প্রকাশ: ১৮ এপ্রিল ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
যুক্তরাষ্ট্র তার ভিসা নীতিতে নতুন করে কঠোর অবস্থান নিয়েছে বলে জানিয়েছে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, পশ্চিম গোলার্ধে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থকে দুর্বল করে এমন কার্যক্রমে যুক্ত বা সমর্থনকারী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ভিসা সীমিতকরণ ও বাতিলের পদক্ষেপ নেওয়া হবে। এই নীতির আওতায় ইতোমধ্যে অন্তত ২৬ জনের ভিসা বাতিল করা হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে মার্কিন প্রশাসন।
বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরার এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে আসে। সেখানে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একটি বিবৃতিতে জানায়, যারা জেনে-শুনে যুক্তরাষ্ট্রের “শত্রুদের” সহায়তা করবে, তাদের ওপর এই ভিসা নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হবে। এর মধ্যে রয়েছে কৌশলগত সহায়তা প্রদান, আঞ্চলিক নিরাপত্তা প্রচেষ্টা ব্যাহত করা, অর্থনৈতিক স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত করা এবং প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমে কোনো দেশের সার্বভৌমত্ব দুর্বল করার মতো কর্মকাণ্ড।
মার্কিন প্রশাসনের দাবি, এই পদক্ষেপ মূলত যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা রক্ষার জন্য নেওয়া হয়েছে। যদিও বিবৃতিতে নির্দিষ্ট কোনো দেশ বা গোষ্ঠীর নাম সরাসরি উল্লেখ করা হয়নি, তবে বিশ্লেষকদের মতে এই নীতির পেছনে লাতিন আমেরিকা ও চীনের ক্রমবর্ধমান কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন প্রশাসন দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই পশ্চিম গোলার্ধে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব বাড়ানোর ওপর জোর দিচ্ছে। এই কৌশলকে তিনি নতুনভাবে “ডনরো ডকট্রিন” হিসেবে অভিহিত করেছেন, যা উনবিংশ শতকের ঐতিহাসিক “মনরো ডকট্রিন”-এর আধুনিক সংস্করণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ওই পুরোনো নীতির মূল লক্ষ্য ছিল ইউরোপীয় শক্তিগুলোর আমেরিকা মহাদেশে হস্তক্ষেপ সীমিত করা।
নতুন নীতির আওতায় যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসন মাদক পাচারবিরোধী অভিযানকে আরও কঠোর করেছে। একই সঙ্গে যেসব দেশ বা গোষ্ঠী এই অঞ্চলে মার্কিন নীতির বিরোধিতা করছে, তাদের ওপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও সম্ভাব্য সামরিক পদক্ষেপের ইঙ্গিতও দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশে চীনের অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত বিনিয়োগ বৃদ্ধি পাওয়ায় ওয়াশিংটন এই অঞ্চলে নিজের অবস্থান পুনরুদ্ধারে আগ্রহী বলে ধারণা করা হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, নতুন ভিসা নিষেধাজ্ঞা এমন ব্যক্তিদের জন্য প্রযোজ্য হবে যারা বিদেশি শক্তিকে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ ও কৌশলগত সুবিধা অর্জনে সহায়তা করছে, আঞ্চলিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে দুর্বল করছে বা যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক স্বার্থে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। তবে কোন দেশ বা কোন ব্যক্তিরা এই তালিকায় রয়েছে, তা প্রকাশ করা হয়নি।
আলজাজিরার প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ট্রাম্প প্রশাসন ইতোমধ্যে কিছু ব্যক্তির বিরুদ্ধে ভিসা বাতিলের পদক্ষেপ নিয়েছে। এর মধ্যে রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল কিছু ইস্যুতে জড়িত ব্যক্তিরাও রয়েছেন। গত বছর প্রশাসন কিছু ফিলিস্তিনপন্থি প্রতিবাদকারীর ভিসা বাতিলের চেষ্টা করে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির জন্য সম্ভাব্য ঝুঁকির বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছিল।
এছাড়া ইরান সরকারের সঙ্গে সম্পর্কিত বা ১৯৭৯ সালের ইরানি বিপ্লবের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পরিবারের সদস্যদের মধ্যেও অন্তত সাতজনের অভিবাসন ভিসা বাতিল করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়। এসব পদক্ষেপকে প্রশাসনের বৃহত্তর নিরাপত্তা নীতির অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
নতুন নীতির আওতায় থাকা ২৬ জন ব্যক্তির পরিচয় প্রকাশ না করলেও তাদের বিরুদ্ধে ইমিগ্রেশন অ্যান্ড ন্যাশনালিটি অ্যাক্ট অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। এই আইনের আওতায় যুক্তরাষ্ট্র সরকার যেকোনো ব্যক্তির ভিসা বাতিল বা প্রবেশাধিকার নিষিদ্ধ করতে পারে, যদি তা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচিত হয়।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই পদক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অবস্থান এবং বৈশ্বিক কূটনৈতিক কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিশেষ করে লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক সাম্প্রতিক সময়ে কিছুটা জটিল হয়ে উঠেছে। ব্রাজিল ও কলম্বিয়ার মতো দেশগুলোর সঙ্গে রাজনৈতিক মতপার্থক্যের কারণে আগেও ভিসা নিষেধাজ্ঞার ঘটনা ঘটেছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ব্রাজিলের সাবেক ডানপন্থি প্রেসিডেন্ট জাইর বলসোনারোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তদন্তের কিছু কর্মকর্তার ভিসা বাতিল করা হয়েছিল। একইভাবে কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রো জাতিসংঘে যুক্তরাষ্ট্রের নীতির সমালোচনা করার পর তার ভিসা বাতিলের ঘটনা ঘটে, যদিও পরে কূটনৈতিক সম্পর্ক কিছুটা স্বাভাবিক হয়।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, নতুন এই নীতি যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক কূটনৈতিক অবস্থানকে আরও কঠোর ও শর্তসাপেক্ষ করে তুলতে পারে। বিশেষ করে অভিবাসন, রাজনৈতিক ভিন্নমত এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে এর প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে পড়তে পারে।
অন্যদিকে মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞরা এই ধরনের ভিসা নিষেধাজ্ঞা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, রাজনৈতিক মতপার্থক্যের ভিত্তিতে ভিসা বাতিলের মতো পদক্ষেপ কূটনৈতিক স্বাধীনতা ও মতপ্রকাশের অধিকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন ভিসা নীতি শুধু অভিবাসন ব্যবস্থার পরিবর্তন নয়, বরং বৈশ্বিক রাজনীতিতে ওয়াশিংটনের কৌশলগত অবস্থানের একটি স্পষ্ট বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই নীতির বাস্তব প্রভাব আগামী দিনে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও অভিবাসন ব্যবস্থায় কী ধরনের পরিবর্তন আনবে, তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে চলছে ব্যাপক আলোচনা ও বিশ্লেষণ।


