প্রকাশ: ২৫ এপ্রিল ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সিলেট বিভাগে হামের সংক্রমণ পরিস্থিতি ক্রমেই উদ্বেগজনক আকার ধারণ করছে। প্রতিদিন নতুন নতুন রোগী শনাক্ত হওয়ার পাশাপাশি বাড়ছে মৃত্যুর সংখ্যা। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় আরও তিন শিশুর মৃত্যুতে পুরো অঞ্চলে স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে নতুন করে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিস্থিতি এখনই নিয়ন্ত্রণে না আনা গেলে এটি আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।
স্বাস্থ্য বিভাগ ও হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, শুক্রবার সকাল থেকে রাত পর্যন্ত সিলেটের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। মৃত শিশুরা সবাই জটিল শারীরিক অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি ছিল এবং তাদের শরীরে হামজনিত জটিলতা ছাড়াও অন্যান্য গুরুতর সংক্রমণ দেখা দিয়েছিল।
সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পেডিয়াট্রিক ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে (পিআইসিইউ) ১০ মাস বয়সী আরিফ নামে এক শিশুর মৃত্যু হয় সকাল ১০টা ৫ মিনিটে। চিকিৎসকদের মতে, শিশুটি হাম ও ব্রংকোনিউমোনিয়ায় আক্রান্ত ছিল। অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটে এবং শরীরে একাধিক জটিল উপসর্গ দেখা দেয়।
একই দিন রাত ৮টা ১৫ মিনিটে সুনামগঞ্জ জেলার ৫ মাস বয়সী তৌফিক নামে আরেক শিশুর মৃত্যু হয়। চিকিৎসা নথি অনুযায়ী, সে হাম ছাড়াও হৃদরোগজনিত জটিলতা, নিউমোনিয়া এবং ক্রুপ রোগে আক্রান্ত ছিল। দীর্ঘ চিকিৎসার পরও তার অবস্থার উন্নতি হয়নি।
রাত সাড়ে ৯টার দিকে আরও এক মর্মান্তিক মৃত্যু ঘটে ৯ মাস বয়সী শিশু হুমায়রার। হাসপাতাল সূত্র বলছে, শিশুটির শরীরে হামের উপসর্গ ছিল এবং জটিল সংক্রমণের কারণে তার শারীরিক অবস্থাও সংকটাপন্ন ছিল।
এ নিয়ে সিলেটে হামের কারণে সরাসরি ও উপসর্গজনিত মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে আটজনে। স্বাস্থ্যকর্মীরা বলছেন, এটি এখন আর সাধারণ পরিস্থিতি নয়, বরং একটি সতর্ক সংকেত।
সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল উমর রাশেদ মুনির জানান, মৃত শিশু আরিফ হেমোরেজিক হাম বা ‘ব্ল্যাক হাম’-এর জটিল রূপে আক্রান্ত হতে পারে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। তিনি বলেন, শিশুটির শরীরে উচ্চ জ্বর, কালো মল, নাক দিয়ে কালচে তরল বের হওয়া এবং শকের লক্ষণ দেখা দিয়েছিল। পরীক্ষার জন্য নমুনা পাঠানো হয়েছে।
অন্যদিকে, তৌফিকের ক্ষেত্রে একাধিক জটিলতা একসঙ্গে কাজ করেছে বলে জানান চিকিৎসকরা। তিনি জানান, শিশুটি অনেক আগেই হাসপাতালে ভর্তি ছিল এবং ধীরে ধীরে তার শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আরও জানিয়েছে, গত কয়েকদিন ধরে রোগীর চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। শুধু মৃত্যুই নয়, প্রতিদিন নতুন করে শতাধিক শিশু হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে।
সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় সিলেট বিভাগে নতুন করে ১০ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে। একই সময়ে ৫৮ জন নতুন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। বর্তমানে বিভিন্ন হাসপাতালে প্রায় ১৬০ জন রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি রোগী ভর্তি আছেন শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে, যেখানে ৮৩ জন শিশু চিকিৎসা নিচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিস্থিতি জনস্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক। সময়মতো টিকাদান কর্মসূচি জোরদার না হলে এবং আক্রান্তদের দ্রুত শনাক্ত ও চিকিৎসা নিশ্চিত না করলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।
একজন শিশু রোগ বিশেষজ্ঞ বলেন, হাম একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগ হলেও টিকাদানে ঘাটতি থাকলে এটি প্রাণঘাতী রূপ নিতে পারে। বিশেষ করে অপুষ্টি ও দুর্বল রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন শিশুদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি বেশি।
সিলেট অঞ্চলে সাম্প্রতিক সময়ে স্বাস্থ্যসেবার ওপর চাপ বাড়ায় চিকিৎসক ও নার্সদের ওপরও বাড়তি চাপ পড়েছে বলে জানা গেছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সীমিত সম্পদ ও জনবল নিয়েও তারা সর্বোচ্চ সেবা দেওয়ার চেষ্টা করছেন।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এখনই জরুরি ভিত্তিতে গণটিকাদান কর্মসূচি, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ ব্যবস্থা জোরদার করা প্রয়োজন। না হলে এই সংক্রমণ আরও বিস্তৃত হতে পারে এবং শিশু মৃত্যুর সংখ্যা বাড়তে পারে।
অভিভাবকদেরও সচেতন হওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিশুদের নিয়মিত টিকা গ্রহণ নিশ্চিত করা এবং উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
সিলেটে হামের এই ভয়াবহ পরিস্থিতি এখন জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য বড় একটি পরীক্ষা হিসেবে দেখা দিচ্ছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দ্রুত ও সমন্বিত উদ্যোগ না নিলে সংকট আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।


