প্রকাশ: ২৪ মে ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সিলেট বিভাগে হামের সংক্রমণ ও এর উপসর্গে শিশুমৃত্যুর হার উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। গত কয়েক সপ্তাহে পরিস্থিতি ক্রমেই অবনতির দিকে যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা। বিশেষ করে ৮ মাস থেকে শুরু করে ছোট শিশুদের মধ্যে এই রোগের প্রভাব সবচেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে, যা নিয়ে অভিভাবক ও চিকিৎসকদের মধ্যে চরম উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
সর্বশেষ রবিবার (২৪ মে) হামের উপসর্গে আরও একটি শিশুর মৃত্যু হয়েছে। শিশুটির বাড়ি দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলায়। বয়স ছিল মাত্র ৮ মাস। চিকিৎসাধীন অবস্থায় শিশুটি সিলেট শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে মারা যায়। স্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষ থেকে বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সিলেট বিভাগীয় কার্যালয়ের সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সিলেট বিভাগে এখন পর্যন্ত হামে আক্রান্ত ও উপসর্গজনিত কারণে মোট ৫২ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এই সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে, যা জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতিকে আরও সংকটময় করে তুলছে।
প্রতিবেদনে আরও জানানো হয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় সিলেট বিভাগের বিভিন্ন হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হয়েছে ৭৩ জন শিশু। বর্তমানে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৯৯ জনে। একই সময়ে পরীক্ষায় একজন নতুন রোগীর দেহে হাম শনাক্ত হয়েছে।
চিকিৎসকদের মতে, হামের সংক্রমণ শিশুদের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ একটি রোগ, বিশেষ করে যাদের টিকা নেওয়া হয়নি বা যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম। সময়মতো চিকিৎসা না পেলে এটি নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া এবং মস্তিষ্কে জটিলতার মতো মারাত্মক পরিণতি ডেকে আনতে পারে।
সিলেটের চিকিৎসকরা বলছেন, বর্তমানে যেসব শিশু হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে তাদের বড় একটি অংশই গুরুতর উপসর্গ নিয়ে আসছে। অনেক ক্ষেত্রেই দেরিতে হাসপাতালে আনার কারণে জটিলতা বাড়ছে এবং মৃত্যুঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই পরিস্থিতির পেছনে টিকাদান কর্মসূচিতে কিছু ঘাটতি, জনসচেতনতার অভাব এবং গ্রামীণ এলাকায় স্বাস্থ্যসেবায় সীমাবদ্ধতা বড় ভূমিকা রাখছে। বিশেষ করে দূরবর্তী অঞ্চলে অনেক শিশু এখনো নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির আওতার বাইরে রয়েছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, শিশু রোগীদের চাপ বাড়ার কারণে চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে। শয্যা সংকট, ওষুধের চাহিদা বৃদ্ধি এবং চিকিৎসক ও নার্সদের ওপর কাজের চাপও অনেক বেড়ে গেছে।
এদিকে স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে জরুরি ভিত্তিতে টিকাদান কর্মসূচি জোরদার করা হচ্ছে। পাশাপাশি নতুন করে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করে বিশেষ ক্যাম্পেইন চালানোর পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে।
অভিভাবকদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। অনেকেই সন্তানদের নিয়ে দ্রুত হাসপাতালে ছুটছেন, আবার কেউ কেউ আগেভাগেই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের চেষ্টা করছেন। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আতঙ্ক নয় বরং সচেতনতা ও সময়মতো টিকাদানই এই রোগ প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালের এক চিকিৎসক জানান, হামের মতো সংক্রামক রোগে দ্রুত চিকিৎসা ও পর্যবেক্ষণ অত্যন্ত জরুরি। বিলম্ব হলে শিশুর জীবনঝুঁকি অনেকাংশে বেড়ে যায়। তিনি অভিভাবকদের প্রতি আহ্বান জানান, কোনো উপসর্গ দেখা দিলে দেরি না করে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে আসতে।
স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, পরিস্থিতি এখনো নিয়ন্ত্রণের বাইরে নয়, তবে দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে এটি আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। তাই স্থানীয় প্রশাসন, স্বাস্থ্যকর্মী এবং জনগণকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সঠিক টিকাদান কাভারেজ নিশ্চিত করা গেলে এই ধরনের রোগের বিস্তার অনেকাংশে রোধ করা সম্ভব। পাশাপাশি গ্রামীণ পর্যায়ে স্বাস্থ্য শিক্ষা ও সচেতনতা বাড়ানো জরুরি।
সব মিলিয়ে সিলেট বিভাগে হামের সংক্রমণ এখন একটি গুরুতর জনস্বাস্থ্য সংকটে রূপ নিয়েছে। শিশু মৃত্যুর ক্রমবর্ধমান সংখ্যা এবং হাসপাতালে রোগীর চাপ পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে। দ্রুত ও সমন্বিত উদ্যোগ না নিলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে বলে সতর্ক করছেন চিকিৎসক ও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।


