প্রকাশ: ১৬ এপ্রিল ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জ উপজেলায় এক ব্যবসায়ীকে দোকান থেকে ডেকে নিয়ে নৃশংসভাবে মারধর এবং বিপুল পরিমাণ অর্থ ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগে এলাকায় চরম উত্তেজনা ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনাটি শুধু একটি বিচ্ছিন্ন হামলা নয়, বরং এটি বাজারকেন্দ্রিক ব্যবসায়ীদের নিরাপত্তা নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। আহত ব্যবসায়ী বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রয়েছেন এবং তার শারীরিক অবস্থাকে আশঙ্কাজনক না হলেও গুরুতর বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা।
অভিযোগ অনুযায়ী, মঙ্গলবার (১৪ এপ্রিল) বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে উপজেলার পাথারিয়া ইউনিয়নের পাথারিয়া বাজারে এই ঘটনা ঘটে। গুরুতর আহত ব্যবসায়ী হাবিবুর রহমান হাবিব পশ্চিম বীরগাঁও ইউনিয়নের ঠাকুরভোগ গ্রামের বাসিন্দা এবং স্থানীয়ভাবে একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিত। তিনি একই সঙ্গে পশ্চিম বীরগাঁও ইউনিয়ন যুবদলের সাধারণ সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, দীর্ঘ প্রায় তিন দশক ধরে হাবিবুর রহমান ও তার ভাই পাথারিয়া বাজারে একটি মুদির দোকান পরিচালনা করে আসছেন। ব্যবসায়িক সততা ও সামাজিক সম্পৃক্ততার কারণে এলাকায় তাদের একটি গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়েছে। কিন্তু হঠাৎ করেই এই পরিচিত ব্যবসায়ীকে লক্ষ্য করে যে সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে, তা স্থানীয়দের বিস্মিত করেছে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, ঘটনার দিন বিকেলে হাবিবুর রহমানকে তার দোকান থেকে ডেকে নেয় একটি প্রভাবশালী মহলের লোকজন। তাকে পাশের একটি দোকানের গোদামঘরে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে আগে থেকেই অবস্থান করছিলেন কয়েকজন ব্যক্তি। অভিযোগ রয়েছে, সেখানে তাকে একটি পুরনো অর্থ লেনদেনের বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদের নামে চাপ প্রয়োগ করা হয়।
জানা গেছে, পাথারিয়া ইউনিয়নের গাজীনগর গ্রামের ফখরুল ইসলাম নামে এক ব্যক্তি স্থানীয়ভাবে সুদের ব্যবসার সঙ্গে জড়িত বলে পরিচিত। কিছুদিন আগে তার সঙ্গে একই এলাকার আরেক ব্যক্তি আকমল হোসেনের উচ্চ সুদের ভিত্তিতে টাকা লেনদেন হয়। তবে সেই লেনদেনের সঙ্গে হাবিবুর রহমানের কোনো সংশ্লিষ্টতা ছিল না বলে দাবি করেছেন তিনি ও তার পরিবার।
অভিযোগে বলা হয়েছে, ওই লেনদেনের টাকা আদায়ের জন্য হাবিবুর রহমানের ওপর অযৌক্তিক চাপ সৃষ্টি করা হয়। এক পর্যায়ে ফখরুল ইসলাম, তার ছেলে মাহবুবসহ কয়েকজন মিলে লোহার রড ও রুইল দিয়ে হাবিবুর রহমানকে বেদরক মারধর করে। মারধরের সময় তাকে শারীরিকভাবে গুরুতরভাবে আঘাত করা হয় এবং তার কাছে থাকা নগদ ৫ লাখ ৯০ হাজার টাকা ছিনিয়ে নেওয়া হয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
হামলার ফলে হাবিবুর রহমান গুরুতর আহত হন। তার নাকের হাড় ভেঙে যায় এবং মাথাসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়। পরে আশপাশের ব্যবসায়ীরা এগিয়ে এসে তাকে উদ্ধার করেন। প্রথমে তাকে সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। অবস্থার অবনতি হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়।
হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় হাবিবুর রহমান বলেন, তিনি কোনো সুদের লেনদেনে জড়িত ছিলেন না এবং পুরো ঘটনাটি তার কাছে অপ্রত্যাশিত। তার ভাষায়, একজন নিরপরাধ মানুষকে এভাবে প্রকাশ্যে ডেকে নিয়ে মারধর ও টাকা ছিনিয়ে নেওয়া চরম বর্বরতার পরিচায়ক। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন, এ ধরনের ঘটনা চলতে থাকলে বাজারে ব্যবসা পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়বে।
এই ঘটনার পরপরই পরিবারের পক্ষ থেকে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়। একইদিন রাতে হাবিবুর রহমানের ভাই মিজানুর রহমান বাদী হয়ে শান্তিগঞ্জ থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। অভিযোগে ফখরুল ইসলামসহ পাঁচজনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, অভিযোগটি গ্রহণ করা হয়েছে এবং বিষয়টি তদন্তাধীন রয়েছে।
অভিযুক্ত ফখরুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তার মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। ফলে এ বিষয়ে তার বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি। তবে স্থানীয়দের একটি অংশের দাবি, অভিযুক্তরা এলাকায় প্রভাবশালী হওয়ায় অনেকেই প্রকাশ্যে কথা বলতে ভয় পাচ্ছেন।
এদিকে, ঘটনার পর রাজনৈতিক ও সামাজিক মহলেও প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। উপজেলা যুবদলের সভাপতি সোহেল মিয়া এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেন, দিনের আলোয় একজন ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক কর্মীকে এভাবে ডেকে নিয়ে হামলা করা অত্যন্ত ন্যাক্কারজনক। তিনি দ্রুত জড়িতদের গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।
শান্তিগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) ওলীউল্লাহ জানিয়েছেন, অভিযোগ পাওয়ার পর পুলিশ বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে। তিনি বলেন, তদন্তের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং দোষীদের আইনের আওতায় আনার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা চালানো হচ্ছে।
এ ঘটনার পর স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। তারা বলছেন, বাজার এলাকায় নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে ব্যবসা পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়বে। একই সঙ্গে তারা প্রশাসনের কাছে দ্রুত ও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা আর না ঘটে।
সামগ্রিকভাবে, শান্তিগঞ্জের এই ঘটনাটি শুধু একটি হামলার অভিযোগ নয়, বরং এটি স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, প্রভাবশালী গোষ্ঠীর দৌরাত্ম্য এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে ভাবনার সুযোগ তৈরি করেছে। এখন দেখার বিষয়, প্রশাসন কত দ্রুত এবং কার্যকরভাবে এই ঘটনার সুরাহা করতে পারে এবং ভুক্তভোগী পরিবার কতটা ন্যায়বিচার পায়।


