত সাত কোটি টাকা সংগ্রহের পর গা-ঢাকা দিয়েছেন। এ ঘটনায় নগরজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে।
সিলেট নগরের উপশহরের সি-ব্লকের ৩৭ নম্বর রোডের ৪/এ নম্বর বাসায় পরিচালিত হতো ‘অ্যামেক্স এসোসিয়েটস’। পাশাপাশি ‘ফ্যামেক্স’ ও ‘ট্যাক্সকম’ নামে আরও দুটি সহযোগী প্রতিষ্ঠান চালু করা হয়। ২০২৪ সালের শেষ দিকে প্রতিষ্ঠানটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে লোক পাঠানোর বিজ্ঞাপন প্রচার শুরু করে। বিশেষ করে পর্তুগাল, কানাডাসহ কয়েকটি দেশে দ্রুত ভিসা ও বৈধ কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ফেসবুকে নিয়মিত ভিডিও ও প্রচারণা চালানো হতো। অভিযোগ রয়েছে, ভুয়া ভিসা, সাজানো ফটোসেশন এবং বিদেশে পাঠানো হয়েছে—এমন মিথ্যা তথ্য প্রচার করে সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জনের চেষ্টা করা হয়।
অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুব সংগঠন জাতীয় যুবশক্তির সাবেক সিলেট আহ্বায়ক জাবের আহমদ এবং মহানগর ছাত্রদলের সদস্য পরিচয়ে পরিচিত ইমন উদ্দিন। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, তারা রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে তোলা ছবি ব্যবহার করে নিজেদের প্রভাবশালী হিসেবে উপস্থাপন করতেন। এতে সহজেই মানুষ তাদের ওপর আস্থা স্থাপন করে বিপুল অঙ্কের টাকা জমা দেন।
ভুক্তভোগীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ইউরোপে পাঠানোর আশ্বাসে প্রত্যেকের কাছ থেকে এক লাখ থেকে পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়। কেউ অফিসে গিয়ে সরাসরি টাকা দিয়েছেন, আবার অনেকে বিভিন্ন এজেন্টের মাধ্যমে অর্থ পরিশোধ করেছেন। অভিযোগ রয়েছে, প্রায় সাতশ তরুণ ও যুবকের কাছ থেকে ধাপে ধাপে এই অর্থ সংগ্রহ করা হয়। পর্তুগালের জন্য এক লাখ টাকা এবং কানাডার জন্য দেড় থেকে দুই লাখ টাকা পর্যন্ত অগ্রিম নেওয়া হতো। চার থেকে ছয় মাসের মধ্যে ভিসা সম্পন্ন হবে বলে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও এক বছরের বেশি সময় পার হলেও অধিকাংশ আবেদনকারীর কোনো অগ্রগতি হয়নি।
প্রতারণার বিষয়টি স্পষ্ট হতে শুরু করলে অনেকে টাকা ফেরত চাইতে অফিসে যেতে থাকেন। কিন্তু তখনই পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নেয় বলে অভিযোগ করেন ভুক্তভোগীরা। কেউ কেউ দাবি করেছেন, টাকা ফেরতের দাবি তুললে তাদের ভয়ভীতি দেখানো হতো। রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে মামলা, হামলা কিংবা সামাজিকভাবে হয়রানির হুমকি দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
কোম্পানীগঞ্জের ফারহান আহমদ নামের এক ভুক্তভোগী জানান, তিনি এক বছর আগে পর্তুগাল যাওয়ার জন্য এক লাখ টাকা জমা দেন। দীর্ঘদিনেও কোনো অগ্রগতি না হওয়ায় টাকা ফেরতের জন্য অফিসে গেলে কয়েকজন যুবক তাকে ঘিরে ধরে ভয়ভীতি দেখায়। এমনকি অস্ত্র প্রদর্শন করেও হুমকি দেওয়া হয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক ভুক্তভোগী বলেন, গত মাসে অফিসে গিয়ে টাকার জন্য চাপ দিলে তাকে নারীদের মাধ্যমে হয়রানির মামলায় ফাঁসিয়ে দেওয়ার ভয় দেখানো হয়। এসব কারণে অনেকেই আতঙ্কে প্রকাশ্যে মুখ খুলতে সাহস পাননি।
এদিকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে বুঝতে পেরে গত ১৯ মে প্রতিষ্ঠানটির অফিস তালাবদ্ধ করে গা-ঢাকা দেন জাবের ও ইমন। একইসঙ্গে তাদের পরিচালিত ফেসবুক পেজও বন্ধ বা ডিজলভ করা হয়। অভিযোগ উঠেছে, তারা বিদেশে পালিয়ে যাওয়ারও চেষ্টা করেন। তবে পুলিশের একটি সূত্র জানিয়েছে, ছাত্রদল নেতা পরিচয়ধারী ইমন উদ্দিনের বিদেশ যাত্রা ঠেকাতে তার পাসপোর্ট ব্লক করা হয়েছে।
প্রতারণার ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়ে ভুক্তভোগীদের একটি দল নগরীর কুমারপাড়ায় প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরীর বাসভবনে গিয়ে জড়ো হন। সেখানে তারা ঘটনার বিস্তারিত তুলে ধরে প্রতিকার চান। পরে মন্ত্রীর নির্দেশনায় পুলিশ প্রশাসন বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে বলে জানা গেছে।
এরপর সিলেট মহানগরীর শাহপরাণ থানায় প্রতারণার অভিযোগে মামলা দায়ের করেন ভুক্তভোগী নিয়াজুর রহমান। মামলায় জাবের ও ইমনসহ আরও কয়েকজনকে আসামি করা হয়। মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, ইউরোপের বিভিন্ন দেশে পাঠানোর নামে অন্তত সাত কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। মামলার পর পুলিশ অভিযানে নেমে দুজনকে আটক করেছে বলে নিশ্চিত করেছে সংশ্লিষ্ট সূত্র।
ভুক্তভোগীরা বলছেন, বিদেশে যাওয়ার স্বপ্ন দেখিয়ে তাদের সঙ্গে পরিকল্পিতভাবে প্রতারণা করা হয়েছে। অনেকেই জমি বিক্রি, ঋণ গ্রহণ কিংবা আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে ধার করে টাকা জোগাড় করেছিলেন। এখন তারা চরম আর্থিক ও মানসিক সংকটে পড়েছেন।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে জাবের আহমদ ও ইমন উদ্দিনের ব্যক্তিগত মোবাইল নম্বরসহ প্রতিষ্ঠানের একাধিক নম্বরে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সবগুলো বন্ধ পাওয়া যায়।
এদিকে রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকেও নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করা হয়েছে। সিলেট মহানগর ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক ফজলে রাব্বী আহসান বলেন, “ইমন উদ্দিন দলের কেউ নন। কেউ যদি নেতাদের ছবি ব্যবহার করে অপকর্ম করে, তার দায় ব্যক্তিকেই নিতে হবে।” অন্যদিকে এনসিপির এক নেতা জানান, নানা অভিযোগের কারণে জাবের আহমদকে আগেই সংগঠন থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছিল।
সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার আব্দুল কুদ্দুছ চৌধুরী বলেছেন, বিদেশে পাঠানোর নামে প্রতারণার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ইতোমধ্যে দুজনকে আটক করা হয়েছে এবং পুরো চক্রকে শনাক্তে তদন্ত চলছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, বিদেশে যাওয়ার প্রবল আগ্রহ এবং দ্রুত সফল হওয়ার আকাঙ্ক্ষাকে কাজে লাগিয়ে একটি সংঘবদ্ধ চক্র দীর্ঘদিন ধরে এ ধরনের প্রতারণা চালিয়ে আসছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আকর্ষণীয় প্রচারণা, রাজনৈতিক পরিচয় এবং সাজানো সফলতার গল্প ব্যবহার করে সাধারণ মানুষকে ফাঁদে ফেলা হচ্ছে। তাই বিদেশগামীদের অবশ্যই সরকার অনুমোদিত রিক্রুটিং এজেন্সি ও বৈধ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আবেদন করার পরামর্শ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
সিলেটের আলোচিত এই ঘটনায় এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—প্রতারিত শত শত মানুষের টাকা আদৌ ফেরত পাওয়া যাবে কি না। সেই সঙ্গে পুরো চক্রের পেছনে আর কারা রয়েছে, সেটিও জানতে চায় নগরবাসী।


