প্রকাশ: ১৯ মে ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা উপজেলার একটি হাওরে পানির নিচে ডুবে থাকা নলকূপ থেকে হঠাৎ উচ্চচাপে কাদাজল মিশ্রিত গ্যাস সদৃশ পদার্থ বের হওয়ার ঘটনায় এলাকায় ব্যাপক কৌতূহল ও আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, হাওরের মাঝখানে পানির নিচে থাকা নলকূপ থেকে আচমকা বিকট শব্দের মতো আওয়াজ তুলে বুদবুদের সঙ্গে কাদামিশ্রিত পদার্থ ওপরে উঠতে থাকে। এ দৃশ্য দেখতে মুহূর্তেই ঘটনাস্থলে ভিড় জমায় আশপাশের গ্রামের মানুষ। কেউ এটিকে প্রাকৃতিক গ্যাসের আলামত বলছেন, আবার কেউ রহস্যময় ভূগর্ভস্থ পরিবর্তনের ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন।
সোমবার দুপুরে ধর্মপাশা উপজেলার রায়পুর গ্রামের টগার হাওরের পূর্বপাশে এ ঘটনা ঘটে। বর্তমানে বোরো ধান কাটা শেষ হওয়ায় হাওরজুড়ে পানি জমে রয়েছে। সেই পানির নিচেই ডুবে ছিল একটি পুরোনো নলকূপ। স্থানীয়দের দাবি, হঠাৎ সেই নলকূপের মুখ থেকে প্রবল চাপে কাদাজল ও গ্যাস সদৃশ পদার্থ নির্গত হতে দেখা যায়। কিছু সময় ধরে এ দৃশ্য চলার পর আবার তা বন্ধ হয়ে যায়।
ঘটনার খবর দ্রুত চারদিকে ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় বাসিন্দারা নৌকা নিয়ে ঘটনাস্থলে ছুটে যান। অনেকে মোবাইল ফোনে ভিডিও ধারণ করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ছড়িয়ে পড়ে সেই ভিডিওচিত্র। ভিডিওতে দেখা যায়, পানির ভেতর থেকে দ্রুত বুদবুদ ও কাদামিশ্রিত তরল ওপরে উঠছে। এতে এলাকায় নানা ধরনের আলোচনা শুরু হয়েছে।
স্থানীয় প্রবীণদের অনেকে বলছেন, রায়পুর ও আশপাশের এলাকায় বহু বছর ধরেই ভূগর্ভে গ্যাসের অস্তিত্ব থাকার গুঞ্জন শোনা যায়। তবে এবার প্রথমবারের মতো অনেকে এমন দৃশ্য নিজের চোখে দেখলেন। কেউ কেউ মনে করছেন, এটি প্রাকৃতিক গ্যাসের উৎস হতে পারে। আবার কেউ বলছেন, দীর্ঘদিন পানির নিচে চাপা পড়ে থাকা জৈব পদার্থ পচে এ ধরনের গ্যাস সৃষ্টি হওয়াও অস্বাভাবিক নয়।
স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল কাদির বলেন, দুপুরের দিকে হাওরের মাঝখানে হঠাৎ পানির নিচ থেকে বিকট শব্দের মতো আওয়াজ আসতে থাকে। পরে দেখা যায় কাদামিশ্রিত পানি ও বুদবুদ ওপরে উঠছে। প্রথমে অনেকে ভয় পেয়ে যান। পরে খবর ছড়িয়ে পড়লে আশপাশের গ্রামের মানুষ ভিড় করতে শুরু করেন। তিনি জানান, কিছু সময় পর আবার সব স্বাভাবিক হয়ে যায়।
আরেক বাসিন্দা রহিম উদ্দিন বলেন, তিনি ছোটবেলা থেকেই এই এলাকায় গ্যাস থাকার কথা শুনে আসছেন। স্থানীয়ভাবে অনেকেই বিশ্বাস করেন, ধর্মপাশার কিছু এলাকায় ভূগর্ভে গ্যাসের মজুত থাকতে পারে। তাই এবার ঘটনাটি দেখে মানুষের আগ্রহ আরও বেড়েছে।
এ বিষয়ে ধর্মপাশা উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা জনি রায় জানিয়েছেন, ঘটনাটি সম্পর্কে স্থানীয়দের কাছ থেকে তিনি একাধিক ফোনকল পেয়েছেন। তিনি বলেন, বিষয়টি নিয়ে প্রশাসন অবগত রয়েছে। তবে এটি প্রকৃতপক্ষে গ্যাস কি না, তা এখনও নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না। বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়া এ বিষয়ে চূড়ান্ত মন্তব্য করা সম্ভব নয়।
তিনি আরও জানান, চলতি বছরের জানুয়ারিতেও একই এলাকায় অনুরূপ একটি ঘটনা ঘটেছিল। তখনও পানির নিচ থেকে গ্যাস সদৃশ কিছু নির্গত হওয়ার খবর পাওয়া যায়। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
ভূতত্ত্ববিদদের মতে, হাওরাঞ্চলে এ ধরনের ঘটনা পুরোপুরি অস্বাভাবিক নয়। জলাবদ্ধ এলাকা বা জৈব পদার্থসমৃদ্ধ মাটির নিচে মিথেন গ্যাস তৈরি হতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে পচনশীল উদ্ভিদ ও জৈব বর্জ্য পানির নিচে জমে থাকলে সেখান থেকে গ্যাস নির্গত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। বিশেষ করে যখন পানির নিচে চাপের পরিবর্তন ঘটে বা কোনো ফাঁক তৈরি হয়, তখন বুদবুদের আকারে গ্যাস ওপরে উঠে আসতে পারে।
তবে বিশেষজ্ঞদের আরেকটি অংশ বলছেন, সুনামগঞ্জ ও বৃহত্তর সিলেট অঞ্চল ভূতাত্ত্বিকভাবে গ্যাসসমৃদ্ধ এলাকা হিসেবে পরিচিত। দেশের বেশ কয়েকটি বড় গ্যাসক্ষেত্রও এই অঞ্চলে অবস্থিত। তাই স্থানীয়দের কৌতূহলকে একেবারে অমূলক বলার সুযোগ নেই। তবে শুধুমাত্র পানির নিচ থেকে বুদবুদ বা কাদামিশ্রিত পদার্থ বের হওয়া মানেই সেখানে বাণিজ্যিক গ্যাসের মজুত রয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো বৈজ্ঞানিকভাবে সঠিক নয়।
ঘটনার পর স্থানীয়দের মধ্যে এক ধরনের আতঙ্কও কাজ করছে। অনেকে আশঙ্কা করছেন, যদি এটি দাহ্য গ্যাস হয় তবে আগুন লাগার ঝুঁকি থাকতে পারে। তবে প্রশাসন জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত কোনো বিস্ফোরণ বা দুর্ঘটনার আশঙ্কাজনক পরিস্থিতি দেখা যায়নি। তারপরও এলাকাবাসীকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
টগার হাওর এলাকাটি বছরের একটি বড় সময় পানির নিচে থাকে। বর্ষা মৌসুমে এখানকার বিস্তীর্ণ এলাকা ছোট ছোট দ্বীপের মতো বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। সেই হাওরের মাঝখানে হঠাৎ এ ধরনের ঘটনা মানুষের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই কৌতূহল তৈরি করেছে। স্থানীয় শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে বৃদ্ধরাও ঘটনাটি নিয়ে নানা আলোচনা করছেন। কেউ কেউ ঘটনাস্থলকে এখন “গ্যাসের জায়গা” বলেও চিহ্নিত করতে শুরু করেছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ঘিরেও চলছে তুমুল আলোচনা। কেউ এটিকে প্রাকৃতিক বিস্ময় বলছেন, কেউ আবার প্রশাসনের কাছে দ্রুত বৈজ্ঞানিক তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। স্থানীয় সচেতন মহল বলছে, গুজব বা ভুল তথ্য ছড়িয়ে না দিয়ে দ্রুত বিশেষজ্ঞ দল পাঠিয়ে প্রকৃত কারণ নির্ধারণ করা জরুরি।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এ ধরনের প্রাকৃতিক ঘটনা প্রায়ই লোকমুখে রহস্য হিসেবে ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান ছাড়া প্রকৃত সত্য জানা সম্ভব নয়। তাই ধর্মপাশার এই ঘটনাকেও গুরুত্ব সহকারে তদন্ত করা প্রয়োজন। কারণ এটি যদি প্রাকৃতিক গ্যাসের ইঙ্গিত হয়, তাহলে ভবিষ্যতে তা গবেষণার বিষয় হতে পারে। আবার যদি এটি কেবল জৈব গ্যাসের স্বাভাবিক নির্গমন হয়, তাহলেও মানুষের মধ্যে থাকা বিভ্রান্তি দূর করা জরুরি।
এখন পুরো এলাকার মানুষের চোখ প্রশাসন ও বিশেষজ্ঞদের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে। টগার হাওরের পানির নিচ থেকে ওঠা এই রহস্যময় গ্যাস আসলে কী, তা জানতে অপেক্ষা করছে ধর্মপাশাসহ পুরো সুনামগঞ্জের মানুষ।


