প্রকাশ: ৩০ মার্চ ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম বিতর্কিত অধ্যায় ওয়ান-ইলেভেন বা ১/১১ সরকারকে ঘিরে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে সাম্প্রতিক কিছু তথ্য। রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদের সময় অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তাদের দেওয়া বক্তব্যে উঠে এসেছে নানা চাঞ্চল্যকর দাবি, যা রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ঘিরে গোপন বৈঠকের অভিযোগ এবং সেই সময়ের ক্ষমতার পালাবদলের পেছনের কাহিনি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
তদন্ত-সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, ১/১১ সরকারের সময়কার ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে রিমান্ডে থাকা অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী দাবি করেছেন, সেই সময় গভীর রাতে শেখ হাসিনার সঙ্গে একাধিক গোপন বৈঠক অনুষ্ঠিত হতো। তার ভাষ্যমতে, শেখ হাসিনার কারামুক্তির আগ পর্যন্ত এই বৈঠকগুলো নিয়মিতভাবে চলত এবং এগুলোর সমন্বয় করতেন তৎকালীন ডিজিএফআই কর্মকর্তা অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল এ টি এম আমিন। তবে তিনি নিজে এসব বৈঠকে সরাসরি অংশ নেননি বলেও দাবি করেন।
এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে ১/১১ সরকারের পেছনের প্রেক্ষাপট নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে। সেই সময় দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত অস্থির। নির্বাচনকে ঘিরে সহিংসতা, রাজনৈতিক সংঘাত এবং প্রশাসনিক অচলাবস্থার মধ্যে ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি জরুরি অবস্থা জারি করে একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করে। এই ঘটনাই পরবর্তীতে ‘ওয়ান-ইলেভেন’ নামে পরিচিতি পায়।
রিমান্ডে দেওয়া তথ্যে আরও বলা হয়েছে, তৎকালীন সেনাপ্রধান মঈন উ আহমেদ এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান ফখরুদ্দীন আহমদ-এর পক্ষ থেকে এসব গোপন বৈঠকের সমন্বয় করা হতো। যদিও এসব দাবি এখনো আদালতে প্রমাণিত হয়নি এবং সংশ্লিষ্ট অনেকেই এ বিষয়ে ভিন্ন মত পোষণ করে আসছেন।
এদিকে একই সময়ের আরেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি, সাবেক ডিজিএফআই প্রধান অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল শেখ মামুন খালেদ রিমান্ডে দেওয়া বক্তব্যে নানা ধরনের তথ্য দিয়েছেন বলে জানা গেছে। তবে তদন্তকারীদের ভাষ্যমতে, তার দেওয়া তথ্যের মধ্যে অসঙ্গতি রয়েছে এবং তিনি বারবার বক্তব্য পরিবর্তন করছেন। তিনি দাবি করেছেন, সে সময় বিএনপির সিনিয়র নেতা তারেক রহমানকে চিকিৎসার জন্য বিদেশে পাঠানোর ক্ষেত্রে তিনি ভূমিকা রেখেছিলেন।
মামুন খালেদকে সম্প্রতি রাজধানীর মিরপুর ডিওএইচএস এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার বিরুদ্ধে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় সংঘটিত একটি হত্যা মামলায় জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। একইসঙ্গে তার বিরুদ্ধে ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় নির্যাতন, দুর্নীতি এবং চাঁদাবাজির মতো গুরুতর অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি সেনা কর্মকর্তাদের একটি আবাসন প্রকল্পে দায়িত্ব পালনকালে বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ করেছেন।
অন্যদিকে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর বিরুদ্ধে মানব পাচার এবং অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে মামলা চলছে। তাকে রাজধানীর বারিধারা এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং বর্তমানে একাধিক মামলায় রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, তার কাছ থেকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেলেও অনেক বিষয়ে তিনি এখনো এড়িয়ে যাচ্ছেন।
রিমান্ড শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা দাবি করেছেন, ১/১১ সরকারের সময় এই আসামিরা ব্যবসায়ী ও রাজনীতিবিদদের ওপর বিভিন্নভাবে চাপ সৃষ্টি করতেন। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে যে, তারা একটি সংঘবদ্ধ চক্রের মাধ্যমে বিদেশে শ্রমিক পাঠানোর নামে বিপুল অর্থ আদায় করতেন। সরকার নির্ধারিত খরচের অতিরিক্ত অর্থ আদায় করে শ্রমিক ও ব্যবসায়ীদের জিম্মি করে রাখার অভিযোগও উঠে এসেছে।
তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, এই চক্রের মাধ্যমে কয়েক হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। যদিও অভিযুক্তরা এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ইতোমধ্যে এসব অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত শুরু করেছে।
এই প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ১/১১ সরকারের সময়কার ঘটনাগুলো নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হওয়া দেশের রাজনৈতিক ইতিহাস বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তবে একই সঙ্গে তারা সতর্ক করে বলেছেন, রিমান্ডে দেওয়া তথ্যকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে বিবেচনা করার আগে তা নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে ১/১১ একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় ঘোরানো ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হয়। সেই সময়ের সিদ্ধান্ত, ক্ষমতার বিন্যাস এবং রাজনৈতিক সমঝোতার প্রশ্নগুলো এখনো বিতর্কিত। নতুন করে উঠে আসা এসব তথ্য সেই বিতর্ককে আরও গভীর করতে পারে।
সবশেষে বলা যায়, চলমান তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এই অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই হবে। তবে ইতোমধ্যেই এসব তথ্য রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার ঝড় তুলেছে, যা আগামী দিনগুলোতে আরও বিস্তৃত আকার নিতে পারে।


