প্রকাশ: ১৯ মে ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
আসন্ন পবিত্র ঈদুল আযহাকে সামনে রেখে সিলেট নগরীকে দ্রুত ও পরিচ্ছন্নভাবে বর্জ্যমুক্ত রাখতে কঠোর অবস্থান নিয়েছে সিলেট সিটি কর্পোরেশন (সিসিক)। ঈদের দিনে পশু কোরবানির পর সর্বোচ্চ ৮ ঘণ্টার মধ্যে পুরো নগরীর বর্জ্য অপসারণ সম্পন্ন করার নির্দেশ দিয়েছেন সিসিক প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী। জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশ সুরক্ষায় এই সময়সীমা কঠোরভাবে বাস্তবায়নের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
সোমবার বিকেলে নগর ভবনের সভাকক্ষে ঈদুল আযহা উপলক্ষে ওয়ার্ড পর্যায়ে কোরবানির বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিষয়ক প্রস্তুতি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রশাসক বলেন, কোরবানির পশুর বর্জ্য সময়মতো অপসারণ করা শুধু একটি প্রশাসনিক দায়িত্ব নয়, এটি জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশ সুরক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তিনি স্পষ্টভাবে জানান, নির্ধারিত ৮ ঘণ্টার মধ্যে নগরীকে সম্পূর্ণ বর্জ্যমুক্ত করতে হবে এবং এ বিষয়ে কোনো ধরনের গাফিলতির সুযোগ নেই।
সভায় তিনি আরও বলেন, সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে কোরবানির বর্জ্য দ্রুত অপসারণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। দেশের বিভিন্ন সিটি কর্পোরেশনকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বর্জ্য অপসারণের নির্দেশনা দেওয়া হলেও সিলেট সিটি কর্পোরেশন এবার আরও দ্রুত, অর্থাৎ ৮ ঘণ্টার মধ্যেই কাজ শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। প্রশাসক আশা প্রকাশ করেন, সিসিকের কর্মকর্তা, কর্মচারী এবং পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হবে।
তিনি নগরবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, কোরবানির বর্জ্য যত্রতত্র ফেলা হলে তা দ্রুত অপসারণে সমস্যা তৈরি করে এবং পরিবেশ দূষণের ঝুঁকি বাড়ায়। তাই নাগরিকদের নির্দিষ্ট স্থানে বা নির্ধারিত ব্যাগে বর্জ্য জমা রাখার অনুরোধ জানানো হয়। এতে পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের কাজ সহজ হবে এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পুরো নগরী পরিষ্কার করা সম্ভব হবে।
সভায় আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী কাজের গতি বাড়াতে প্রণোদনার ঘোষণাও দেন। তিনি বলেন, যেসব ওয়ার্ড নির্ধারিত সময়ের আগেই সফলভাবে বর্জ্য অপসারণ সম্পন্ন করতে পারবে, তাদের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও কর্মীদের সিসিকের পক্ষ থেকে পুরস্কৃত করা হবে। পাশাপাশি প্রয়োজনীয় সব ধরনের লজিস্টিক ও প্রশাসনিক সহায়তা প্রদান করা হবে বলেও তিনি আশ্বাস দেন।
প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ রেজাই রাফিন সরকার সভায় সভাপতিত্ব করেন। তিনি বলেন, সিলেট সিটি কর্পোরেশন অতীতেও ঈদের বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় সফলতার পরিচয় দিয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই নগরীকে পরিচ্ছন্ন করা সম্ভব হয়েছে। এবারও সঠিক পরিকল্পনা, পর্যাপ্ত জনবল এবং মাঠপর্যায়ের কার্যকর ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে দ্রুততম সময়ে কাজ শেষ করা সম্ভব হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
তিনি আরও বলেন, ঈদুল আযহার সময় নগরীতে বিপুল পরিমাণ বর্জ্য তৈরি হয়, যা সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনা না করা হলে স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে গরম আবহাওয়ায় বর্জ্য দ্রুত পচে দুর্গন্ধ ও রোগজীবাণুর বিস্তার ঘটায়। তাই সময়মতো অপসারণ অত্যন্ত জরুরি।
সভায় সিসিকের প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা বিশ্বজিত দেব, প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা লে. কর্নেল (অব.) একলিম আবদীন, জনসংযোগ কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্ব) নেহার রঞ্জন পুরকায়স্থসহ বিভিন্ন ওয়ার্ডের সচিব ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। তারা মাঠপর্যায়ে কার্যক্রম বাস্তবায়নের বিভিন্ন দিক নিয়ে মতামত দেন এবং সমন্বিতভাবে কাজ করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, ঈদকে সামনে রেখে সিসিক ইতোমধ্যে নগরীতে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার প্রস্তুতি জোরদার করেছে। পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের বিশেষ টিম গঠন, প্রয়োজনীয় যানবাহন প্রস্তুত রাখা এবং নির্দিষ্ট স্থানে অস্থায়ী বর্জ্য সংগ্রহ কেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি রাতভর ও ঈদের দিন সকাল থেকেই মাঠপর্যায়ে কাজ শুরু করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
নগরবাসীর একাংশ সিসিকের এই উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, পূর্বে ঈদের পর নগরীতে দীর্ঘ সময় ধরে বর্জ্য পড়ে থাকত, যা পরিবেশ ও স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করত। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দ্রুত বর্জ্য অপসারণে উন্নতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এবার ৮ ঘণ্টার মধ্যে পুরো নগরী পরিষ্কার করার লক্ষ্য বাস্তবায়িত হলে সিলেট পরিচ্ছন্ন শহরের দৃষ্টান্ত হিসেবে আরও এগিয়ে যাবে।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু প্রশাসনিক নির্দেশনা নয়, নাগরিক সচেতনতা ও সমন্বয়ই এই উদ্যোগ সফল করার মূল চাবিকাঠি। নগরবাসী যদি যথাযথভাবে বর্জ্য নির্দিষ্ট স্থানে ফেলে এবং সময়মতো সহযোগিতা করে, তাহলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করা সম্ভব হবে। অন্যথায় অতিরিক্ত চাপ ও বিশৃঙ্খলা তৈরি হতে পারে।
পরিবেশবিদদের মতে, কোরবানির বর্জ্য দ্রুত অপসারণ শুধু পরিচ্ছন্নতার বিষয় নয়, এটি জনস্বাস্থ্য সুরক্ষারও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। গরম আবহাওয়ায় এসব বর্জ্য দ্রুত পচে গিয়ে ডায়রিয়া, ডেঙ্গু ও অন্যান্য সংক্রামক রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তাই সময়মতো ব্যবস্থা গ্রহণ অত্যন্ত জরুরি।
সব মিলিয়ে সিলেট সিটি কর্পোরেশনের ৮ ঘণ্টার মধ্যে বর্জ্য অপসারণের এই উদ্যোগ নগর ব্যবস্থাপনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে। প্রশাসনের কঠোর নির্দেশনা, মাঠপর্যায়ের প্রস্তুতি এবং নাগরিক সহযোগিতা—এই তিনটি উপাদান সঠিকভাবে সমন্বিত হলে এবারও ঈদের পর সিলেট নগরী দ্রুত পরিচ্ছন্ন নগরীতে পরিণত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।


