প্রকাশ: ১১ জুন ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
ফুটবল বিশ্বকাপ শুধু একটি ক্রীড়া আসর নয়; এটি বিশ্বের বিভিন্ন সংস্কৃতি, ভাষা ও মানুষের মিলনমেলা। কোটি কোটি দর্শকের আবেগ, স্বপ্ন আর উচ্ছ্বাসের এই মহাযজ্ঞের সঙ্গে এবার যুক্ত হলো বাংলাদেশের এক তরুণীর নাম। ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর অফিসিয়াল অ্যাম্বাসেডর হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন সুনামগঞ্জের কৃতি সন্তান মাশরাফি চৌধুরী ফাইজা। তার এই অর্জন শুধু একটি ব্যক্তিগত সাফল্য নয়, বরং বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের সম্ভাবনা ও সক্ষমতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।
সুনামগঞ্জ জেলার দিরাই উপজেলার কুলঞ্জ ইউনিয়নের রাড়ইল গ্রামের শিকড় থেকে উঠে আসা ফাইজার এই সাফল্যে আনন্দ ও গর্বের আবহ তৈরি হয়েছে তার নিজ এলাকায়। পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি আত্মীয়স্বজন, বন্ধু-বান্ধব এবং স্থানীয় বাসিন্দারাও এটিকে বাংলাদেশের জন্য সম্মানের অর্জন হিসেবে দেখছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তাকে অভিনন্দন জানিয়ে অসংখ্য শুভেচ্ছাবার্তা ছড়িয়ে পড়েছে।
বর্তমানে ফাইজা কানাডার ইয়র্ক ইউনিভার্সিটির একজন শিক্ষার্থী। উচ্চশিক্ষার পাশাপাশি তিনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেকে দক্ষ ও আত্মবিশ্বাসী তরুণ প্রতিনিধি হিসেবে গড়ে তুলেছেন। বিশ্বকাপ উপলক্ষে কানাডার টরেন্টো শহরে আয়োজিত বিভিন্ন আন্তর্জাতিক কার্যক্রমে তিনি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছেন। এসব কার্যক্রমে অংশ নিয়ে তিনি বিশ্বকাপ সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক অতিথি, ক্রীড়া সংগঠক, কর্মকর্তা এবং বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদের সঙ্গে সরাসরি কাজ করার সুযোগ পাচ্ছেন।
বিশ্বকাপের মতো বৈশ্বিক আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার অভিজ্ঞতা একজন তরুণ শিক্ষার্থীর জন্য নিঃসন্দেহে অসাধারণ অর্জন। বহুজাতিক পরিবেশে কাজ করার মাধ্যমে নেতৃত্বের দক্ষতা, যোগাযোগের সক্ষমতা এবং সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ তৈরি হয়। ফাইজার ক্ষেত্রেও বিষয়টি ব্যতিক্রম নয়। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করার মাধ্যমে তিনি কেবল নিজের ব্যক্তিগত পরিচিতিই তৈরি করছেন না, বরং বিশ্বদরবারে বাংলাদেশের ইতিবাচক ভাবমূর্তিও তুলে ধরছেন।
ফাইজার এই অর্জনের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন তার বাবা মুস্তাক আহমেদ চৌধুরী। তিনি কানাডাপ্রবাসী একজন বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও কমিউনিটি ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচিত। প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন, এটি তাদের পরিবারের জন্য অত্যন্ত আনন্দ ও গর্বের মুহূর্ত। একই সঙ্গে দিরাই উপজেলা, সুনামগঞ্জ এবং পুরো বাংলাদেশের মানুষের জন্যও এটি গর্বের সংবাদ। তিনি বিশ্বাস করেন, তরুণদের প্রতি আস্থা ও যথাযথ সুযোগ সৃষ্টি করা গেলে তারা বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করতে সক্ষম হবে।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, ফাইজা কানাডায় বসবাসরত সুনামগঞ্জ সমিতির সহ-সভাপতি এবং টরেন্টো দিরাই অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিষ্ঠাতা মুস্তাক আহমেদ চৌধুরী ও সাবরিনা আক্তার জাহান চৌধুরীর কন্যা। ছোটবেলা থেকেই তিনি ছিলেন মেধাবী, আত্মবিশ্বাসী এবং বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী। লেখাপড়ার পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও স্বেচ্ছাসেবামূলক কর্মকাণ্ডে তার সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল উল্লেখযোগ্য।
পরিবারের সদস্যদের মতে, দায়িত্ববোধ, অধ্যবসায় এবং নতুন কিছু শেখার আগ্রহই তাকে আজকের অবস্থানে পৌঁছে দিয়েছে। শিক্ষাজীবনের প্রতিটি ধাপে তিনি নিজেকে উন্নত করার চেষ্টা করেছেন এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে কাজ করার স্বপ্ন দেখেছেন। সেই স্বপ্নের পথ ধরেই আজ তিনি বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্রীড়া আসরগুলোর একটির সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ার সুযোগ পেয়েছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, প্রবাসে বেড়ে ওঠা বাংলাদেশি তরুণ-তরুণীরা বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে যেভাবে নিজেদের যোগ্যতার স্বাক্ষর রাখছেন, তা বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক বার্তা বহন করে। তারা একদিকে নিজ নিজ দেশের সাংস্কৃতিক পরিচয় বহন করছেন, অন্যদিকে বৈশ্বিক সমাজে বাংলাদেশিদের মেধা ও দক্ষতার পরিচয় তুলে ধরছেন। ফাইজার এই সাফল্য সেই ধারাবাহিকতারই আরেকটি উজ্জ্বল উদাহরণ।
উল্লেখ্য, ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬ ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ ফুটবল আসর হিসেবে আয়োজন করা হচ্ছে। প্রথমবারের মতো তিনটি দেশ—কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র এবং মেক্সিকোর যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে এই বিশ্বকাপ। এছাড়া অংশগ্রহণকারী দলের সংখ্যাও বাড়িয়ে ৪৮-এ উন্নীত করা হয়েছে, যা বিশ্বকাপের পরিসরকে আরও বিস্তৃত করবে। এই বিশাল আয়োজনকে সফল করতে বিভিন্ন পর্যায়ে আন্তর্জাতিক স্বেচ্ছাসেবক, অ্যাম্বাসেডর এবং তরুণ প্রতিনিধিদের সম্পৃক্ত করা হচ্ছে।
এই প্রক্রিয়ায় ফাইজার অন্তর্ভুক্তি প্রমাণ করে যে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশি তরুণদের জন্য সম্ভাবনার দুয়ার ক্রমেই উন্মুক্ত হচ্ছে। তার অর্জন দেশের তরুণ প্রজন্মকে বড় স্বপ্ন দেখতে এবং বিশ্বমঞ্চে নিজেদের জায়গা করে নেওয়ার সাহস জোগাবে বলেই মনে করছেন অনেকে।
সুনামগঞ্জের প্রত্যন্ত গ্রামের শিকড় থেকে বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ আসরের সঙ্গে যুক্ত হওয়া নিঃসন্দেহে অনুপ্রেরণার গল্প। মাশরাফি চৌধুরী ফাইজার এই যাত্রা শুধু একটি ব্যক্তিগত সাফল্যের কাহিনি নয়; এটি অধ্যবসায়, আত্মবিশ্বাস এবং বাংলাদেশের তরুণদের সীমাহীন সম্ভাবনার প্রতিচ্ছবি। বিশ্বকাপের উজ্জ্বল আলোর নিচে দাঁড়িয়ে তার এই অর্জন নতুন প্রজন্মকে হয়তো এ কথাই মনে করিয়ে দেবে—স্বপ্ন যদি বড় হয়, তবে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মঞ্চেও জায়গা করে নেওয়া সম্ভব।


