প্রকাশ: ১১ জুন ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সিলেটের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত কিনব্রিজ, চাঁদনীঘাট, আলী আমজদের ঘড়ি এবং সারদা হল সংলগ্ন এলাকাকে ‘ছিলটি ঐতিহ্য চত্বর’ নামে ঘোষণা করার দাবি উঠেছে। একই সঙ্গে এই ঐতিহাসিক এলাকাটিকে নিরাপদ, পর্যটকবান্ধব ও দৃষ্টিনন্দন করে গড়ে তুলতে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছে সাংস্কৃতিক সংগঠন হাছন রাজা লোকসাহিত্য ও সংস্কৃতি পরিষদ।
বৃহস্পতিবার (১১ জুন) দুপুরে সিলেট সিটি কর্পোরেশনের নগরভবনে গিয়ে সংগঠনটির কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ সিসিক প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরীর হাতে একটি স্মারকলিপি তুলে দেন। স্মারকলিপিতে তারা দাবি করেন, সিলেটের ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শনগুলোকে কেন্দ্র করে একটি সমন্বিত ঐতিহ্য চত্বর গড়ে তোলা হলে তা শুধু নগরবাসীর গর্বের প্রতীকই হবে না, বরং দেশি-বিদেশি পর্যটকদের জন্যও আকর্ষণীয় গন্তব্যে পরিণত হবে।
স্মারকলিপিতে উল্লেখ করা হয়, সুরমা নদীর বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা শতবর্ষী কিনব্রিজ কেবল একটি সেতু নয়; এটি সিলেটের ইতিহাসের নীরব সাক্ষী। ব্রিটিশ আমলে নির্মিত এই সেতু বহু প্রজন্মের স্মৃতি ও আবেগের অংশ হয়ে উঠেছে। অন্যদিকে হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর স্মৃতিবিজড়িত চাঁদনীঘাট ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব বহন করে। পৃথিমপাশার জমিদার পরিবারের উদ্যোগে নির্মিত আলী আমজদের ঘড়ি সময়ের সাক্ষ্য বহনকারী একটি ঐতিহাসিক স্থাপনা হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে সিলেটের পরিচয়ের অংশ হয়ে আছে। আর সারদা হল বহু দশক ধরে সাহিত্য, নাটক ও সংস্কৃতিচর্চার প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত।
এসব স্থাপনা ঘিরে প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আগত দর্শনার্থীদের পাশাপাশি বিদেশি পর্যটকদেরও উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, ঐতিহ্যের এই কেন্দ্রস্থল দীর্ঘদিন ধরে নানা সামাজিক ও নিরাপত্তাজনিত সমস্যার মুখোমুখি। স্মারকলিপিতে অভিযোগ করা হয়, এলাকাজুড়ে ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মাদকসেবন, ভাসমান অনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং কথিত মলম পার্টির তৎপরতা বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে। সন্ধ্যার পর অনেক দর্শনার্থী ও পরিবার এ এলাকায় চলাচলে অনীহা প্রকাশ করেন।
এছাড়া সার্কিট হাউস সংলগ্ন সড়কে ট্রাক, পিকআপ ভ্যান ও অন্যান্য ভারী যানবাহনের অবৈধ অবস্থান এবং চালকদের বেপরোয়া আচরণের কারণে পথচারী ও পর্যটকদের দুর্ভোগ চরম আকার ধারণ করেছে বলে দাবি করা হয়। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোর সৌন্দর্য ও পরিবেশ নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি সড়ক নিরাপত্তাও হুমকির মুখে পড়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে ওই এলাকায় সংঘটিত র্যাব সদস্য ইমন আচার্য হত্যাকাণ্ডের ঘটনাও স্মারকলিপিতে উল্লেখ করা হয়। সংগঠনের নেতারা মনে করেন, এমন ঘটনা নগরবাসীর উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে এবং দ্রুত কার্যকর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।
স্মারকলিপিতে ঐতিহ্য চত্বর ঘোষণার পাশাপাশি বেশ কয়েকটি বাস্তবসম্মত প্রস্তাবও তুলে ধরা হয়। তারা দাবি জানান, ঐতিহ্যবাহী এই এলাকা থেকে ট্রাক, পিকআপ ও অন্যান্য ভারী যানবাহনের স্থায়ী অপসারণ নিশ্চিত করতে হবে। সারদা হল প্রাঙ্গণে সিটি কর্পোরেশনের পার্কিংয়ের জন্য রাখা যানবাহন অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নিতে হবে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এলাকায় একটি স্থায়ী পুলিশ ক্যাম্প স্থাপন করতে হবে এবং সরকারি উদ্যোগে সমন্বিত সৌন্দর্যবর্ধন ও আধুনিক উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে হবে।
স্মারকলিপি গ্রহণ করে সিসিক প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী বলেন, “কিনব্রিজ, আলী আমজদের ঘড়ি, চাঁদনীঘাট ও সারদা হল সিলেটের গৌরবের প্রতীক। এসব স্থাপনার সংরক্ষণ এবং এলাকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা আমাদের দায়িত্ব। নাগরিক সমাজ ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে যে দাবিগুলো উত্থাপন করা হয়েছে, তা অত্যন্ত যৌক্তিক এবং সিসিক এগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবে।”
তিনি আরও বলেন, ঐতিহ্যবাহী এই স্থানগুলোকে পর্যটকবান্ধব ও নিরাপদ পরিবেশে গড়ে তুলতে সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া হবে। উন্নয়ন কার্যক্রমের ক্ষেত্রে স্থানীয় জনগণ, সংস্কৃতিকর্মী ও সচেতন নাগরিকদের মতামতকেও গুরুত্ব দেওয়া হবে বলে তিনি আশ্বাস দেন।
সাংস্কৃতিক বিশ্লেষকদের মতে, আধুনিক নগর উন্নয়নের পাশাপাশি ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক স্থাপনাগুলোর সংরক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একটি শহরের আত্মপরিচয় তার ঐতিহ্যের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে। সঠিক পরিকল্পনা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গেলে সিলেটের এই অঞ্চলটি জাতীয় পর্যায়ের অন্যতম দর্শনীয় ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠতে পারে। এতে পর্যটন শিল্পের বিকাশ ঘটবে, স্থানীয় অর্থনীতিও চাঙা হবে।
স্মারকলিপি প্রদানকালে উপস্থিত ছিলেন হাছন রাজা লোকসাহিত্য ও সংস্কৃতি পরিষদের সভাপতি ড. জহিরুল ইসলাম অচিনপুরী, সিনিয়র সহ-সভাপতি আসাদুজ্জামান নূর, সহ-সভাপতি ও সিনিয়র সাংবাদিক এম এ হান্নান, শাহ মো. আলী রব, আহমেদুর রহমান ইকবাল, সাধারণ সম্পাদক মো. সোলেমান হোসেন চুন্নু, সহ-সাধারণ সম্পাদক সেলিম মিয়া, সাংগঠনিক সম্পাদক (সিলেট বিভাগ) শফিক মিয়া, আলাউদ্দিন হোসেন শাহ, সদস্য জুবের আহমদ সার্জন, সেবুল রেজা এবং সাংবাদিক এম এ ওয়াহিদসহ সংগঠনের অন্যান্য নেতৃবৃন্দ।
সিলেটের অতীতের গৌরব ও ভবিষ্যতের সম্ভাবনাকে একসূত্রে গাঁথতে ‘ছিলটি ঐতিহ্য চত্বর’-এর দাবি এখন শুধু একটি নামকরণের প্রস্তাব নয়; বরং এটি ঐতিহ্য সংরক্ষণ, নাগরিক নিরাপত্তা এবং সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণের একটি সম্মিলিত প্রত্যাশা হয়ে উঠেছে। এখন দেখার বিষয়, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কত দ্রুত এবং কতটা কার্যকরভাবে এই দাবিগুলোর বাস্তবায়নে উদ্যোগ নেয়।


