প্রকাশ: ১৯ মে ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে সিলেট বিভাগজুড়ে এখন জমে উঠতে শুরু করেছে পশুর বাজার। খামারগুলোতে শেষ মুহূর্তের পরিচর্যা চলছে, গরু-মহিষ-ছাগলকে বিক্রির উপযোগী করে তোলার ব্যস্ততায় সময় কাটছে খামারিদের। প্রাণীসম্পদ বিভাগের তথ্য বলছে, এ বছর সিলেট বিভাগে কোরবানির পশুর কোনো সংকট নেই। বরং চাহিদার তুলনায় প্রায় সাড়ে ১৩ হাজার পশু বেশি রয়েছে। তবে পর্যাপ্ত পশু মজুত থাকা সত্ত্বেও স্থানীয় খামারিদের মনে এখন বড় দুশ্চিন্তার নাম ‘বর্ডার ক্রস’ গরু। সীমান্ত দিয়ে ভারতীয় গরুর অবৈধ প্রবেশ বাড়তে থাকায় নিজেদের লালন-পালন করা পশুর ন্যায্য মূল্য পাওয়া নিয়ে উদ্বেগে রয়েছেন তারা।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঈদ সামনে এলেই সিলেটের বিভিন্ন সীমান্ত এলাকা দিয়ে ভারতীয় গরু চোরাইপথে প্রবেশের প্রবণতা বাড়ে। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। বিশেষ করে গোয়াইনঘাট, জৈন্তাপুর, কোম্পানীগঞ্জ ও কানাইঘাট সীমান্ত এলাকায় প্রতিদিন রাতের আঁধারে গরু ঢুকছে বলে অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, দুর্গম সীমান্ত ব্যবহার করে চোরাকারবারিরা শত শত গরু বাংলাদেশে নিয়ে আসছেন। পরে সেগুলো ট্রাক, পিকআপ কিংবা ছোট পরিবহনে করে শহর ও বিভিন্ন পশুর হাটে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।
প্রাণীসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর সিলেট বিভাগে কোরবানির জন্য মোট চাহিদা রয়েছে ২ লাখ ৭২ হাজার ১৭৪টি পশুর। বিপরীতে প্রস্তুত রয়েছে ২ লাখ ৮৫ হাজার ৮৬৪টি পশু। অর্থাৎ বিভাগের চার জেলায় চাহিদার তুলনায় উদ্বৃত্ত রয়েছে ১৩ হাজার ৬৯০টি পশু। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, স্থানীয় খামার ও গৃহস্থ পর্যায়ে লালন-পালন করা পশু দিয়েই এ অঞ্চলের কোরবানির চাহিদা পূরণ সম্ভব।
জেলাভিত্তিক হিসাবেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। সিলেট জেলায় কোরবানির জন্য প্রস্তুত রয়েছে ১ লাখ ৭ হাজার ৯৬৫টি পশু। এর মধ্যে গরুর সংখ্যা ৬৯ হাজার ২১৫টি, মহিষ ৩ হাজার ৮৪৭টি, ছাগল ২৩ হাজার ৯৭৩টি, ভেড়া ৭ হাজার ৪৯৩টি এবং অন্যান্য পশু ৩ হাজার ৪৩৭টি। জেলায় মোট চাহিদা রয়েছে ১ লাখ ৩ হাজার ৯৩৮টি পশুর। ফলে উদ্বৃত্ত রয়েছে ৪ হাজার ২৭টি পশু।
মৌলভীবাজার জেলায় কোরবানির জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে ৭৪ হাজার ৫৮৪টি পশু। এর বিপরীতে চাহিদা রয়েছে ৭১ হাজার ৭৭২টি। অর্থাৎ উদ্বৃত্ত রয়েছে ২ হাজার ৮১২টি পশু। হবিগঞ্জ জেলায় প্রস্তুত রয়েছে ৫০ হাজার ৮০২টি পশু, যেখানে চাহিদা ৪৬ হাজার ৫০টি। সেখানে অতিরিক্ত রয়েছে ৪ হাজার ৭৫২টি পশু। অন্যদিকে সুনামগঞ্জ জেলায় প্রস্তুত আছে ৫২ হাজার ৫১৩টি পশু, আর চাহিদা রয়েছে ৫০ হাজার ৪১৪টি। ফলে উদ্বৃত্ত রয়েছে আরও ২ হাজার ৯৯টি পশু।
প্রাণীসম্পদ কর্মকর্তারা বলছেন, গত কয়েক বছরে সিলেট অঞ্চলে বাণিজ্যিক খামার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। অনেক তরুণ উদ্যোক্তা গরু মোটাতাজাকরণ ও খামার ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। কেউ ব্যাংক ঋণ নিয়ে, কেউবা সঞ্চয়ের টাকা বিনিয়োগ করে খামার গড়ে তুলেছেন। সারা বছর পশুর খাবার, ওষুধ, পরিচর্যা ও শ্রম ব্যয় বহন করে তারা ঈদ মৌসুমের দিকে তাকিয়ে থাকেন। এই সময় ন্যায্য মূল্য না পেলে পুরো বছরের বিনিয়োগ ঝুঁকির মুখে পড়ে।
সিলেট শহরতলীর দলইপাড়ার সুরমা এগ্রোর ব্যবস্থাপক জামাল আহমদ বলেন, তার খামারে কোরবানির জন্য ১৫টি গরু প্রস্তুত রয়েছে। কয়েক মাস ধরে শ্রম ও অর্থ ব্যয় করে গরুগুলো বড় করা হয়েছে। কিন্তু সীমান্ত দিয়ে ভারতীয় গরু আসতে থাকলে বাজারে দাম কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তিনি বলেন, স্থানীয় খামারিদের স্বার্থ রক্ষা করা না গেলে ভবিষ্যতে অনেকে এই পেশা ছেড়ে দিতে বাধ্য হবেন।
খামারিদের অভিযোগ, ভারতীয় গরু তুলনামূলক কম দামে বাজারে প্রবেশ করায় দেশীয় গরুর বাজার অস্থির হয়ে পড়ে। এতে ক্রেতারা কম দামে পশু কেনার সুযোগ পেলেও স্থানীয় উৎপাদকরা ক্ষতির মুখে পড়েন। বিশেষ করে ছোট ও মাঝারি খামারিরা সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েন। কারণ তাদের উৎপাদন খরচ বেশি হলেও বাজারে কাঙ্ক্ষিত দাম পাওয়া কঠিন হয়ে যায়।
সংশ্লিষ্টরা আরও বলছেন, অবৈধভাবে সীমান্ত পেরিয়ে আসা পশুর সঙ্গে রোগবালাই ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিও রয়েছে। প্রাণিসম্পদ বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব গরুর স্বাস্থ্য পরীক্ষা বা ভ্যাকসিন সংক্রান্ত কোনো নিশ্চয়তা থাকে না। ফলে সীমান্ত দিয়ে অনিয়ন্ত্রিতভাবে পশু প্রবেশ করলে স্থানীয় পশুসম্পদ খাত স্বাস্থ্যঝুঁকিতেও পড়তে পারে।
সিলেট বিভাগীয় প্রাণীসম্পদ দপ্তরের পরিচালক ড. আবু জাফর মো. ফেরদৌস জানিয়েছেন, সিলেট বিভাগের কোথাও কোরবানির পশুর সংকট নেই। স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত পশু দিয়েই পুরো বিভাগের চাহিদা পূরণ সম্ভব। তিনি বলেন, ভারতীয় গরুর অবৈধ প্রবেশ অব্যাহত থাকলে স্থানীয় খামারিরা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। ন্যায্য মূল্য না পেলে ভবিষ্যতে গরু লালন-পালনে তাদের আগ্রহ কমে যাবে, যা দেশের প্রাণিসম্পদ খাতের জন্য দীর্ঘমেয়াদে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, দেশীয় পশু উৎপাদন এখন শুধু কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির অংশ নয়, এটি গ্রামীণ কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা তৈরির বড় ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মতো সিলেটেও হাজারো পরিবার সরাসরি বা পরোক্ষভাবে এই খাতের সঙ্গে জড়িত। তাই স্থানীয় খামারিদের স্বার্থ রক্ষা করা মানে কেবল একটি ব্যবসা রক্ষা করা নয়, বরং গ্রামীণ অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি সংরক্ষণ করা।
সীমান্ত এলাকায় বসবাসকারী কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা জানিয়েছেন, ঈদের আগে রাতের বেলায় সীমান্তের কিছু এলাকায় গরু পারাপারের ঘটনা অনেকটা প্রকাশ্য গোপন সত্যে পরিণত হয়। মাঝে মধ্যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান পরিচালিত হলেও পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হচ্ছে না বলে তাদের দাবি।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, স্থানীয় খামারিদের টিকিয়ে রাখতে হলে সীমান্ত নজরদারি আরও জোরদার করতে হবে। একই সঙ্গে পশুর হাটগুলোতেও নজরদারি বাড়ানো প্রয়োজন, যাতে অবৈধভাবে আনা পশু সহজে বাজারজাত করা না যায়। অন্যদিকে সাধারণ ক্রেতাদের মধ্যেও দেশীয় খামারের পশু কেনার বিষয়ে সচেতনতা তৈরির প্রয়োজন রয়েছে।
কোরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে এখন সিলেটের খামারগুলোতে যেমন উৎসবের আবহ, তেমনি রয়েছে অনিশ্চয়তার ছায়া। বছরের পর বছর শ্রম আর স্বপ্নে গড়ে ওঠা খামারের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে বাজারে ন্যায্য মূল্য পাওয়ার ওপর। আর সেই মূল্য নিশ্চিত করতে হলে স্থানীয় খামারিদের প্রত্যাশা—দেশীয় পশুর বাজার যেন অবৈধ ‘বর্ডার ক্রস’ গরুর দখলে না চলে যায়।


