প্রকাশ: ১৬ জুলাই ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সিলেট বিভাগে হাম পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক রূপ নিয়েছে। হামের উপসর্গ এবং নিউমোনিয়াজনিত জটিলতায় আক্রান্ত হয়ে আট মাস বয়সী আরও এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ৯২ জন রোগী বিভাগের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। স্বাস্থ্য বিভাগের সর্বশেষ তথ্য বলছে, চলতি বছরের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত হামে সন্দেহজনক ও নিশ্চিত মিলিয়ে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯৬ জন। নতুন আক্রান্ত ও হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা পরিস্থিতিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছেন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সিলেট বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, মারা যাওয়া শিশুটির নাম আরিয়ান আহমদ। তার বয়স ছিল মাত্র আট মাস। সে সিলেটের জকিগঞ্জ উপজেলার বাসিন্দা আল আমিনের ছেলে। গত ২৪ ঘণ্টায় সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) শিশুটির মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সিলেট বিভাগের পরিচালক ডা. মাহবুবুল আলম।
স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, শিশুটি হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল। পরে তার শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি হলে নিউমোনিয়াজনিত জটিলতা দেখা দেয়। চিকিৎসকরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করলেও শেষ পর্যন্ত তাকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি। হামের কারণে শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়লে নিউমোনিয়াসহ বিভিন্ন জটিলতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। বিশেষ করে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু এবং অপুষ্টিতে ভোগা শিশুদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি আরও বেশি।
চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত সিলেট বিভাগে পরীক্ষাগারে নিশ্চিত হওয়া হাম রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫১২ জন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়েছেন সুনামগঞ্জ জেলার বাসিন্দারা। জেলাটিতে নিশ্চিত হাম রোগীর সংখ্যা ২৭২ জন। সিলেট জেলায় শনাক্ত হয়েছেন ১৭২ জন, হবিগঞ্জে ৫১ জন, যার মধ্যে দুইজনের রুবেলা শনাক্ত হয়েছে, এবং মৌলভীবাজারে শনাক্ত হয়েছেন ১৭ জন।
স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্যে দেখা গেছে, গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন ভর্তি হওয়া ৯২ জন রোগীর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভর্তি হয়েছেন সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে। এর বাইরে লায়ন্স হাসপাতাল, বিশ্বনাথ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, মৌলভীবাজার জেলা সদর হাসপাতাল এবং সুনামগঞ্জ জেলা সদর হাসপাতালেও নতুন রোগী ভর্তি হয়েছেন। প্রতিদিনই নতুন রোগী হাসপাতালে আসায় চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে।
বর্তমানে বিভাগের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে মোট ২৬৬ জন রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এর মধ্যে শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে ১১০ জন এবং এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৮৩ জন ভর্তি আছেন। এছাড়া রাগীব-রাবেয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, মাউন্ট এডোরা হাসপাতাল, নর্থ ইস্ট মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, লায়ন্স হাসপাতাল, বিশ্বনাথ, ফেঞ্চুগঞ্জ ও গোলাপগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, সুনামগঞ্জ জেলা সদর হাসপাতাল, হবিগঞ্জ জেলা সদর হাসপাতাল এবং মৌলভীবাজার জেলা সদর হাসপাতালেও আক্রান্ত রোগীরা চিকিৎসা নিচ্ছেন।
পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সিলেট বিভাগের চার জেলার মধ্যে মৃত্যুর সংখ্যায় সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে সুনামগঞ্জ। সেখানে এখন পর্যন্ত ৪৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। সিলেট জেলায় প্রাণ হারিয়েছেন ৩৪ জন, মৌলভীবাজারে ১১ জন এবং হবিগঞ্জে ৮ জন। স্বাস্থ্য বিভাগের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব মৃত্যুর মধ্যে সন্দেহজনক ও পরীক্ষায় নিশ্চিত হওয়া হামে আক্রান্ত রোগী উভয়ই অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ। আক্রান্ত ব্যক্তি হাঁচি-কাশির মাধ্যমে খুব সহজেই অন্যদের মধ্যে ভাইরাস ছড়িয়ে দিতে পারেন। রোগের শুরুতে জ্বর, কাশি, সর্দি, চোখ লাল হয়ে যাওয়া এবং পরে শরীরজুড়ে লালচে র্যাশ দেখা দেয়। অনেক ক্ষেত্রে সময়মতো চিকিৎসা না হলে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, মস্তিষ্কের সংক্রমণসহ বিভিন্ন জটিলতা তৈরি হতে পারে। শিশুদের ক্ষেত্রে এসব জটিলতা প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, হাম প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো সময়মতো টিকাদান নিশ্চিত করা। জাতীয় টিকাদান কর্মসূচির আওতায় শিশুদের নির্ধারিত বয়সে হাম-রুবেলা টিকা গ্রহণ করলে রোগের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসে। পাশাপাশি আক্রান্ত ব্যক্তিকে আলাদা রাখা, পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা, পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ এবং উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার ওপরও গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ইতোমধ্যে আক্রান্ত এলাকাগুলোতে রোগী শনাক্তকরণ, নজরদারি জোরদার এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নিয়েছে। পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসন ও স্বাস্থ্যকর্মীদের মাধ্যমে জনসচেতনতা বৃদ্ধির কার্যক্রমও চালানো হচ্ছে। অভিভাবকদের উদ্দেশ্যে বারবার আহ্বান জানানো হচ্ছে, কোনো শিশুর জ্বরের সঙ্গে শরীরে র্যাশ বা হামের উপসর্গ দেখা দিলে অবহেলা না করে দ্রুত নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে যেতে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সিলেট বিভাগের পরিচালক ডা. মাহবুবুল আলম বলেছেন, হামের উপসর্গ ও নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে আরও এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ৯২ জন রোগী বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। বিভাগজুড়ে পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং আক্রান্তদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট হাসপাতালগুলোকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় শুধু হাসপাতালভিত্তিক চিকিৎসা নয়, বরং প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার ওপর আরও বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। টিকাদান কর্মসূচির আওতা বাড়ানো, প্রত্যন্ত অঞ্চলে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং দ্রুত রোগ শনাক্ত করে চিকিৎসা নিশ্চিত করা গেলে সংক্রমণ ও মৃত্যুর হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে সাধারণ মানুষকে গুজব বা বিভ্রান্তিকর তথ্য এড়িয়ে স্বাস্থ্য বিভাগের নির্দেশনা মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।


