প্রকাশ: ২৭ জুলাই ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
২০১৩ সালের ৫ মে রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশ ঘিরে সংঘটিত সহিংসতা ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় করা মামলায় নতুন গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ পলাতক একাধিক আসামির বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছেন। একই সঙ্গে মামলার আনুষ্ঠানিক অভিযোগ (ফরমাল চার্জ) আমলে নিয়ে পরবর্তী বিচারিক কার্যক্রমের পথ সুগম করেছেন ট্রাইব্যুনাল।
সোমবার (২৭ জুলাই) দুপুরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলামের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বেঞ্চ এই আদেশ দেন। প্রসিকিউশনের দাখিল করা আনুষ্ঠানিক অভিযোগ পর্যালোচনা শেষে ট্রাইব্যুনাল পলাতক আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির আবেদন মঞ্জুর করেন। আদালতের এ আদেশের মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত এই মামলার বিচারিক প্রক্রিয়া আরও এক ধাপ এগিয়ে গেল।
ট্রাইব্যুনালে দাখিল করা অভিযোগে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পাশাপাশি সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ, পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদসহ আরও কয়েকজনকে আসামি করা হয়েছে। প্রসিকিউশনের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ট্রাইব্যুনাল তাদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন। আদালতের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, পলাতক আসামিদের আইনানুগ প্রক্রিয়ায় আদালতের সামনে হাজির করার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এদিকে মামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নয়জন আসামি বর্তমানে বিভিন্ন মামলায় গ্রেফতার অবস্থায় রয়েছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি, সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকু, অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসান, পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক এ কে এম শহিদুল হক, পুলিশের সাবেক উপ-মহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মোল্যা নজরুল ইসলাম, একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটির উপদেষ্টামণ্ডলীর সভাপতি শাহরিয়ার কবির, সাবেক ডিআইজি আবদুল জলিল মণ্ডল, সাংবাদিক ফারজানা রুপা এবং সাংবাদিক মোজাম্মেল বাবু। তারা ইতোমধ্যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হেফাজতে রয়েছেন এবং মামলার বিচারিক কার্যক্রমে তাদের বিষয়ে পৃথক আইনগত প্রক্রিয়া চলবে।
মামলাটির প্রসিকিউশন পক্ষ আদালতে জানায়, তদন্তে এ পর্যন্ত ২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্বরের ঘটনায় অন্তত ৫৮ জন নিহত হওয়ার প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়া গেছে। চিফ প্রসিকিউটরের ভাষ্য অনুযায়ী, তদন্ত কর্মকর্তা সাক্ষ্য, নথিপত্র, ভিডিওচিত্র, আলোকচিত্র এবং অন্যান্য তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে এই প্রাথমিক তথ্য আদালতের সামনে উপস্থাপন করেছেন। তদন্ত অব্যাহত রয়েছে এবং প্রয়োজনে অতিরিক্ত তথ্য ও প্রমাণ আদালতে উপস্থাপন করা হবে।
ঘটনার পটভূমিতে জানা যায়, ২০১৩ সালের ৫ মে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বরে বৃহৎ সমাবেশ কর্মসূচি পালন করে। দিনব্যাপী সমাবেশের পর রাতে সেখানে অবস্থানরত সমাবেশকারীদের সরিয়ে দিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অভিযান পরিচালনা করে। ওই অভিযানে হতাহতের সংখ্যা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে বিতর্ক রয়েছে। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন পক্ষ ভিন্ন ভিন্ন তথ্য উপস্থাপন করেছে। তবে বর্তমান মামলায় প্রসিকিউশন তাদের তদন্তের ভিত্তিতে নির্দিষ্ট সংখ্যক নিহতের প্রাথমিক তথ্য আদালতের সামনে উপস্থাপন করেছে, যা বিচারিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে আদালতের বিবেচনায় রয়েছে।
গত বছরের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর হেফাজতে ইসলাম আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে এ ঘটনায় বিচার চেয়ে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করে। অভিযোগে দাবি করা হয়, শাপলা চত্বরে পরিচালিত অভিযানে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত হয়েছে এবং এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে বিচার হওয়া প্রয়োজন। সেই অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত শুরু হয় এবং পরবর্তীতে প্রসিকিউশন আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করে।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গৃহীত হওয়া এবং পলাতক আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হওয়া মামলার বিচারিক প্রক্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। তবে এটি কোনো ব্যক্তির অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার সমতুল্য নয়। বাংলাদেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী, প্রত্যেক অভিযুক্ত ব্যক্তি আদালতে আত্মপক্ষ সমর্থনের পূর্ণ সুযোগ পাবেন এবং বিচারিক প্রক্রিয়ায় উপস্থাপিত সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতেই আদালত চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেবেন।
আইনজ্ঞদের মতে, যেসব আসামি বর্তমানে পলাতক রয়েছেন, তাদের আদালতে হাজির করা গেলে মামলার কার্যক্রম আরও দ্রুত এগোতে পারে। অন্যদিকে, যারা ইতোমধ্যে গ্রেফতার রয়েছেন, তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন, সাক্ষ্যগ্রহণ এবং অন্যান্য বিচারিক ধাপ নির্ধারিত আইনি প্রক্রিয়া অনুসারে সম্পন্ন হবে।
শাপলা চত্বরের ঘটনাকে কেন্দ্র করে গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে বিস্তর আলোচনা, বিতর্ক এবং মতপার্থক্য রয়েছে। এক পক্ষ ঘটনাটিকে পরিকল্পিত হত্যাযজ্ঞ হিসেবে বর্ণনা করে বিচার দাবি করে আসছে, অন্যদিকে অতীতের বিভিন্ন সময়ে রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে এ বিষয়ে ভিন্ন ব্যাখ্যাও সামনে এসেছে। ফলে বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরেই জনআলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে।
সর্বশেষ আদালতের আদেশের মাধ্যমে মামলাটি নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। এখন পলাতক আসামিদের বিরুদ্ধে জারি করা গ্রেফতারি পরোয়ানা কার্যকর করা, তদন্তের বাকি অংশ সম্পন্ন করা এবং বিচারিক প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার দিকে নজর থাকবে সংশ্লিষ্টদের। মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি আদালতের বিচারিক কার্যক্রম, সাক্ষ্য-প্রমাণ এবং আইনি প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করবে বলে সংশ্লিষ্ট আইনজ্ঞরা মনে করছেন।


