প্রকাশ: ২৭ জুলাই ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সিলেটের সীমান্তবর্তী গোয়াইনঘাট উপজেলার হাজিপুর এলাকায় বালু উত্তোলনকে কেন্দ্র করে উদ্বেগজনক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, ইজারার শর্ত উপেক্ষা করে দিনের পর দিন ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে বালু উত্তোলন চলায় পরিবেশ, কৃষিজমি, বসতভিটা এবং স্থানীয় জনপদের অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে অভিযান পরিচালনার কথা বলা হলেও ক্ষতিগ্রস্তদের দাবি, অবৈধ কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। ফলে পরিবেশ ধ্বংস, ভূমিক্ষয় এবং মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
সরেজমিনে স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বালুমহালের নির্ধারিত সীমানার বাইরে গিয়ে বিভিন্ন স্থানে ড্রেজার, লিস্টার মেশিন এবং অন্যান্য ভারী যন্ত্রপাতির মাধ্যমে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, ইজারার শর্ত অনুযায়ী সনাতন পদ্ধতিতে বালু উত্তোলনের কথা থাকলেও বাস্তবে আধুনিক ভারী যন্ত্র ব্যবহার করে রাতদিন অব্যাহতভাবে বালু তোলা হচ্ছে। এর ফলে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহের পরিবর্তনের পাশাপাশি আশপাশের সমতল ভূমি, কৃষিজমি এবং বসতবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, বালু উত্তোলনের কারণে শত শত বিঘা ফসলি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কোথাও কোথাও মাঠ, খেলার স্থান এবং টিলা শ্রেণির ভূমিও ভাঙনের কবলে পড়েছে। তারা আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, একইভাবে বালু উত্তোলন অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে হাজিপুর এলাকার ভৌগোলিক চিত্রই পরিবর্তিত হয়ে যেতে পারে। পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকাও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন বাসিন্দা অভিযোগ করেন, বালু উত্তোলনের সঙ্গে জড়িত একটি প্রভাবশালী চক্র দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় সক্রিয়। তারা অধিক মূল্যের প্রলোভন দেখিয়ে অনেককে জমি বিক্রিতে উৎসাহিত করছে। আবার কেউ জমি বিক্রি করতে রাজি না হলে বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি ও চাপ প্রয়োগের অভিযোগও রয়েছে। অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে নিজেদের বসতভিটা ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছে বলে স্থানীয়রা দাবি করেন। তাদের ভাষ্য, এভাবে বসতভিটা হারিয়ে বহু পরিবার অনিশ্চয়তার মধ্যে জীবন কাটাচ্ছে।
ক্ষতিগ্রস্তদের অভিযোগ, জেলা প্রশাসন বালুমহাল ইজারা দিয়ে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আদায় করলেও পরিবেশগত ক্ষতির বিষয়টি যথাযথ গুরুত্ব পাচ্ছে না। স্থানীয়দের মতে, রাজস্ব আদায়ের পাশাপাশি পরিবেশ ও জনস্বার্থ রক্ষায় আরও কঠোর তদারকি প্রয়োজন ছিল। তারা দাবি করেন, নিয়ম ভঙ্গের অভিযোগ উঠলেও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণে প্রশাসনের দৃশ্যমান কঠোরতা এখনো পরিলক্ষিত হয়নি।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে জেলা প্রশাসনের বক্তব্য ভিন্ন। সিলেটের জেলা প্রশাসক আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, তিনি সম্প্রতি দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন এবং ইজারার শর্ত ভঙ্গ করে বালু উত্তোলনের বিষয়টি তার কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে উপস্থাপিত হয়নি। বিষয়টি সম্পর্কে খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে এবং অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
গোয়াইনঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রতন কুমার অধিকারী বলেন, ইজারাদারদের বারবার সতর্ক করা হয়েছে যাতে তারা নির্ধারিত সীমানার বাইরে গিয়ে বালু উত্তোলন না করেন। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে একাধিক অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে এবং মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে আইনগত ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে। তবে ইজারা বাতিলের ক্ষমতা উপজেলা প্রশাসনের আওতায় নয় বলে তিনি উল্লেখ করেন। তার ভাষ্য, বিষয়টি জেলা প্রশাসনকে মৌখিকভাবে জানানো হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের এখতিয়ার তাদের।
ইউএনও আরও বলেন, অনেক ক্ষেত্রেই স্থানীয় বাসিন্দারা বেশি মূল্য পাওয়ার কারণে স্বেচ্ছায় জমি বিক্রি করে অন্যত্র চলে যাচ্ছেন। পরে সেই জমি থেকে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে প্রশাসনের একার পক্ষে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। এজন্য স্থানীয় জনগণ, জনপ্রতিনিধি এবং সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত সহযোগিতা প্রয়োজন।
গোয়াইনঘাটের সহকারী কমিশনার (ভূমি) জাকারিয়া হোসেনও স্বীকার করেছেন যে কিছু ক্ষেত্রে ইজারার শর্ত লঙ্ঘনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। তিনি জানান, দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি কয়েকটি অভিযান পরিচালনা করেছেন এবং পরিস্থিতি সম্পর্কে জেলা প্রশাসনকে অবহিত করেছেন। তার মতে, আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য উচ্চপর্যায়ের সিদ্ধান্ত প্রয়োজন।
পরিবেশ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকেও বিষয়টি নিয়ে সীমাবদ্ধতার কথা জানানো হয়েছে। সিলেটের পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিদর্শক মামুনুর রশিদ বলেন, ঘোষিত প্রতিবেশ সংকটাপন্ন এলাকা বা ইকোট্যুরিজম অঞ্চলে তারা সরাসরি অভিযান পরিচালনা করতে পারেন। তবে অন্যান্য ক্ষেত্রে আইনগত সীমাবদ্ধতা রয়েছে। জেলা প্রশাসনের অনুরোধ বা সমন্বয়ের ভিত্তিতে প্রয়োজন হলে পরিবেশ অধিদপ্তর সহযোগিতা করতে প্রস্তুত রয়েছে বলেও তিনি জানান।
গোয়াইনঘাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ওমর ফারুক বলেন, উপজেলা প্রশাসনের পরিচালিত মোবাইল কোর্টে পুলিশ নিয়মিত সহযোগিতা করছে। তবে ইজারার শর্ত ভঙ্গ করে বালু উত্তোলন প্রতিরোধে পুলিশকে আলাদাভাবে কোনো বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়নি। তিনি আরও বলেন, বালু সিন্ডিকেটের কাছ থেকে পুলিশের পক্ষ থেকে নিয়মিত অর্থ আদায়ের যে অভিযোগ বিভিন্ন মহলে আলোচনা হচ্ছে, তার কোনো সত্যতা নেই।
এদিকে, পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর প্রতিনিধিরা মনে করছেন, দীর্ঘদিন ধরে ইজারার শর্ত লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠলেও কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ার কারণেই পরিস্থিতি জটিল হয়েছে। বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) সিলেটের সমন্বয়ক অ্যাডভোকেট শাহেদা আক্তার বলেন, অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, শর্ত ভঙ্গের অভিযোগ থাকলেও খুব কম ক্ষেত্রেই ইজারা বাতিল করা হয়েছে। তার মতে, পরিবেশ ও জনস্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে প্রশাসনের আরও দৃঢ় অবস্থান নেওয়া প্রয়োজন।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সিলেটের সাধারণ সম্পাদক কাসমির রেজা বলেন, অনেক সময় অভিযান পরিচালিত হলেও মূল হোতারা আইনের আওতার বাইরে থেকে যায়। তার অভিযোগ, অধিকাংশ ক্ষেত্রে শ্রমিক বা নিম্নপর্যায়ের কর্মীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হলেও প্রকৃত দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান পদক্ষেপ দেখা যায় না। তিনি মনে করেন, ইজারার শর্ত স্পষ্টভাবে লঙ্ঘিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ এবং প্রয়োজন হলে ইজারা বাতিলের মতো কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।
জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, গোয়াইনঘাট উপজেলার নবসৃষ্ট হাজিপুর আহারকান্দি বালুমহালের আয়তন ৮৪ দশমিক ৭৮ একর। এই বালুমহাল ২০ কোটি ৮৫ লাখ টাকায় ইজারা দেওয়া হয়েছে এবং ভ্যাট-ট্যাক্সসহ মোট ইজারা মূল্য প্রায় ২৬ কোটি টাকায় পৌঁছেছে।
গোয়াইনঘাটের হাজিপুরে বালু উত্তোলনকে ঘিরে যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, তা শুধু একটি প্রশাসনিক বা অর্থনৈতিক ইস্যু নয়; এটি পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য এবং স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকার সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে জড়িত। অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত, ইজারার শর্ত যথাযথভাবে বাস্তবায়ন এবং আইন লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে পরিবেশ ও জনস্বার্থ রক্ষা করা এখন সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দাবি বলে মনে করছেন সচেতন মহল।


