প্রকাশ: ১৬ এপ্রিল ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সিলেট নগরীতে হঠাৎ করেই বেড়ে যাওয়া ছিনতাইয়ের ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে যে আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল, তা কাটিয়ে উঠতে এখন দৃশ্যমান পরিবর্তনের আভাস মিলছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধারাবাহিক অভিযান এবং কড়া নজরদারির ফলে পরিস্থিতি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে এসেছে বলে দাবি করছে পুলিশ। তবে তারা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, এই অভিযান এখনো চলমান এবং পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ না আসা পর্যন্ত তা অব্যাহত থাকবে।
গত কয়েক মাসে নগরের বিভিন্ন এলাকায় একের পর এক ছিনতাইয়ের ঘটনায় উদ্বেগ বাড়তে থাকে। বিশেষ করে দিনের আলোয় ফিল্মি কায়দায় সংঘটিত কয়েকটি ঘটনা এবং সেগুলোর সিসিটিভি ফুটেজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর সাধারণ মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি তীব্র হয়ে ওঠে। নগরের হাউজিং এস্টেট এলাকায় প্রকাশ্যে ছিনতাই এবং সাগরদিঘীরপাড় এলাকায় ছিনতাইচেষ্টার ভিডিও ভাইরাল হলে বিষয়টি আরও আলোচনায় আসে।
এই পরিস্থিতিতে সরকারের উচ্চপর্যায়ের নজর পড়ে সিলেটের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর। জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির এবং প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেন। তারা পুলিশকে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতিতে অভিযান পরিচালনার নির্দেশ দেন। এরপরই সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ (এসএমপি) মাঠে নামে এক ধরনের বিশেষ অভিযানে, যা তারা নিজেরাই ‘ছিনতাইকারীদের বিরুদ্ধে জিহাদ’ হিসেবে উল্লেখ করেছে।
পুলিশের এই অভিযানের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো একটি বিস্তারিত তালিকা প্রস্তুত করা। এসএমপির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, নগরীতে সক্রিয় ২৬৩ জন পেশাদার ছিনতাইকারীর একটি তালিকা তৈরি করা হয়েছে। এই তালিকার ভিত্তিতেই অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে এই তালিকাভুক্ত ৫১ জনকে গ্রেফতার করা সম্ভব হয়েছে, যারা অতীতে বিভিন্ন ছিনতাইয়ের ঘটনার সঙ্গে জড়িত ছিল বলে পুলিশের কাছে তথ্য রয়েছে।
শুধু পুরনো অপরাধী নয়, নতুন করে অপরাধ জগতে প্রবেশ করা ব্যক্তিদেরও শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সময়ে কিশোর গ্যাং এবং নতুন অপরাধী চক্রের তৎপরতা বেড়েছে, যা পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছিল। এদের চিহ্নিত করতে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে এবং নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে।
এসএমপির তথ্যমতে, গত ১ মার্চ থেকে ১০ এপ্রিল পর্যন্ত প্রায় ৪০ দিনের অভিযানে নগরী থেকে ৭৮ জন ছিনতাইকারী গ্রেফতার হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে প্রতিদিনই বিভিন্ন অপরাধে জড়িত বহু ব্যক্তিকে আটক করা হয়েছে, যার মধ্যে ছিনতাইকারী, কিশোর গ্যাং সদস্য এবং অন্যান্য অপরাধে জড়িত সন্দেহভাজনরা রয়েছে। পুলিশের এই ধারাবাহিক তৎপরতার ফলে নগরে ছিনতাইয়ের ঘটনা কমে এসেছে বলে দাবি করা হচ্ছে।
পুলিশ কমিশনার মো. আবদুল কুদ্দুছ চৌধুরী পিপিএম জানান, সিলেটকে ছিনতাইমুক্ত করার লক্ষ্যে তারা সুপরিকল্পিতভাবে কাজ করছেন। তিনি বলেন, তালিকাভুক্ত অপরাধীদের গ্রেফতারের পাশাপাশি নতুন করে যারা অপরাধে জড়াচ্ছে, তাদেরও দ্রুত আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে। তার মতে, এই অভিযান কেবল সাময়িক কোনো উদ্যোগ নয়, বরং এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া।
তদন্তে নেমে পুলিশ আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পেয়েছে, যা এই সমস্যার পেছনের একটি বড় কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। জানা গেছে, সিলেট নগরীতে বহিরাগত ছিনতাইকারী চক্রের সক্রিয়তা রয়েছে। বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা থেকে সংগঠিত হয়ে এসব চক্র নগরে এসে অপরাধ সংঘটিত করে দ্রুত সরে পড়ে। ফলে তাদের শনাক্ত করা এবং গ্রেফতার করা অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, এমন অন্তত ৩২ জন বহিরাগত ছিনতাইকারীকে ইতোমধ্যে শনাক্ত করা হয়েছে। এদের অনেকেই সংঘবদ্ধভাবে কাজ করে এবং পরিকল্পিতভাবে নির্দিষ্ট এলাকায় অপরাধ সংঘটিত করে। তদন্তে উঠে এসেছে, সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ, কানাইঘাট, বালাগঞ্জ, গোয়াইনঘাট, সুনামগঞ্জের ছাতক এবং মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল এলাকা থেকে বিভিন্ন গ্রুপ নগরে এসে ছিনতাইসহ নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে।
এসএমপি সূত্র জানায়, পুলিশের অভিযানের চাপ বাড়ার পর অনেক ছিনতাইকারী গা ঢাকা দিয়েছে। কেউ কেউ সাময়িকভাবে নগর ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছে। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, তারা এসব অপরাধীদের গতিবিধি নজরদারিতে রেখেছে এবং সুযোগ পেলেই তাদের গ্রেফতার করা হবে।
এদিকে, জনসম্পৃক্ততা বাড়াতে এবং অপরাধ দমনে নাগরিকদের সহযোগিতা পেতে বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে পুলিশ। ছিনতাইকারী ও চাঁদাবাজদের সম্পর্কে তথ্য দিতে গণবিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি যদি অপরাধীদের সম্পর্কে তথ্য দেন, তবে তার পরিচয় গোপন রাখা হবে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী তাকে পুরস্কৃতও করা হবে।
এই উদ্যোগ সাধারণ মানুষের মধ্যে ইতিবাচক সাড়া ফেলেছে। অনেকেই মনে করছেন, পুলিশের সঙ্গে জনগণের সমন্বয় বাড়লে অপরাধ দমন আরও সহজ হবে। একই সঙ্গে এটি অপরাধীদের জন্য একটি বার্তা হিসেবে কাজ করছে যে, তারা এখন আর নিরাপদ নয়।
সিলেট নগরীর বাসিন্দারা বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে পুলিশের সক্রিয়তা চোখে পড়ার মতো বেড়েছে। বিভিন্ন এলাকায় টহল জোরদার করা হয়েছে এবং সন্দেহভাজনদের তল্লাশি করা হচ্ছে নিয়মিত। ফলে আগের তুলনায় কিছুটা স্বস্তি ফিরে এসেছে। তবে তারা চান, এই অভিযান যেন দীর্ঘমেয়াদে অব্যাহত থাকে, যাতে অপরাধীরা আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে না পারে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, শুধু অভিযান চালিয়ে দীর্ঘমেয়াদে এই সমস্যা সমাধান সম্ভব নয়। এর পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা, যুবসমাজের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থান এবং অপরাধ প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম বাড়ানো প্রয়োজন। একই সঙ্গে আন্তঃজেলা সমন্বয় জোরদার করা হলে বহিরাগত অপরাধীদের দৌরাত্ম্য কমানো সম্ভব হবে।
সব মিলিয়ে, সিলেটে ছিনতাইবিরোধী অভিযানে ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া গেলেও চ্যালেঞ্জ এখনো রয়ে গেছে। পুলিশের চলমান অভিযান এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধি এই পরিস্থিতিকে স্থিতিশীল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে মনে করা হচ্ছে।


