প্রকাশ: ২৫ এপ্রিল ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
প্রতিকূল আবহাওয়ার মাঝেও হবিগঞ্জের বিস্তীর্ণ হাওরাঞ্চলে চলতি বোরো মৌসুমে ধানের বাম্পার ফলন হয়েছে। দিগন্তজুড়ে সোনালি ধানের দোলা দেখে প্রথমে কৃষকদের মুখে হাসি ফুটলেও সেই আনন্দ খুব বেশি স্থায়ী হয়নি। ভালো ফলনের পরও বাজারে ধানের ন্যায্য দাম না পাওয়ায় এখন হতাশা ও দুশ্চিন্তায় ভুগছেন জেলার হাজারো কৃষক।
সরেজমিনে হাওরাঞ্চল ঘুরে দেখা যায়, অধিকাংশ এলাকায় ধান কাটার কাজ পুরোদমে শুরু হয়েছে। কোথাও কোথাও জমিতে পানি জমে থাকায় হারভেস্টার মেশিন নামানো সম্ভব হচ্ছে না। ফলে বাধ্য হয়ে কৃষকদের শ্রমিক নির্ভর হতে হচ্ছে। তবে শ্রমিক সংকটের কারণে অনেক জায়গায় ধান কাটার কাজ বিলম্বিত হচ্ছে। শ্রমিক পাওয়া গেলেও তাদের বাড়তি পারিশ্রমিক দিতে হচ্ছে, যা উৎপাদন খরচ আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
অন্যদিকে বাজার পরিস্থিতিও কৃষকদের জন্য অনুকূলে নেই। ধানের দাম গত কয়েক বছরের তুলনায় সবচেয়ে কমে নেমে এসেছে বলে অভিযোগ করছেন কৃষকেরা। ফলে উৎপাদন খরচের সঙ্গে বিক্রিমূল্যের কোনো সামঞ্জস্য থাকছে না। এতে কৃষকেরা আর্থিকভাবে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়ছেন বলে জানিয়েছেন।
আজমিরীগঞ্জ সদর ইউনিয়নের শুক্রিবাড়ি গ্রামের কৃষক সৌরভ মিয়া এবার নিজের ও ইজারা নেওয়া জমি মিলিয়ে ৬৫ বিঘা জমিতে হাইব্রিড বোরো ধান আবাদ করেছেন। তিনি জানান, প্রতি বিঘায় গড়ে ১৯ মণ ধান উৎপাদন হলেও তার বড় অংশই চলে যাচ্ছে শ্রমিকদের পারিশ্রমিক হিসেবে। বিঘাপ্রতি প্রায় ৫ মণ ধান শ্রমিকদের দিতে হচ্ছে, ফলে হাতে থাকছে গড়ে ১৪ মণ। সেই ধানই আবার বিক্রি করতে হচ্ছে ৭১০ টাকা মণ দরে, যা তাকে চরম হতাশার মধ্যে ফেলেছে।
সৌরভ মিয়া বলেন, বাজারে চাল কিনতে গেলে ঠিকই উচ্চ দামে কিনতে হয়, কিন্তু নিজেদের উৎপাদিত ধান বিক্রির সময় ন্যায্য মূল্য পাওয়া যায় না। বাধ্য হয়ে দাদনের টাকা পরিশোধ করতে এবং সংসার চালাতে কম দামে ধান বিক্রি করতে হচ্ছে।
একই গ্রামের আরেক কৃষক আকছির মিয়া জানান, তিনি ১৫ বিঘা জমির ধান কেটেছেন। প্রতি মণ ধান ৭০০ টাকা দরে বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছেন। এতে উৎপাদন খরচই উঠবে না বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি। তার ভাষায়, কৃষকের লাভ তো দূরের কথা, এখন কৃষিকাজ চালিয়ে যাওয়া নিয়েই প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
জলসুখা গ্রামের কৃষক আক্কাছ মিয়া জানান, আধুনিক হারভেস্টার ব্যবহার করেও বিঘাপ্রতি প্রায় ২৫০০ টাকা খরচ হচ্ছে শুধু ধান কাটায়। সার, বীজ, রোপণ ও পরিচর্যা মিলিয়ে প্রতি মণ ধানের উৎপাদন খরচ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৭০০ টাকার কাছাকাছি। অথচ বাজারে বিক্রি করতে হচ্ছে তার চেয়েও কম দামে। এতে তিনি ঋণ পরিশোধ ও সংসার চালানো নিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় আছেন।
হবিগঞ্জ সদর উপজেলার ভদৈ গ্রামের লায়েছ মিয়া জানান, এবার উৎপাদন খরচ প্রতি মণ ৬০০ থেকে ৬৫০ টাকার মধ্যে হলেও বিক্রি করতে হচ্ছে ৫৫০ থেকে ৬০০ টাকা দরে। এতে স্পষ্টভাবে ক্ষতির মুখে পড়ছেন কৃষকরা। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, এমন অবস্থা চলতে থাকলে আগামী মৌসুমে অনেকেই বোরো আবাদ থেকে সরে আসতে পারেন।
এদিকে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. আকতারুজ্জামান জানিয়েছেন, চলতি মৌসুমে লক্ষ্যমাত্রার প্রায় পুরোটাই অর্জিত হয়েছে এবং ধান কাটার কাজ দ্রুত এগিয়ে চলছে। কিছু নিচু জমিতে পানি থাকায় সেখানে শ্রমিক দিয়ে কাজ করানো হচ্ছে। খুব শিগগিরই পুরো জেলার ধান কাটা শেষ হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর হবিগঞ্জ জেলায় মোট ১ লাখ ২৩ হাজার ৬৪৪ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে আজমিরীগঞ্জ, বানিয়াচং, নবীগঞ্জ, লাখাই, হবিগঞ্জ সদর, শায়েস্তাগঞ্জ, মাধবপুর, চুনারুঘাট ও বাহুবল উপজেলায় বিস্তীর্ণ এলাকায় এই আবাদ হয়েছে। তবে মৌসুমের শুরুতে বৃষ্টির পানিতে প্রায় ২৮১ হেক্টর জমির ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, বাম্পার ফলন হলেও বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণে কৃষকরা তাদের ন্যায্য মূল্য পাচ্ছেন না। এতে কৃষি অর্থনীতি চাপের মুখে পড়ছে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে কৃষকদের কৃষিকাজে আগ্রহ কমে যাওয়ার ঝুঁকিও তৈরি হচ্ছে।
হাওরাঞ্চলের কৃষকদের ভাষ্য, প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে তারা ফসল ফলালেও বাজারে ন্যায্য দাম না পেলে এই পরিশ্রমের কোনো মূল্য থাকে না। তাই তারা সরকারের কাছে দ্রুত ধানের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করার পাশাপাশি বাজার স্থিতিশীল রাখার দাবি জানিয়েছেন।
সব মিলিয়ে এবার হাওরে সোনালি ধানের বিপুল উৎপাদন হলেও কৃষকের ঘরে আনন্দের বদলে নেমে এসেছে হতাশা। উৎপাদন ও বাজার ব্যবস্থাপনার এই অসামঞ্জস্য দূর না হলে আগামী দিনে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও কৃষি খাত বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।


