প্রকাশ: ০৩ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
রাজধানীর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যাত্রীসেবা ও অব্যবস্থাপনা নিয়ে উত্তেজনার জেরে করা মামলায় গ্রেপ্তার জামায়াতে ইসলামীর নেতা ও সাবেক সংসদ সদস্য মেজর (অব.) মোহাম্মদ আখতারুজ্জামান রঞ্জনকে শনিবার আদালতে হাজির করা হয়েছে। আদালত চত্বরে নেওয়ার সময় তাঁর হাতে হাতকড়া ও মাথায় হেলমেট পরানো নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেখা যায় তাকে। একপর্যায়ে পুলিশের দেওয়া হেলমেট ছুড়ে ফেলেন তিনি। এ সময় নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধ করে পাওয়া দেশে তাঁকে হাতকড়া ও হেলমেট পরানো হয়েছে।
বিমানবন্দরে ওমরাহ যাত্রীদের জমজমের পানি ও লাগেজ ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিতর্কের সূত্র ধরে গত বৃহস্পতিবারের ঘটনার পর শুক্রবার আখতারুজ্জামানের বিরুদ্ধে মামলা করে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ। মামলায় সরকারি কাজে বাধা, হুমকি, মারধর ও বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা বিঘ্নিত করার অভিযোগ আনা হয়েছে। শুক্রবার সন্ধ্যায় রাজধানীর ক্যান্টনমেন্ট এলাকার বাসা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। পরে তাকে বিমানবন্দর থানায় হস্তান্তর করা হয়।
শনিবার আদালতে নেওয়ার সময় আখতারুজ্জামান নিজের হাতে হাতকড়া এবং মাথায় হেলমেট পরানো নিয়ে আপত্তি জানান। তিনি বলেন, তিনি আওয়ামী লীগার নন এবং এভাবে তাকে কেন হেলমেট পরানো হয়েছে, সে প্রশ্ন তোলেন। প্রিজনভ্যান থেকে নামার পরও তিনি পুলিশের সঙ্গে কথা বলতে থাকেন এবং একপর্যায়ে মাথা থেকে হেলমেট খুলে ছুড়ে ফেলেন। একই সঙ্গে তিনি বিমানবন্দরের অব্যবস্থাপনা নিয়ে কথা বলার কারণে তাকে আটক করা হয়েছে বলে দাবি করেন।
আদালতে নেওয়ার পথে তিনি বলেন, ‘আমার মুক্তিযুদ্ধ করে পাওয়া দেশে আমার হাতে হাতকড়া ও হেলমেট পরানো হয়েছে।’ পরে তিনি জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম অব্যাহত রাখার কথা বলেন। তবে মামলায় তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের বিচারিক প্রক্রিয়া এখনো চলমান এবং এসব অভিযোগ আদালতে প্রমাণিত হয়নি।
আখতারুজ্জামানের বিরুদ্ধে মামলার সূত্রপাত হয় বৃহস্পতিবার সকালে মদিনা থেকে ঢাকায় আসা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের বিজি-৩৩৮ ফ্লাইটের যাত্রীদের জমজমের পানি সরবরাহে বিলম্বকে কেন্দ্র করে। মামলার এজাহার অনুযায়ী, ওই ফ্লাইটে জামায়াতে ইসলামীর ৩৪ জন প্রতিনিধি পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ঢাকায় আসেন। বিমানবন্দরে একই সময়ে যাত্রীর চাপ বেড়ে যাওয়ায় ট্রলি সংগ্রহে দীর্ঘ সারি তৈরি হয়। লাগেজ পেতে দেরি এবং জমজমের পানি সময়মতো না পাওয়াকে কেন্দ্র করে কয়েকজন যাত্রীর মধ্যে উত্তেজনা দেখা দেয়।
পরিস্থিতি সামাল দিতে বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন এস এম রাগীব সামাদ ঘটনাস্থলে যান। এ সময় আখতারুজ্জামান তার সঙ্গে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময়ে জড়িয়ে পড়েন বলে মামলার এজাহারে অভিযোগ করা হয়েছে। এজাহারে বলা হয়, তিনি বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালককে উদ্দেশ করে গালাগাল, হুমকি এবং ঘাড় ধরে বের করে দেওয়ার কথা বলেন। তাঁর আচরণ আক্রমণাত্মক হয়ে উঠেছিল বলেও মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে।
মামলার বিবরণে আরও অভিযোগ করা হয়েছে, বিমানবন্দরের সংরক্ষিত কেপিআই এলাকায় আখতারুজ্জামানের সঙ্গে থাকা কয়েকজন প্রটোকল সহকারী ভিডিও ধারণ করছিলেন। দায়িত্ব পালনরত নিরাপত্তা সুপারভাইজার ওয়ারেন্ট অফিসার মোহাম্মদ কামাল উদ্দিন সেখানে ভিডিও ধারণে নিষেধ করলে তাকে গালাগাল ও শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা হয় বলে এজাহারে বলা হয়েছে। সাধারণ যাত্রীদের জমজমের পানির বোতল ফেলে দেওয়া এবং বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের এক প্রতিনিধির সঙ্গেও মারমুখী আচরণের অভিযোগ আনা হয়েছে।
এ ঘটনায় বিমানবন্দর থানায় মামলা করেন বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের নিরাপত্তা কর্মকর্তা মো. শাহরিয়ার আলম সজিব। মামলায় দণ্ডবিধির ১৮৬, ১৮৯, ২৯৪, ৩২৩, ৩৫২, ৩৫৩, ৫০৪ ও ৫০৬ ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে। তদন্ত কর্মকর্তা সংশ্লিষ্ট সিসিটিভি ফুটেজ, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য এবং অন্যান্য আলামত সংগ্রহ করবেন বলে জানানো হয়েছে। আদালত মামলার তদন্ত প্রতিবেদন ১০ নভেম্বরের মধ্যে দাখিলের নির্দেশ দিয়েছেন।
অন্যদিকে, বিমানবন্দরে জমজমের পানি সরবরাহে বিলম্বের অভিযোগটিও কর্তৃপক্ষ গুরুত্ব দিয়ে দেখেছে। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, কনটেইনার অফলোডিং ও পরিচালনাগত সমস্যার কারণে ব্যাগেজ বেল্টে সময়মতো জমজমের পানি পৌঁছাতে বিলম্ব হয়েছিল। বিষয়টি নজরে আসার পর নিজস্ব সংরক্ষিত মজুত থেকে পানি সরবরাহের ব্যবস্থা করা হয় এবং পরে অন্য কনটেইনার শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়। এই ঘটনায় দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বিমানবন্দরের ঘটনাকে কেন্দ্র করে সরকারি পক্ষ থেকেও প্রতিক্রিয়া এসেছে। বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত শুক্রবার রাতে শাহজালাল বিমানবন্দর পরিদর্শন করেন। তিনি সেখানে বিমানবন্দরের সেবাব্যবস্থা ও সাম্প্রতিক ঘটনার বিষয়ে কথা বলেন। আখতারুজ্জামানের আচরণকে তিনি ‘মব ও ইচ্ছাকৃত বিশৃঙ্খলা’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। একই সঙ্গে বিমানবন্দরের সক্ষমতা ও যাত্রীচাপ সামাল দেওয়ার বিষয়েও তিনি বক্তব্য দেন।
অন্যদিকে আখতারুজ্জামানের দল জামায়াতে ইসলামী তার গ্রেপ্তার ও মামলার বিরোধিতা করেছে। দলটির নেতারা দাবি করেছেন, বিমানবন্দরের অব্যবস্থাপনা ও যাত্রীদের ভোগান্তির প্রতিবাদ করার কারণেই তার বিরুদ্ধে মামলা ও গ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটেছে। জামায়াতের পক্ষ থেকে আখতারুজ্জামানের মুক্তি এবং বিমানবন্দরের যাত্রীসেবা ও অব্যবস্থাপনা নিয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে। দলের নেতারা মামলায় আনা শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার অভিযোগও অস্বীকার করেছেন।
এদিকে ঘটনাটিকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়েছে। বিমানবন্দরে আখতারুজ্জামানের উচ্চবাচ্যের ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর একদিকে সরকারি কর্মকর্তার সঙ্গে তাঁর আচরণ নিয়ে সমালোচনা হয়েছে, অন্যদিকে বিমানবন্দরে যাত্রীদের দীর্ঘ অপেক্ষা, ট্রলি সংকট, লাগেজ পেতে বিলম্ব এবং জমজমের পানি সরবরাহের সমস্যাও আলোচনায় এসেছে। ফলে পুরো ঘটনাটি এখন শুধু একজন রাজনৈতিক নেতার বিরুদ্ধে মামলার বিষয় হিসেবে নয়, বরং বিমানবন্দরের যাত্রীসেবা, প্রশাসনিক জবাবদিহিতা এবং জনসাধারণের সঙ্গে সরকারি প্রতিষ্ঠানের আচরণ নিয়েও প্রশ্ন তৈরি করেছে।
আইনি দিক থেকে এখন মূল বিষয় হচ্ছে, মামলায় উত্থাপিত অভিযোগগুলোর তদন্ত এবং আদালতে সেগুলোর প্রমাণ উপস্থাপন। শুক্রবার গ্রেপ্তারের পর শনিবার আখতারুজ্জামানকে আদালতে হাজির করা হয় এবং পুলিশ তার বিরুদ্ধে রিমান্ড আবেদন করে। আদালত তাকে এক দিনের রিমান্ডে পাঠিয়েছে বলে শনিবারের আদালত-সংক্রান্ত প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
আখতারুজ্জামান আদালত চত্বরে নিজের বিরুদ্ধে নেওয়া পুলিশি ব্যবস্থার প্রতিবাদ করলেও মামলার অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণের দায়িত্ব এখন তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার ওপর। একইভাবে বিমানবন্দরে যাত্রীসেবায় যে ধরনের বিলম্ব ও ব্যবস্থাপনাগত সমস্যার কথা সামনে এসেছে, সেটিরও যথাযথ তদন্ত প্রয়োজন। কারণ একজন যাত্রীর ক্ষোভ যেমন আইন ও শৃঙ্খলার সীমা অতিক্রম করতে পারে না, তেমনি সরকারি সেবায় ঘাটতি থাকলে তার জবাবদিহিতাও নিশ্চিত করা জরুরি।
শাহজালাল বিমানবন্দর দেশের প্রধান আন্তর্জাতিক প্রবেশদ্বার হওয়ায় সেখানে যাত্রীসেবা, নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলার প্রতিটি ঘটনা জনস্বার্থের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। সাম্প্রতিক এই ঘটনায় একদিকে মামলা ও গ্রেপ্তার, অন্যদিকে বিমানবন্দরের ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন—দুই বিষয়ই সামনে এসেছে। এখন তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা এবং দায়িত্বে কোনো ধরনের অবহেলা ছিল কি না, তা স্পষ্ট হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে।


