প্রকাশ: ১৯ মে ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সিলেটের পর্যটন ও সীমান্তঘেঁষা এলাকা জাফলংয়ে অবৈধভাবে মজুদ করা পাথরের বিরুদ্ধে বড় ধরনের অভিযান পরিচালনা করেছে জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ। সোমবার দুপুরে গোয়াইনঘাট উপজেলার বল্লাঘাট, মোহাম্মদপুরসহ আশপাশের একাধিক ক্রাশিং জোনে এই অভিযান চালানো হয়। অভিযানে প্রায় সাত হাজার ঘনফুটের বেশি পাথর জব্দ করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
জাফলং দীর্ঘদিন ধরেই পাথর আহরণ ও ব্যবসার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। তবে অবৈধভাবে পাথর উত্তোলন, মজুদ এবং পরিবেশবিধ্বংসী কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশাসনের কঠোর নজরদারি চলমান রয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় খনিজসম্পদ বিভাগ নতুন করে এই অভিযান পরিচালনা করে।
অভিযানে নেতৃত্ব দেন জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের সিনিয়র সহকারী সচিব ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সৈকত রায়হান। অভিযানের সময় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে বিপুল সংখ্যক পুলিশ সদস্য ও বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। ফলে পুরো অভিযান নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, অভিযান চলাকালে বিভিন্ন স্থানে গোপনে মজুদ রাখা বিপুল পরিমাণ পাথর শনাক্ত করা হয়। পরে সেখান থেকে মোট ৬ হাজার ৯২৭ ঘনফুট পাথর জব্দ করা হয়। এসব পাথর অবৈধভাবে উত্তোলন করে বিভিন্ন ক্রাশিং জোনে মজুদ রাখা হয়েছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে।
নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সৈকত রায়হান জানান, অবৈধভাবে মজুদ করা পাথরের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান চলমান রয়েছে এবং ভবিষ্যতেও এ ধরনের অভিযান আরও জোরদার করা হবে। তিনি বলেন, প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষা এবং অবৈধ আহরণ বন্ধে সরকার কঠোর অবস্থানে রয়েছে। জব্দকৃত পাথর পরবর্তী সময়ে নিলামের মাধ্যমে বিক্রি করে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দেওয়া হবে।
তিনি আরও জানান, আপাতত জব্দ করা পাথর স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের জিম্মায় রাখা হয়েছে, যাতে তা নিরাপদে সংরক্ষণ করা যায় এবং পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা সম্ভব হয়।
জাফলং ও আশপাশের এলাকায় পাথর ব্যবসা একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক খাত হলেও দীর্ঘদিন ধরে সেখানে অবৈধ পাথর উত্তোলন ও পরিবেশ ধ্বংসের অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে পিয়াইন নদী ও সীমান্তবর্তী খাল থেকে নিয়মিতভাবে পাথর উত্তোলন করে তা বিভিন্ন ক্রাশিং জোনে মজুদ করা হয় বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
স্থানীয় পরিবেশকর্মীদের মতে, অবৈধ পাথর উত্তোলনের কারণে জাফলংয়ের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হচ্ছে, নদীভাঙন বাড়ছে এবং জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়ছে। তারা বলছেন, নিয়মিত অভিযান পরিচালনা হলেও অনেক সময় রাতের আঁধারে আবারও অবৈধ কার্যক্রম শুরু হয়ে যায়।
অন্যদিকে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের একাংশ বলছেন, বৈধ লাইসেন্সধারী ব্যবসায়ীরাও অনেক সময় এই অভিযানের কারণে ক্ষতির মুখে পড়েন। তারা দাবি করেন, নিয়মিত ও স্বচ্ছ নীতিমালার মাধ্যমে পাথর উত্তোলন ও ব্যবসা পরিচালনার সুযোগ দেওয়া হলে অবৈধ কার্যক্রম অনেকাংশে কমে আসবে।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, জাফলং এলাকায় পাথর আহরণ ও মজুদ নিয়ে একটি দীর্ঘমেয়াদি শৃঙ্খলা আনার পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। এর অংশ হিসেবে নিয়মিত অভিযান, নজরদারি বৃদ্ধি এবং অবৈধ ক্রাশিং জোন চিহ্নিত করে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, জাফলংয়ের মতো পর্যটন ও পরিবেশগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় অবৈধ পাথর উত্তোলন শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতিই নয়, বরং পরিবেশগত বিপর্যয়েরও কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। তাই এই ধরনের অভিযান অব্যাহত রাখা জরুরি।
স্থানীয় সচেতন মহল বলছে, প্রশাসনের এই উদ্যোগ প্রশংসনীয় হলেও এটি যেন কেবল সাময়িক না হয়, বরং স্থায়ী সমাধানের দিকে এগিয়ে যায়। তাদের মতে, পাথর উত্তোলন ব্যবস্থাপনায় আধুনিক প্রযুক্তি, কঠোর নজরদারি এবং স্থানীয় অংশীদারদের সম্পৃক্ততা বাড়ানো হলে পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব।
অভিযানের পর জাফলং এলাকায় পাথর ব্যবসায়ীদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ কেউ এটিকে নিয়মিত শৃঙ্খলা রক্ষার অংশ হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ কেউ এটিকে ব্যবসার ওপর অতিরিক্ত চাপ হিসেবে উল্লেখ করছেন। তবে প্রশাসনের কঠোর অবস্থানের কারণে অবৈধ পাথর মজুদকারীরা কিছুটা চাপে পড়েছেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
এদিকে জাফলংয়ের মতো পর্যটন এলাকায় এমন অভিযানকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন অনেক পর্যটন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি। তাদের মতে, অবৈধ পাথর উত্তোলন বন্ধ করা গেলে জাফলংয়ের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আরও সংরক্ষিত থাকবে এবং পর্যটকদের আকর্ষণও বাড়বে।
সব মিলিয়ে জাফলংয়ে পরিচালিত এই অভিযান আবারও প্রমাণ করেছে যে, প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষায় প্রশাসন কঠোর অবস্থানে রয়েছে। প্রায় সাত হাজার ঘনফুট পাথর জব্দের এই ঘটনা স্থানীয়ভাবে আলোচনার জন্ম দিয়েছে এবং ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে অভিযান চলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

