প্রকাশ: ১৮ এপ্রিল ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার বিস্তীর্ণ হাওরাঞ্চলে শুরু হয়েছে সোনালী ফসল বোরো ধান কাটার মৌসুম। বছরের পর বছর ধরে কৃষকের স্বপ্ন, পরিশ্রম আর প্রত্যাশার প্রতীক এই বোরো ধান ঘরে তোলার ব্যস্ততায় এখন সরব হাওরের মাঠ। তীব্র তাপদাহ এবং আগাম বন্যার ঝুঁকি উপেক্ষা করে কৃষক ও কৃষাণীরা এখন জমি থেকে পাকা ধান কাটতে ব্যস্ত সময় পার করছেন।
সরেজমিনে উপজেলার বিভিন্ন হাওর এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, এখনো পুরোপুরি ব্যাপকভাবে ধান কাটা শুরু না হলেও কিছু কিছু এলাকায় আগেভাগেই পাকা ধান কাটা শুরু হয়েছে। কৃষকদের ভাষ্য অনুযায়ী, আগামী এক সপ্তাহের মধ্যেই পুরো হাওরজুড়ে ধান কাটার কাজ উৎসবমুখর পরিবেশে শুরু হবে। মাঠজুড়ে তখন তৈরি হবে শ্রম, আনন্দ আর ফসল ঘরে তোলার এক অনন্য গ্রামীণ উৎসব।
স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এবার অনেকেই নিজেদের জমিতে আবাদ করেছেন, আবার কেউ কেউ বর্গা চাষির মাধ্যমে জমি চাষ করেছেন। তবে সামগ্রিকভাবে এবার বোরো ধানের ফলন ভালো হওয়ায় কৃষকের মুখে স্বস্তির হাসি ফুটেছে। দীর্ঘ পরিশ্রমের পর মাঠে সোনালী ধানের শীষ দোল খেতে দেখে তারা স্বপ্নপূরণের আনন্দ অনুভব করছেন।
তবে এই আনন্দের মাঝেও কিছু কৃষকের মনে রয়েছে উদ্বেগ ও হতাশা। অনেকে জানিয়েছেন, আবাদ মৌসুমে পর্যাপ্ত পানি না পাওয়ায় কিছু এলাকায় ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পানির সংকটের কারণে উৎপাদন খরচও বেড়ে গেছে। কৃষকদের মতে, যদি সময়মতো সেচ সুবিধা পাওয়া যেত, তাহলে এবার আরও বেশি উৎপাদন সম্ভব হতো। এই বাস্তবতা তাদের ভবিষ্যৎ কৃষি পরিকল্পনায় নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে।
হাওরের মাঠ ঘুরে দেখা যায়, কৃষকরা সকালের কুয়াশা ভেদ করে জমিতে নামছেন, আর দুপুর গড়িয়ে বিকেল পর্যন্ত ধান কাটার কাজে ব্যস্ত থাকছেন। কাটা ধান মাঠের আইলে স্তূপ করে রাখা হচ্ছে। পরে সেগুলো সমতল জায়গায় এনে মাড়াইয়ের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। গ্রামীণ ঐতিহ্যের সঙ্গে মিল রেখে অনেক ক্ষেত্রেই মাঠেই ধান শুকানো ও মাড়াইয়ের কাজ চলছে, যেখানে পরিবারের নারী সদস্যরাও সক্রিয়ভাবে অংশ নিচ্ছেন।
ধান শুকানো ও মাড়াইয়ের পর সেই ধান কেউ কাঁধে করে, আবার কেউবা ছোট যানবাহনের মাধ্যমে বাড়িতে নিয়ে যাচ্ছেন। পুরো হাওরাঞ্চজুড়ে এখন এক ভিন্ন রূপ—সবুজ ও সোনালী রঙের মিশ্রণে প্রকৃতি যেন কৃষকের শ্রমকে অভিনন্দন জানাচ্ছে। এই দৃশ্য শুধু অর্থনৈতিক কার্যক্রম নয়, বরং গ্রামীণ জীবনের এক অনন্য সাংস্কৃতিক প্রকাশও বটে।
তবে কৃষকদের মাঝে কিছু বাস্তব সমস্যাও রয়েছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি, হঠাৎ বৃষ্টি কিংবা আগাম বন্যার আশঙ্কা সবসময়ই তাদের মাথায় কাজ করছে। পাশাপাশি শ্রমিক সংকটও অনেক এলাকায় ধান কাটার কাজে বাধা সৃষ্টি করছে। ফলে অনেক কৃষককে অতিরিক্ত খরচে শ্রমিক নিয়োগ করতে হচ্ছে, যা উৎপাদন ব্যয় আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
স্থানীয় কৃষকরা জানিয়েছেন, ধান কাটা শুরু হলেও পুরোপুরি ফসল ঘরে তোলার আগে তারা সবসময় আবহাওয়ার দিকে নজর রাখছেন। কারণ হাওরাঞ্চলে অল্প সময়ের বৃষ্টিপাত বা পাহাড়ি ঢলও ব্যাপক ক্ষতির কারণ হতে পারে। তাই দ্রুত এবং নিরাপদভাবে ধান ঘরে তোলাই এখন তাদের প্রধান লক্ষ্য।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, এ বছর গোয়াইনঘাট উপজেলায় মোট ১০ হাজার ১৮ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, সম্ভাব্য প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা এবং ফসল রক্ষার জন্য মাঠ পর্যায়ে নিবিড় নজরদারি রাখা হচ্ছে। পাশাপাশি কৃষকদের যান্ত্রিক সহায়তা ব্যবহারে উৎসাহিত করা হচ্ছে, যাতে দ্রুত ও নিরাপদভাবে ধান কাটা সম্পন্ন করা যায়।
কৃষি কর্মকর্তারা আরও জানান, উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তারা নিয়মিত মাঠে কাজ করছেন এবং কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিচ্ছেন। তারা কৃষকদের দ্রুত ফসল কেটে ঘরে তোলার পাশাপাশি নিরাপদ সংরক্ষণের দিকেও গুরুত্ব দিতে বলছেন।
হাওরের এই সময়টিকে স্থানীয়রা শুধু কৃষি মৌসুম হিসেবেই দেখেন না, বরং এটি তাদের জীবনের একটি বড় উৎসবও বটে। দীর্ঘ অপেক্ষা, পরিশ্রম আর অনিশ্চয়তার পর যখন সোনালী ধান ঘরে ওঠে, তখন পুরো এলাকা আনন্দে ভরে ওঠে। পরিবারের সদস্যরা একসঙ্গে মাঠে কাজ করেন, শিশুদের হাসি আর শ্রমিকদের ব্যস্ততা মিলিয়ে তৈরি হয় এক জীবন্ত গ্রামীণ চিত্র।
সব মিলিয়ে গোয়াইনঘাটের হাওরাঞ্চলে এখন শুরু হয়েছে কৃষকের বছরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে সোনালী ফসল ঘরে তোলার এই সংগ্রাম শুধু অর্থনৈতিক নয়, বরং আবেগ, ঐতিহ্য এবং জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। কৃষকের চোখে এখন একটাই স্বপ্ন—নিরাপদে, সময়মতো ঘরে তোলা হোক বছরের পরিশ্রমের ফল বোরো ধান।


