প্রকাশ: ২৫ মে ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জে গভীর রাতে র্যাবের একটি অভিযানে বিপুল পরিমাণ গাঁজাসহ দুইজনকে গ্রেফতারের ঘটনা স্থানীয় এলাকায় ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে গোপনে মাদক ব্যবসা চালানোর অভিযোগের ভিত্তিতে পরিচালিত ওই অভিযানে একটি বসতঘরের শয়নকক্ষের খাটের নিচ থেকে উদ্ধার করা হয় ২৯ কেজি গাঁজা। র্যাব বলছে, উদ্ধার হওয়া মাদকের বাজারমূল্য উল্লেখযোগ্য এবং এ ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা দায়ের করা হয়েছে।
রবিবার (২৪ মে) রাত আনুমানিক পৌণে ১০টার দিকে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব-৯) এর একটি আভিযানিক দল শায়েস্তাগঞ্জ উপজেলার কদমতলী এলাকায় অভিযান পরিচালনা করে। অভিযানে গ্রেফতার হন হবিগঞ্জ জেলার চুনারুঘাট থানার বরোমপুর এলাকার মৃত আলফু মিয়ার ছেলে মো. কালাম মিয়া (৬০) এবং একই এলাকার জাবেদ মিয়ার স্ত্রী আনোয়ারা আন্না (২৪)।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরেই ওই এলাকায় গোপনে মাদক কেনাবেচার অভিযোগ ছিল। বিশেষ করে রাতের বেলায় অপরিচিত ব্যক্তিদের যাতায়াত বৃদ্ধি পাওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে সন্দেহ তৈরি হয়। বিষয়টি নিয়ে নানা সময়ে আলোচনা হলেও কেউ প্রকাশ্যে মুখ খুলতে সাহস পাননি। পরে র্যাবের গোয়েন্দা নজরদারিতে বিষয়টি গুরুত্ব পায় এবং তথ্য যাচাই শেষে অভিযান পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
র্যাব-৯ সূত্র জানায়, শায়েস্তাগঞ্জ ক্যাম্পের একটি দল নতুন ব্রিজ এলাকায় অবস্থানকালে গোপন সংবাদের মাধ্যমে জানতে পারে, শায়েস্তাগঞ্জ ইউনিয়নের কদমতলী এলাকায় জাবেদ মিয়ার বাড়িতে কয়েকজন ব্যক্তি মাদক ক্রয়-বিক্রয়ের উদ্দেশ্যে অবস্থান করছে। তথ্য পাওয়ার পরপরই র্যাব সদস্যরা কৌশলগতভাবে ওই বাড়ি ঘিরে ফেলেন। রাত আনুমানিক ৯টা ৫৫ মিনিটে অভিযান শুরু হলে র্যাবের উপস্থিতি টের পেয়ে কয়েকজন পালানোর চেষ্টা করেন। তবে ঘটনাস্থল থেকে কালাম মিয়া ও আনোয়ারা আন্নাকে আটক করা হয়।
র্যাবের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আটক ব্যক্তিরা নিজেদের কাছে গাঁজা থাকার বিষয়টি স্বীকার করেন। পরে তাদের দেখানো মতে ঘরের ভেতর তল্লাশি চালিয়ে শয়নকক্ষের খাটের নিচে রাখা তিনটি প্লাস্টিকের বস্তা উদ্ধার করা হয়। বস্তাগুলোর ভেতরে নীল পলিথিন ও খাকি রঙের স্কচটেপে মোড়ানো অবস্থায় গাঁজা রাখা ছিল। উদ্ধার হওয়া গাঁজার পরিমাণ ছিল মোট ২৯ কেজি। এর মধ্যে কালাম মিয়ার হেফাজত থেকে ২০ কেজি এবং আনোয়ারা আন্নার হেফাজত থেকে ৯ কেজি গাঁজা জব্দ করা হয়েছে বলে জানানো হয়।
অভিযানের খবর ছড়িয়ে পড়লে আশপাশের এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। স্থানীয় অনেকেই গভীর রাতে ঘটনাস্থলে জড়ো হন। কেউ কেউ জানান, এলাকায় মাদক বিস্তারের কারণে তরুণ সমাজ ধ্বংসের মুখে পড়ছে। বিশেষ করে সীমান্তবর্তী বিভিন্ন এলাকা থেকে মাদক এনে জেলার বিভিন্ন স্থানে সরবরাহের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। স্থানীয় সচেতন মহল মনে করছে, এ ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকলে মাদক ব্যবসায়ীদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হবে এবং তরুণদের রক্ষা করা সম্ভব হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মাদক শুধু ব্যক্তিকে নয়, একটি সমাজকেও ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়। পারিবারিক অশান্তি, অপরাধপ্রবণতা, কিশোর গ্যাং, ছিনতাই এবং নানা সামাজিক অবক্ষয়ের পেছনে মাদকের বড় ভূমিকা রয়েছে। হবিগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়মিত অভিযান চললেও মাদক চক্র প্রায়ই নতুন কৌশল অবলম্বন করে সক্রিয় থাকার চেষ্টা করে। ফলে গোয়েন্দা নজরদারি ও স্থানীয় জনগণের সহযোগিতা ছাড়া এ সমস্যা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে, র্যাব-৯ এর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (মিডিয়া) কে এম শহিদুল ইসলাম সোহাগ এক বিবৃতিতে জানান, গ্রেফতারকৃত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮ এর সংশ্লিষ্ট ধারায় মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে। পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য গ্রেফতারকৃত দুইজন এবং উদ্ধার হওয়া আলামত শায়েস্তাগঞ্জ থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, মাদকের বিরুদ্ধে সরকারের ঘোষিত ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি বাস্তবায়নে র্যাব-৯ নিয়মিত গোয়েন্দা তৎপরতা পরিচালনা করছে। শুধু বড় মাদক কারবারিই নয়, এর সঙ্গে জড়িত প্রতিটি পর্যায়ের ব্যক্তিকে আইনের আওতায় আনতে অভিযান অব্যাহত থাকবে। সমাজকে মাদকমুক্ত রাখতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি সচেতন নাগরিকদেরও এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, সম্প্রতি হবিগঞ্জ অঞ্চলে মাদকবিরোধী অভিযানের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে শায়েস্তাগঞ্জ, চুনারুঘাট ও আশপাশের এলাকায় র্যাব ও পুলিশের একাধিক অভিযানে ইয়াবা, গাঁজা ও অন্যান্য মাদক উদ্ধার হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দাবি, সীমান্ত ও আঞ্চলিক রুট ব্যবহার করে মাদক পরিবহনকারীরা সক্রিয় থাকলেও গোয়েন্দা নজরদারি জোরদারের মাধ্যমে তাদের শনাক্ত করা হচ্ছে।
মাদকবিরোধী সামাজিক আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা মনে করছেন, শুধু গ্রেফতার করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। তরুণদের খেলাধুলা, শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করার পাশাপাশি পরিবারভিত্তিক সচেতনতা বৃদ্ধি করাও জরুরি। কারণ মাদক ব্যবসার বিস্তারের পেছনে বেকারত্ব, সামাজিক অস্থিরতা ও অপরাধচক্রের প্রভাবও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
শায়েস্তাগঞ্জে র্যাবের এই অভিযান আবারও প্রমাণ করেছে যে, গোপনে পরিচালিত মাদক ব্যবসার বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কঠোর অবস্থানে রয়েছে। স্থানীয় জনগণও আশা করছে, এ ধরনের অভিযান নিয়মিত পরিচালিত হলে মাদকের ভয়াবহ বিস্তার কিছুটা হলেও নিয়ন্ত্রণে আসবে এবং তরুণ প্রজন্ম নিরাপদ ভবিষ্যতের পথে এগিয়ে যেতে পারবে।


